ওটা একটা এআই ডেটা সেন্টার। পাশের পুরো শহরের তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ খরচ করছে। এ বিরোধটি হয়তো বিদ্যুতের শুল্ক কাঠামো, জোনিং ব্যতিক্রম এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন করিডোরের মতো কারিগরি ভাষার গ্যাঁড়াকলে পরিচালিত ও হিসাব করা হবে। তবে এর পেছনে রয়েছে এক অ-কারিগরি রাজনৈতিক প্রশ্ন: যারা ভবনটি তৈরি করেছেন, সেই কাউন্টিতে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে কি এখনো তাদের কোনো প্রয়োজন আছে? প্রশ্নটি কেবন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নয়। এটি আধুনিক গণতন্ত্র যে বোঝাপড়া বা ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

গণতন্ত্র কখনই ন্যায়বিচারের সন্ধান পাওয়া অভিজাতদের কোনো উপহার ছিল না। সংবিধান ও নির্বাচন হলো সীমিত শাসনের দৃশ্যমান যন্ত্রমাত্র। কিন্তু ক্ষমতাবানরা কেনইবা নিজেদের ওপর সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছিলেন? অধিকার অর্জিত হয়েছিল শ্রমিক, নারী, সৈন্য, ভিন্নমতাবলম্বী এবং এমন সব আন্দোলনের মাধ্যমে, যা বাদ দেয়ার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল। তাদের ওপর বস্তুগত নির্ভরশীলতা ওই বিজয়গুলোকে টেকসই করতে সাহায্য করেছিল। আধুনিক রাষ্ট্রে যখন এক দল অভিজাত যোদ্ধার বদলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় নিযুক্ত বাহিনী প্রয়োজন পড়ে, তখন নতুন সৈন্য, কর এবং ত্যাগ এর মতো ধারণা তৈরি হলো। এগুলোর পক্ষে শুধু মানুষের কিছুটা সম্মতি আদায় করে নিতে পারলেই হলো। যে জনগণকে কোনো রাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধ করতে, কর দিতে এবং ভোগান্তি সহ্য করতে বলা হয়, তারা স্বাভাবিকভাবেই একসময় জানতে চাইবে সেই রাষ্ট্রে তাদের স্থান কোথায়। একই ধরনের সমীকরণ দেখা গিয়েছিল শিল্পাঞ্চলগুলোতে। রোগব্যাধি তো কোনো সামাজিক শ্রেণীভেদ মানে না। পয়োনিষ্কাশন, বিশুদ্ধ পানি এবং কোয়ারেন্টাইন আইন ছিল মূলত এ সত্যের স্বীকৃতি যে শহরের দরিদ্রদের শ্বাস-প্রশ্বাস ধনী ব্যক্তিদের ওপরও গিয়ে পড়ে। অভিজাতরা যাদের ভালোবাসত না, সেই সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য অর্থ খরচ করেছিল, কারণ তাদের বাদ দিয়ে অভিজাতদের নিজেদের ভালো থাকা সম্ভব ছিল না।

একইভাবে হেনরি ফোর্ডের দৈনিক ৫ ডলার মজুরির নিয়ম কোনো দানশীলতা ছিল না। গণউৎপাদনের জন্য ওই সময় ব্যাপক ভোগ দরকার ছিল। শিল্প ব্যবস্থার এ মূল সত্যটি ফোর্ড উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন: মজুরি, ভোগ এবং উৎপাদন—এসবই একে অন্যকে টিকিয়ে রাখে। এআই এখন সেই গণতান্ত্রিক বোঝাপড়া দুর্বল করে ফেলার আশঙ্কা তৈরি করছে। এ চুক্তি বা বোঝাপড়া একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে না। সম্ভবত ভবিষ্যৎবাদীরা যেভাবে হুট করে ভাবছেন তেমন স্থূল আকারে কখনো যাবেও না। এ প্রযুক্তি হয়তো যত শ্রমিককে প্রতিস্থাপন করবে, তার চেয়ে বেশি শ্রমিকের দক্ষতা বাড়াবে এবং এমন সব নতুন পেশার জন্ম দেবে যার নাম এখনো কেউ জানে না। তবে রাজনৈতিক বিপদটা এ জায়গায় নয় যে প্রতিটি শ্রমিকই উদ্বৃত্ত বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। গণতান্ত্রিক চুক্তি ধ্বংস করার জন্য সাধারণ মানুষকে অর্থনীতিতে অপ্রয়োজনীয় করার কাজ এআইয়ের করতে হবে না, বরং অভিজাত শ্রেণী যে এদের ওপর নির্ভরশীল তার অনেক কিছুই কমিয়ে আনতে পারবে।

