বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর অধীন গঠন করা হয় নিম্নতম মজুরি বোর্ড। বোর্ডটি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। এ বোর্ড দেশের বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরির সুপারিশ করে থাকে। ওই শ্রম আইন অনুযায়ী এ সুপারিশ করে মজুরি বোর্ড। পরবর্তী সময়ে সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ন্যূনতম মজুরির হার উল্লেখ করে গেজেট প্রকাশ করে এবং তা কার্যকর হয়। বর্তমানে দেশের ৪৭টি শিল্পের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা আছে বলে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের তথ্যে দেখা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রচলিত ‍কৃষিকে এ কাঠামোর আওতার অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে কৃষি শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি পাওয়ার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। এমনকি কৃষি ও গৃহকর্মে নিয়োজিত শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়, সেটি স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। যদিও কৃষির অন্তর্ভুক্ত চিংড়ি, মৎস্য শিকার ট্রলার শিল্প, রাবার শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ শিল্পের জন্য ন্যূনতম মজুরি কাঠামো রয়েছে।

বাস্তবতা হলো প্রচলিত কৃষি খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর আওতায় না আনা গেলে শ্রমিকের সার্বিক সুরক্ষা অরক্ষিত থেকে যায়। কারণ তার জীবন-জীবিকার উৎস হলো এ কৃষি। তবে তার চেয়েও জরুরি বিষয় হলো কৃষি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে না পারাটা কৃষির বিকাশের পথেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এতে দেশের জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ দেশের প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনের খাত হলো প্রচলিত কৃষি। খাদ্যের বড় একটি অংশের জোগান আসে এ খাত থেকে। খাদ্যনিরাপত্তায় তাই কৃষি ও কৃষি শ্রমিকদের অবদান খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এছাড়া দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেক কৃষি খাতে নিয়োজিত। কিন্তু এখনো এ বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জন্য কোনো ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ না হওয়াটা সরকারের নীতি-কৌশলে বড় ধরনের দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। বিশেষ করে দেশের শ্রম আইনেও কৃষি শ্রমিককে সংজ্ঞায়িত করা হলেও মজুরি-সংক্রান্ত বিধান করা হয়নি। অথচ কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে সবচেয়ে জরুরি ছিল কৃষি ও কৃষি শ্রমিকের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া।

কৃষি শ্রমিকদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ন্যূনতম মজুরি হার নির্ধারণ না করায় তারা নানাভাবে শ্রমশোষণের শিকার হচ্ছেন। বাজার দরের ওঠানামা ও মৌসুম ভেদে কৃষিকাজের চাহিদার ওপর তাদের মজুরি নির্ভর করে—কখনো বেড়ে যায়, আবার কখনো কমে যায়। এছাড়া এ খাতে লিঙ্গভিত্তিক মজুরিবৈষম্যেও প্রকট। পুরুষ কৃষি শ্রমিকদের তুলনায় নারী শ্রমিকরা হরহামেশাই মজুরি কম পেয়ে থাকেন। সর্বদাই এক ধরনের অনিশ্চিত কর্মপরিবেশে কাজ করে যান তারা।

এ পরিস্থিতি কেবল তাদের অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তা নয়। এটি সামগ্রিকভাবে একজন কৃষি শ্রমিকের জীবনকে প্রভাবিত করে। মাঠে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই বজ্রপাত, সাপের কামড়, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। কিংবা কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের কারণে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েন শ্রমিকরা। একদিকে যেমন ন্যূনতম মজুরি কাঠামোয় তারা নেই, অন্যদিকে দুর্ঘটনায় তাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়লেও নেই রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা। ফলে কৃষি শ্রমিক ও তাদের পরিবারের আর্থিক সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থাই থাকে না।

অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর কৃষি খাতে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। বিশেষত ভারত, চীন, শ্রীলংকা, নেপাল, মিয়ানমারসহ বহু দেশ কৃষি শ্রমিকদের জন্য খাতভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি বহু আগেই নির্ধারণ করেছে। সেই সঙ্গে সেই মজুরি হার বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় হালনাগাদ করে চলেছে। এমনকি ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো দেশেও কৃষি খাতকে শ্রম সংরক্ষণনীতির আওতায় আনা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ এখনো কৃষক বা কৃষি শ্রমিককে মজুরি কাঠামো বা নীতিগতভাবে বিশেষ সুরক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারেনি। যে কারণে প্রতিনিয়তই গণমাধ্যমে খবর দেখা যায়—ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ফসল খাওয়ানো হচ্ছে গরু-ছাগলকে। এমনকি কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনাও এ দেশে বিরল নয়, যার অন্যতম কারণ তাদের পেশাগত সুরক্ষার অভাব।

২০১৮ সালে জাতিসংঘের ‘ইউএনড্রপ’ ঘোষণায় বাংলাদেশ কৃষক ও গ্রামীণ শ্রমজীবীদের অধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু সাত বছর পার হলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কার্যত কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অথচ কৃষি শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু ন্যায্য মজুরি দেয়া নয়; বরং তাদের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং পেশার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও যদি রাষ্ট্র এখনো কৃষি শ্রমিকের সুরক্ষা নিশ্চিতে এগিয়ে না আসে তবে ভবিষ্যতে এ খাতে শ্রমিক পাওয়াই কঠিন হয়ে উঠবে।

সরকার ও নিম্নতম মজুরি বোর্ডের এ বিষয়ে তৎপর হওয়া প্রয়োজন। কৃষি শ্রমিকদের জন্য পৃথক ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। নিম্নতম মজুরি বোর্ডের উচিত দ্রুতই কৃষি শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি হার সুপারিশ করা। এতে আশা করা যায় অন্তত তাদের শ্রমশোষণের পথ কিছুটা হলেও বন্ধ হবে। সেই সঙ্গে এ খাতের শ্রমিকদের লিঙ্গভিত্তিক মজুরিবৈষম্যও দূর করা সম্ভব হবে। এর বাইরে কৃষি শ্রমিকদের দুর্ঘটনায় সুচিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শ্রমিক দুর্ঘটনায় মারা গেলে তার পরিবারকে আর্থিক সুরক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষি শ্রমিকরা যেন দরিদ্রতার কারণে পেশা ছাড়তে বাধ্য না হন সে বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় থাকা প্রয়োজন।

প্রচলিত আছে, কৃষিই কৃষ্টির মূল। সেই কৃষ্টি বিনির্মাণের মূল কারিগর হলেন কৃষক বা কৃষি শ্রমিকরা। একসময় কৃষিতে শ্রমশক্তির আধিক্য ছিল। ২০০০ সালেও দেশের মোট শ্রমশক্তির মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ছিল কৃষি শ্রমিক, যার হার বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৪৫ শতাংশে। কৃষি খাতের বর্তমান ধারা চলমান থাকলে আগামীতে এ হার আরো কমে আসবে তা ধারণা করা যাচ্ছে। কৃষি শ্রমিকদের গুরুত্ব দিলেই কেবল এ নিম্নমুখী প্রবণতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় নীতিগত সুরক্ষা কৃষি খাতকে কর্মসংস্থান হিসেবে আকর্ষণীয় করে তুলতে সহায়ক হতে পারে।