দেশে একসময় বাড়িতে ধাত্রীর কাছে সন্তান জন্মদান স্বাভাবিক ছিল, যাকে বলা হয় স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারি। যদিও এর কিছু অসুবিধা ছিল। প্রসবকালীন এমন কিছু জটিলতা দেখা দিত যা ধাত্রীর পক্ষে এবং বাড়ির পরিবেশে সমাধান সম্ভব ছিল না। এতে প্রসূতি মা ও নবজাতকের মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটত। সেসময় মা ও শিশু মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বমুখী থাকার অন্যতম কারণও ছিল প্রসবকালীন জটিলতা। কালক্রমে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সম্প্রসারণ ঘটেছে। দেশেও স্বাস্থ্যসেবার পরিসর বেড়েছে। পুরো দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে গড়ে উঠেছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। একপর্যায়ে প্রসবকালীন জটিলতায় মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় গর্ভবতী মাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসকের পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণে ধাত্রীর দ্বারা শিশু জন্মানোর ব্যবস্থা করা হয়।
নরমাল ডেলিভারি শিশু জন্মদানের একটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি। এর বেশকিছু সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, প্রসব-পরবর্তী জটিলতা কম হয় এবং প্রসূতি মা মাত্র কয়েকদিনেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। এছাড়া নবজাতককে দ্রুত শাল দুধ খাওয়ানো যায়। আবার নরমাল ডেলিভারির খরচও অনেক কম। তবে এটিও ঠিক যে নরমাল ডেলিভারি সবসময় নিরাপদ হয় না। কিছু সময় এটি মা অথবা শিশু বা উভয়ের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এ ঝুঁকি থেকে মা ও শিশুকে বাঁচানোর উপায়ও বের করেছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান। সেটি হলো সি-সেকশন বা সিজারিয়ান ডেলিভারি। এটি করা হয় একজন দক্ষ প্রসূতিবিদের (অবসটেট্রিশিয়ান) মাধ্যমে। কয়েকটি ধাপে এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। প্রসূতি মা বা শিশুর স্বাভাবিক ডেলিভারিতে কোনো সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি থাকলেই কেবল সিজারিয়ান ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নেয়া সমীচীন। কিন্তু সমস্যা হলো জরুরি প্রয়োজন ছাড়াই দেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির প্রবণতা বেড়েছে। এ পদ্ধতিতে সন্তান জন্মদানের হার গত এক যুগে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১২-১৩ সালে এ হার ছিল ১৯ দশমিক ১ এবং ২০১৯ সালে ৩৬ শতাংশ। শহরাঞ্চলে অর্ধেকেরও বেশি নারী সি-সেকশন পদ্ধতিতে সন্তান প্রসব করেন। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও উচ্চশিক্ষিত নারীদের মধ্যে এ হার আরো বেশি। শুধু শহরেই নয়, গ্রামাঞ্চলেও সিজারিয়ান প্রসবের হার ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ‘মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে-২০২৫ (এমআইসিএস বহুনির্দেশক গুচ্ছ জরিপ)’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এ পরিসংখ্যান দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১০-১৫ শতাংশের বেশি প্রসূতি মায়ের সিজারিয়ানের প্রয়োজন হতে পারে না। এ পদ্ধতির কোনো বাড়তি সুবিধাও নেই। বরং বাড়তি অসুবিধা আছে। এটি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পদ্ধতি হলেও অপ্রয়োজনীয় সিজার মা ও নবজাতকের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে—প্রসব পরবর্তী জটিলতা, সুস্থ হতে দীর্ঘ সময়, ভবিষ্যৎ গর্ভধারণে সমস্যা, ব্যয়বহুল চিকিৎসা ইত্যাদি। এর পরও দেশে সি-সেকশন বাড়ছে বহু কারণে। প্রথমত, সরকারি তদারকির ঘাটতি। অর্ধেকের বেশি সিজারিয়ান ঘটে বেসরকারি হাসপাতালগুলোয়। কিন্তু কেন সি-সেকশন করা হয়েছে সে বিষয়ে মোটেও তদারকি নেই। দ্বিতীয়ত, এর একটি বাণিজ্যিক দিক রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক স্বার্থে রোগীকে ভুলভাবে সি-সেকশন করানো হচ্ছে। তৃতীয়ত, স্বাভাবিক প্রসব (এনভিডি) করানোর মতো পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল, বিশেষত মিডওয়াইফ ও ধাত্রী সরকারি বা বেসরকারি কোনো স্বাস্থ্য খাতেই নেই। পাশাপাশি মায়েদের ভয়, সচেতনতার অভাব এবং যথাযথ প্রসব-সংক্রান্ত পরামর্শ না পাওয়ার কারণে সিজারিয়ানের হার বেড়েছে।
অথচ ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাভাবিক প্রসবের হার বৃদ্ধি ও অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশন কমানোর জন্য গাইডলাইন তৈরি করেছিল। ২০২৩ সালে হাইকোর্ট ওই গাইডলাইনকে আইনগত বৈধতা দিয়ে সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালকে তা মেনে চলার নির্দেশ দেয়। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। গাইডলাইনে হাসপাতালগুলো তদারকির আওতায় আনা, দক্ষ মিডওয়াইফের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রসব নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া হয়েছিল, যার কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি। এগুলো বাস্তবায়ন হলে স্বাভাবিক প্রসবের হার দেশে ঊর্ধ্বমুখী থাকত।
একসময় চীনে সিজারিয়ানের হার বেশি ছিল। দেশটি ২০০১ সালে এটি নিয়ন্ত্রণে নীতি প্রণয়ন করে। ১০ বছর মেয়াদি সে পরিকল্পনায় গর্ভবতী নারীদের প্রাকৃতিক উপায়ে সন্তান জন্ম দেয়া এবং শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য বাধ্যতামূলক ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়। সেই সঙ্গে প্রশিক্ষিত ধাত্রীর সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। হাসপাতালগুলোকে সরকারের কাছে নিয়মিত জবাবদিহি করতে হয়। কোনো হাসপাতালে সিজারিয়ানের সংখ্যা বাড়লে সেই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলসহ নানা ধরনের শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি অনেক হাসপাতাল এ কারণে বন্ধও করে দেয়া হয়েছিল। এসব নীতি বাস্তবায়নের ফলে ২০১২ সাল থেকে চীনে সিজারিয়ানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করে। দেশটিতে এখনো হাসপাতালে সিজার করতে ইচ্ছুক মায়েদের একেবারে শেষ পর্যায়েও নিরুৎসাহিত করেন চিকিৎসক ও নার্সরা। অথচ দেশে সিজারিয়ান নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যমান নীতিমালার বাস্তবায়ন নেই। অন্যদিকে স্বাভাবিক প্রসব উদ্বুদ্ধকরণে কার্যকর নীতিমালাও নেই। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
প্রথমত, সিজারিয়ান-সংক্রান্ত গাইডলাইন ও আদালতের নির্দেশনা দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় নিয়মিত অডিট, রিপোর্টিং নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে শাস্তির আওতায় আনা আবশ্যক। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ এবং ধাত্রীর সংখ্যা বাড়ানোয় মনোযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করার জন্য সঠিক প্রসব-পরামর্শ প্রদানে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োজন করতে হবে। পরিবার ও নারীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসবে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন।
সন্তান জন্মদান একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়াকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল, ব্যয়বহুল ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ করে ফেলা মোটেও সমীচীন নয়। তাই অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান বন্ধে যথাসম্ভব সচেষ্ট থাকা আবশ্যক।










