অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সংযোগের এটা প্রথম উদ্যোগ বলা যায়। আমরা যে সমস্যাটার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম সেটা হলো সরকারের সঙ্গে এনগেজমেন্টের সুযোগ পাচ্ছিলাম না। ব্যক্তি খাতের সঙ্গে যদি এনগেজমেন্ট না হয় তাহলে তাদের ভাবনাগুলো সম্পর্কে নীতিনির্ধারকরা জানতে পারবেন না। পলিসি বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা দেখা দিতে পারে। কিংবা সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না।
আমি যেহেতু জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাই সে বিষয়েই আমার আলোচনা রাখতে চাই। এ বিষয়ে দ্বিমত করার সুযোগ নেই যে জ্বালানি হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান চালিকাশক্তি। জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহে আমাদেরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে এ জ্বালানি সরবরাহ যেকোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে শিল্প, অর্থনীতি, ব্যবসা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা যত চেষ্টা করি না কেন অন্যভাবে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এখানে গতিশীলতা থাকলেই ব্যাংকগুলোয় লেনদেন সচল থাকবে। এজন্য জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এ খাতের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের কী প্রত্যাশা? সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে কোন পদক্ষেপ নিতে পারে? অনেকে অনেক সাজেশন দেবেন। আমি বলব, সংস্কারকাজগুলো অন্তর্বর্তী সরকার হাতে নিতে পারে। পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার তা চালু রাখতে পারে। এক বছর বা তিন বছর যা-ই হোক না কেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কারকাজ হাতে নেবে, আমরা আশা করব, তা যেন রাজনৈতিক সরকার চালু রাখে। সংস্কারের অনেক জায়গা আছে, সবগুলোয় হয়তো হাত দেয়া যাবে না। যেসব বিষয়ে সর্বসম্মত ঐকমত্য আছে, অন্তত সেগুলো তো শেষ করা যেতে পারে।
জ্বালানি খাতের কথা যদি বলি, তাহলে সেখানে শুরুতে বলব তেলের কথা। ১৯৬৮ ইস্টার্ন রিফাইনারি চালু হয়েছিল যেটা বর্তমানে মৃতপ্রায় অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। এর সক্ষমতা হচ্ছে দেড় মিলিয়ন টন অপরিশোধিত তেল শোধনের। এই রিফাইনারিটি এমনভাবে অচল যে সব ধরনের অপরিশোধিত তেল শোধন করতে পারে না। এখন পর্যন্ত অ্যারাবিয়ান লাইট ও মুরবান আবুধাবি—এ দুটো ছাড়া আমরা অন্য কোনো ক্রুড অয়েল শোধন করতে পারি না। এই রিফাইনারি পরিচালনায় আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে ৩০ শতাংশ। রিফাইনারিটি পুরোপুরি সচল ও শক্তিশালী করতে গত ১৫-২০ বছরে বাংলাদেশ সরকার কোনো চেষ্টা করেনি। কেন করেনি তা জানি না। কোনো দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য রিফাইনারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক চেষ্টা করার পরও তা হয়নি। যেহেতু ক্রুড অয়েল, যেহেতু লাইটেনিং করে নিয়ে আসে, সেজন্য এসপিএম লাইন করা হয়েছে। কিন্তু এটাও ঠিকমতো কাজ করছে না। ৬০০-৭০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু এখনো তা ফল দিতে পারেনি। এই ক্রুড অয়েল মহেশখালীতে ডিসচার্জ করা এবং রিফাইনারিতে একটি ডিস্টিলেশন কলাম যুক্ত করা দরকার। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের একটা আধুনিক রিফাইনারি করা উচিত। এ আধুনিক রিফাইনারি হবে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। তখন প্রশ্ন আসবে—বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে তো এটা? আমি মনে করি রিফাইনারি হলে, পর্যাপ্ত স্টোরেজ থাকলে আমদানিকারকরা পর্যাপ্ত আমদানি করতে পারবে, শোধন করতে পারবে এবং বিতরণ করতে পারবে। এ উদ্যোগটা কোনো কারণে শুরু হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার এটা শুরু করে দিয়ে যেতে পারে। আপনারা স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে পারেন। এটা করতে পারলে আমাদের জন্য ভালো একটি শুরু হবে বলে মনে করি।
আমরা অনেক সময় বড় অংকের অর্থ ব্যয় করি, কিন্তু কী কারণে করি তা জানি না। যেমন ক্রুড অয়েল নিয়ে আসার জন্য আমাদের পতাকাবাহী জাহাজ রয়েছে। আবার প্রশ্নবিদ্ধ দামে ছয়-সাতটা জাহাজ বিএসসি কিনতে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমাদের তো জাহাজ কেনার দরকার নেই। জ্বালানি ক্ষেত্রে কোনটায় আমরা অগ্রাধিকার দেব তা ঠিক করতে হবে। আমাদের জ্বালানি খাতে কোন কোন প্রজেক্ট বেশি প্রয়োজন তা চিহ্নিত করতে হবে! কেন রিফাইনারিটা আধুনিক হবে?
