দেশের পরিস্থিতি এখন থমথমে। সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে দীর্ঘদিন থেকে চলমান আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করেছে। অনেকটা পর্যাপ্ত ও আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের অভাব থেকে দেশে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি বলা যায়। দেশে কর্মজীবীদের বড় অংশই কাজ করছেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২২ সালের তথ্যানুযায়ী, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে বিশ্বে পিছিয়ে থাকা দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। 

এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় ছিল। গত কয়েক বছরে শিক্ষার হার বৃদ্ধিসহ উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যাও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে বাড়েনি কর্মসংস্থান, বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান। প্রবৃদ্ধি নেই বেসরকারি খাতে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এর তথ্যানুযায়ী, দেশে শ্রমশক্তির ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। এছাড়া বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়েছে, গত পাঁচ বছরে দেশে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট।

অনানুষ্ঠানিক খাতে বেশকিছু ঝুঁকি থাকে। এখানে সাধারণত আইনি সুরক্ষা পাওয়ার মতো সুযোগ ও কাঠামো থাকে না। থাকে না চাকরির নিশ্চয়তা। যেকোনো সময় যেকোনো অজুহাতে কর্মী ছাঁটাই এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমের তুলনায় কম মজুরি প্রদান করা হয়। এদিকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক কাজের সুযোগ কম এবং বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছে কাজের অনিশ্চয়তা ও অধিক শ্রম শোষণ। যে কারণে দেশে সরকারি চাকরির প্রতি চাকরিপ্রত্যাশীদের ঝোঁক বেশি। ফলে বাড়ছে বেকারত্বের সংখ্যা। 

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন করা ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেকার থাকছেন। পাশের দেশ ভারতে এ হার ৩৩ শতাংশ। তাদের ভিন্ন একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীর ৬৬ শতাংশই বেকার। অর্থাৎ তিন ভাগের দুই ভাগই বেকার। আর মাত্র ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্য কোনো বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজের উদ্যোগে কাজ করছেন। দেশে বছরে চাকরিপ্রত্যাশী প্রায় ২০ লাখ মানুষ রয়েছে। কিন্তু মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাবে উচ্চশিক্ষা শেষে বাড়ছে বেকার সংখ্যা। আবার উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে উচ্চ শিক্ষিত তরুণরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেছেন ১৩ লাখ ৫৪ হাজার বাংলাদেশী।

বর্তমানে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ সরকারি চাকরি, বিশেষ করে নির্দিষ্ট একটি চাকরির প্রত্যাশা। যদিও এ চাকরির বাস্তবতা হলো এতে নিয়োগ প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ। উচ্চ শিক্ষা শেষে যখন একজন তিন-চার বছর এক চাকরির আশায় বসে থাকেন ফলে মধ্যবর্তী সময়ে তাকে তরুণ বেকার হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। 

অথচ একটি দেশের বেশির ভাগ কর্মসংস্থান গড়ে ওঠে বেসরকারিভাবে। একসময় শিক্ষিত তরুণ সমাজ বেসরকারি চাকরির প্রতি আকৃষ্ট ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় গত কয়েক বছরে সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে বহু গুণ। চাকরিপ্রত্যাশী মানুষের পছন্দের চাকরির তালিকার শীর্ষে তাই উঠে এসেছে সরকারি চাকরি। তবে বাস্তবতা এই, বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যার তুলনায় সরকারি চাকরির সংকুলান করা কঠিন। 

এ বাস্তবতায় দেশের শ্রমবাজারকে আনুষ্ঠানিকভাবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিক হলে তা আয়বৈষম্য কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে এবং নিশ্চয়তা প্রদান করবে। ড্যানিশ ট্রেড ইউনিয়ন ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির ‘লেবার মার্কেট প্রোফাইল: বাংলাদেশ ২০২৪-২৫’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকারের অনিশ্চয়তা শ্রমবাজারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা চাকরির চুক্তি, মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক বীমাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পান না। মজুরির দিক থেকে তারা প্রায় ৩৫ শতাংশ কম মজুরি পান।

দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়লে আশা করা যায় কেবল সরকারি চাকরিমুখী হয়ে চাকরিপ্রত্যাশীরা বসে থাকবে না। মেধা পাচার (ব্রেইন ড্রেন) কমে আসবে; দেশীয় শ্রমবাজারে তাদের যুক্ত করা সম্ভব হবে। এজন্য সরকারকে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। দেশে শিল্প ও কৃষি কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম খাত। তবে শিল্প খাতে কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও কমছে কৃষিতে। কেননা স্থানীয় অভিবাসনের মাধ্যমে গ্রামের কৃষক শহুরে শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। সুতরাং ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম এমন শ্রম খাত গড়ে তুলতে উদ্যোগী হতে হবে। এছাড়া শ্রমঘন শিল্প ও সেবা খাত প্রসারের বিষয়ে মনোযোগী হওয়া দরকার। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের শিল্পের প্রসারে কাজ করা যেতে পারে। যাদের পুঁজি নেই তাদের প্রণোদনাসহ ক্ষুদ্র ঋণদানের ব্যাপারে তৎপর হলে বেকার সংখ্যা হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় বেকার জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম করে তোলার প্রকল্প বেকারত্ব হ্রাসে একটি ভালো কৌশল হতে পারে। অবশ্য এক্ষেত্রে মাথায় রাখা প্রয়োজন কেবল কর্মক্ষম জনশক্তি যদি প্রয়োজনমাফিক দক্ষ না হয় তাহলে আশানুরূপ জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন ব্যাহত হবে। 

দেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দিন দিন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে তাই দক্ষ শ্রমজীবীর সংখ্যা বাড়ানো এক প্রকার আবশ্যক হয়ে উঠছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরিসহ সময়োপযোগী দক্ষ কর্মী গড়ে তোলায় এজন্য নজর দিতে হবে। শিক্ষা, দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। এতে কর্মপরিবেশের মান বাড়বে, উৎপাদশীলতা বৃদ্ধি পাবে; শ্লথ হয়ে পড়া অর্থনীতির গতিও বাড়বে।