পুরনো পারস্পরিক নির্ভরতা এরই মধ্যে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। যুদ্ধগুলো এখন ক্রমেই পেশাদার সৈন্য, ঠিকাদার এবং ড্রোনের মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে। আর কয়েক দশকের স্বয়ংক্রিয়করণ বা অটোমেশন সমাজে এমন এক সংকীর্ণ শ্রেণী তৈরি করেছে যাদের অত্যন্ত মূল্যবান মনে করা হয়। ধরে নেয়া যাক, এ প্রযুক্তির প্রচারকরা যা যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তার অনেকটাই সত্যি এবং প্রতিষ্ঠানগুলো বিশালসংখ্যক শ্রমিককে কেবল সহায়তা করার বদলে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে শুরু করল। তার মানে এই নয় যে একটি স্বয়ংক্রিয় অর্থনীতি তার গ্রাহক হারিয়ে ফেলবে; রফতানি, সরকারি কেনাকাটা, ঋণ কিংবা সরাসরি আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে তা বাজারের চাহিদা টিকিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু যে সমাজে অধিকাংশ মানুষ এমন সম্পদ থেকে প্রাপ্ত ভাতার ওপর বেঁচে থাকে যা তারা নিজেরা ধারণ করে না বা নিয়ন্ত্রণ করে না, সেই সমাজ আর যে সমাজে মানুষ মজুরি অর্জন করে, কর দেয়, সংগঠিত হয় এবং উৎপাদন নিয়ে দরকষাকষি করে—এ দুয়ের রাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতার বণ্টন একেবারেই আলাদা। শেষের সমাজটি দ্বন্দ্ব, বৈষম্য এবং শোষণে পূর্ণ হলেও তা নাগরিকদের দরকষাকষির শক্তি দেয়, কারণ তাদের কাছে এমন কিছু থাকে যা তারা আটকে রাখতে বা প্রত্যাহার করে নিতে পারে। একটি ভাতাভিত্তিক সমাজ হয়তো পণ্যে অনেক বেশি সমৃদ্ধ হতে পারে, কিন্তু নাগরিক মর্যাদার দিক থেকে হবে নিঃস্ব। এটি মানুষের ভোগ করার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখলেও নাগরিকত্বের মূল ভিত্তিকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিতে পারে।

ডেটা সেন্টারগুলো তেলকূপ নয়। কিন্তু এর রাজনৈতিক অর্থনীতি অনেকটাই সেই ‘সম্পদ অভিশাপের’ মতো, যা দীর্ঘদিন ধরে খাজনাজীবী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত: যখন বিপুল পরিমাণ সম্পদ এমন সব উৎস থেকে তৈরি হয় যেখানে সাধারণ জনগোষ্ঠীর তেমন কোনো ধারাবাহিক অবদানের প্রয়োজন পড়ে না, তখন এক সংকীর্ণ শাসক ও মালিক গোষ্ঠীর বড় পরিসরে দরকষাকষি করার কোনো কারণ থাকে না। পুরনো স্লোগান ছিল ‘প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয়।’ কিন্তু এর উলটো পিঠের অন্ধকার সত্যটিও একইভাবে প্রযোজ্য: শাসক এবং মালিক শ্রেণী যখন আর ব্যাপকভিত্তিক কর ব্যবস্থা, শ্রম বা সাধারণ মানুষের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল থাকে না, তখন প্রতিনিধিত্বকে অধিকারের চেয়ে বরং এমন এক বাড়তি খরচ বলে মনে হতে থাকে যা তারা না দিলেই বাঁচেন।

