এছাড়া গত অর্থবছর শেষে জিডিপি-বেসরকারি বিনিয়োগ কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে। এ খাতের কর্মকাণ্ডের গতি যে ধীর হয়েছে তা এ পরিসংখ্যান থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। এ খাতে কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের পরিসর বাড়ছে না। এর পেছনে উচ্চ নীতি সুদহারকে প্রধানতম দায়ী হিসেবে দেখে আসছেন ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা। যখনই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচন মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও এর অংশ হিসেবে ক্রমেই নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে, এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে, বিশেষ করে এর ফলে কীভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ কম। বাড়তি সুদহার ব্যবসায়ীদের ঋণ নেয়াকে নিরুৎসাহিত করে। তবে এর বিপরীতে তাদের উৎসাহ করতে পারে এমন নীতি ও পরিস্থিতি আছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এজন্য কেবল নীতি সুদহারকে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রধানতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এতে বরং অন্য সমস্যাগুলো কম মনোযোগ পায়। ফলে সেগুলোর সমাধানেও নজর দেয়া হয় না। যদিও সেগুলোর বড় দায় রয়েছে। যেমন জ্বালানি সংকট। একটি নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন করে সেটাকে উৎপাদনে নিতে হলে অনেক আনুষঙ্গিক উপাদান প্রয়োজন। এর মধ্যে অন্যতম হলো জ্বালানি। উল্লেখ্য, এরই মধ্যে দেশের অনেক শিল্প-কারখানা জ্বালানি সংস্থান না হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানা সীমিত আকারে চালু রাখা হচ্ছে। এটা একটা দৃশ্যমান সংকট।
এর বাইরে একটি বড় সংকট হলো চাহিদার ঘাটতি। যেকোনো ব্যবসা শুরু ও এর সম্প্রসারণের পেছনে চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেয়া হয়েছে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে। যদিও উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে এর বিশেষ প্রভাব পড়েনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে গড় মূল্যস্ফীতি আগের প্রান্তিকের তুলনায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২১ শতাংশে। অন্যদিকে দফায় দফায় বৃদ্ধি পাওয়া উচ্চ সুদহার ব্যবসা ব্যয় বাড়িয়েছে, যা পণ্যের বাজারদরে প্রভাব ফেলেছে; অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে গেছে। এতে জনগণের চাহিদা না কমলেও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। কারণ মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় মানুষের প্রকৃত আয় তেমন বাড়েনি। ফলে একপ্রকার আর্থিক চাপে মানুষের ভোগ কমেছে, যাকে প্রকারান্তরে চাহিদা হ্রাস হিসেবে ধরে নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ, বিশেষত বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি না হওয়ার বিষয়টি বোঝা সহজ হয়। উপরন্তু ব্যবসা-বিনিয়োগের একটি বড় অদৃশ্য কিন্তু প্রয়োজনীয় উপদান হলো আস্থা। এ আস্থা নানা কারণে অর্জন করা যায়, যার মধ্যে নীতি ধারাবাহিকতা, আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক খাতের সুশাসন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বিগত সময়ে এসব ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল, যা ক্রমেই বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। সুতরাং বেসরকারি খাতের চাপগুলোর দায় একক কোনো নীতির ওপর চাপানোর সুযোগ কম। এ খাতে ঋণ-বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে হলে কিছু সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যা ব্যবসার সম্প্রসারণকে সহজ করবে।
বর্তমান সরকার বেসরকারি খাতে স্বস্তি ফেরানোর অংশ হিসেবে এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি নীতি সুদহার কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এগুলোর মাধ্যমে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা, বিনিয়োগে উৎসাহ কতটা বাড়ানো সম্ভব না তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে বিদ্যমান অন্য সংকটগুলো দূর না হলে তা কাঙ্ক্ষিতরূপে বাড়বে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে কিছু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এসেছে। নীতি ধারাবাহিকতার আশা জেগেছে। তবে অর্থনীতির ঝুঁকি কমেনি, বরং স্থানীয় ও বৈশ্বিক কারণে উৎপাদনের জরুরি পণ্য তথা জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এখনো জ্বালানি সংকট তীব্র। চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে আস্থা জোগানো কঠিন হবে। এর বাইরে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ। এছাড়া দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি। সুতরাং সরকারকে একই সঙ্গে বেশকিছু সমন্বিত উদ্যোগের পথে হাঁটতে হবে।
এক্ষেত্রে অবশ্যই সর্বাগ্রে জ্বালানি নিরাপত্তায় অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। কীভাবে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো যায় ও নির্বিঘ্ন আমদানি সম্ভব হবে তা সরকারকে ভাবতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ দূর করতে কাজ করতে হবে। সেটি হলো বাজার ব্যবস্থাপনা। এক্ষেত্রে জ্বালানি পণ্যের দাম ও সবজির দাম কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাতে গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে।
এছাড়া দেশে ব্যবসা-বিনিয়োগ সম্প্রসারণে দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা বহু গবেষণায় উঠে এসেছে। সেগুলোর সমাধানও কাম্য। সব মিলিয়ে সরকারকে এমন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে হবেন যা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে এবং ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়ক হবে।