আর এ কারণেই ডেটা সেন্টারের স্থানীয় রাজনীতি এতখানি গুরুত্বপূর্ণ। এ শিল্প-কারখানা তার প্রয়োজনীয় সবকিছু নিজে তৈরি করতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন জমি, পানি, বিদ্যুৎ এবং স্থানীয় মানুষের অনুমোদন। জনগণের প্রতিরোধ এরই মধ্যে স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে। গত মার্চে পরিচালিত গ্যালপ জরিপে দেখা গেছে, ৭১ শতাংশ আমেরিকান তাদের নিজস্ব এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করেছে, যার মধ্যে ৪৮ শতাংশ তীব্র বিরোধিতা প্রকাশ করেছে। এআইয়ের বিমূর্ত ধারণার বিষয়টি নিয়ে মানুষ হয়তো নিশ্চিত নয়, কিন্তু বর্ধিত বিদ্যুৎ বিল, পানি সরবরাহের জন্য হুমকি এবং এমন এক শিল্প সুবিধা, যা স্থানীয় মানুষের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের প্রায় কোনো সুযোগই নিশ্চিত করে না—এ বিষয়গুলো তারা খুব ভালোভাবে বোঝে। তবে স্থানীয় অনুমোদন কেবল ততক্ষণই দরকষাকষির শক্তি, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কাছে এ অনুমতি চাইতে বাধ্য করা হবে। কোনো সরকার যদি এ শিল্পের পক্ষে চরমভাবে অবস্থান নেয়, তবে তার হাতে অন্য অনেক হাতিয়ার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অধিগ্রহণ আইন, স্থানীয় প্রশাসনিক ক্ষমতা রদ করার কেন্দ্রীয় এখতিয়ার, কিংবা বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর জরুরি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। আর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস অন্তত এ বিষয়ে কোনো আশার বার্তা দেয় না যে ক্ষমতাবানদের চাহিদাকৃত জমি যাদের দখলে আছে কিন্তু ক্ষমতাবানদের দেয়ার মতো কোনো প্রয়োজন তাদের নেই—এমন সম্প্রদায়গুলোর কপালে শেষ পর্যন্ত কী জোটে।

এর সমাধান প্রযুক্তিকে থামিয়ে দেয়া, কিংবা যে শিল্প ব্যবস্থাকে এটি প্রতিস্থাপন করতে যাচ্ছে তাকে অহেতুক রোমান্টিক রূপ দেয়াও নয়। সেই পুরনো চুক্তিও কখনই যথেষ্ট ন্যায্য ছিল না। কিন্তু সাধারণ নাগরিকরা জাতীয় সম্পদের অংশ দাবি করার ক্ষেত্রে যদি শ্রম আর প্রধান ভিত্তি না থাকে, তবে নাগরিকত্বের জন্য আরেকটি নতুন ভিত্তি খুঁজে নিতে হবে। আর তার সূচনা হতে হবে স্বয়ংক্রিয়তার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদকে কোনো ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে না দেখে একটি পাবলিক বা জনস্বার্থের বিষয় হিসেবে গণ্য করার মধ্য দিয়ে। মূল অংকটি একেবারেই সহজ। সাধারণ নাগরিকদের কাছে এ যাবৎকাল পর্যন্ত থাকা প্রতিটি ক্ষমতার হাতিয়ার অর্থাৎ নিজের শ্রম, কর, সন্তান কিংবা ভোট আটকে রাখার ক্ষমতা—এর প্রতিটির পেছনেই এমন কেউ ছিল যার আপনার আটকে রাখা বিষয়টির প্রয়োজন ছিল। যেখানে কোনো প্রয়োজন নেই, সেখানে কোনো দরকষাকষির শক্তিও নেই। যেসব অধিকারের আর কোনো মূল্য বা তোয়াক্কা থাকে না, সেগুলো বিলীন হয়ে যায় না ঠিকই; তবে সেগুলো অনুগ্রহে পরিণত হয়, যা দানকারীর দয়ার ওপর টিকে থাকে। আপাতত উত্তর ভার্জিনিয়ার নাগরিকদের হাতে এখনো এমন একটি জিনিস রয়েছে, যা এ প্রযুক্তি শিল্প কোড লিখে তৈরি করতে পারবে না: তা হলো তাদের অনুমতি বা সম্মতি। মূল প্রশ্নটি হলো, তারা কি তাদের দরকষাকষির সেই শক্তিকে কেবল ‘না’ বলার জন্য ব্যবহার করবে নাকি একটি নতুন চুক্তির দাবি তুলবে? যন্ত্রের মালিকদের হয়তো একসময় কম শ্রমিকের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু তাদের কি কম নাগরিকের প্রয়োজন বোধ করার ছাড় দেয়া হবে?

[প্রজেক্ট সিন্ডিকেট-২০২৬ থেকে অনূদিত]

স্টিফেন হোমস: নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল’-এর আইনের অধ্যাপক এবং বার্লিনের আমেরিকান একাডেমির রিচার্ড হোলব্রুক ফেলো স্টিফেন হোমস ইভান ক্রাস্তেভের সঙ্গে যৌথভাবে দ্য লাইট দ্যাট ফেইল্ড: আ রেকনিং (পেনগুইন বুকস, ২০১৯) গ্রন্থের সহ-লেখক