দ্বিতীয় আরেকটা বিষয় নিয়ে বলতে চাই, তা হলো—আমরা মুখে বলি একটা, কাজ করি আরেকটা। সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের লোকজনই বলে লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ড দরকার। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত এ আমদানি প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করেনি। আমরা চাই ইনক্লুসিভ (অন্তর্ভুক্তিমূলক) ব্যবসা। চলুন আমরা একই সময়ে আমদানি ও বিতরণ করি। অর্থনীতিকে বড় করতে চাইলে এর বিকল্প নেই।
এখানে অনেক ব্যবসায়ী আছেন যাদের অনেক জাহাজ আছে, আমারও আছে। জাহাজের জন্য এক ধরনের মেরিন ফুয়েল প্রয়োজন। বিপিসি সেটা ইমপোর্ট করতে পারে আবার অনেক সময় পারে না। আমরা অনেক দিন ধরে বলে আসছি যে এটা বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দেন। এটা দেশী-বিদেশী জাহাজের জন্য সহজলভ্য করে দেন। জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধির অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটিও একটি। এটা আমদানির অনুমতি কেন দেয়া হয়নি জানি না। আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু সরকারের সঙ্গে এনগেজ হতে পাচ্ছি না, সাক্ষাৎও পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারকে তো আমাদের সঙ্গে বসতে হবে, কথা বলতে হবে। জ্বালানি এত গুরুত্বপূর্ণ একটা খাত, সে বিষয়ে কথা না বললে তো সুরাহা হবে না।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ খাত হচ্ছে গ্যাস। আমাদের গ্যাসের মজুদ সংকুচিত হচ্ছে, নতুন গ্যাস ক্ষেত্রে অনুসন্ধান দরকার, আহরণ দরকার। গ্যাসের ক্ষেত্রে যে সমস্যা তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাঁচ বছরের জন্য বড় বড় কোম্পানি আসবে না, বিনিয়োগ করবে না। তাদের সময় দিতে হবে তাহলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আসবেন। তারা অনশোর ও অফশোর এক্সপ্লোরেশনে (অনুসন্ধান) যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করবেন।
কোনো দেশে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা থাকতে পারে। সেটা গ্যাস হতে পারে, কয়লা হতে পারে কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানি। সব ধরনের জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ উন্নয়ন নিশ্চিত করাই হবে লক্ষ্য। এক্ষেত্রে আমাদের ল্যান্ড বেজড এলএনজি টার্মিনালে জোর দিতে হবে।
আমাদের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরও) বর্ষা মৌসুমে দু-তিন মাস ও ড্রাই ডকিংয়ের কারণে দুই মাস চালাতে পারে না,৷ তাদের দৈনিক গড় ব্যয় হচ্ছে ২ লাখ ৩৭ হাজার ডলার। চার মাস বসিয়ে রেখে আপনাকে গুনতে হচ্ছে ৬ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সরকার কেন ল্যান্ড বেজড এলএনজি টার্মিনাল করছে না? এটা তো অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল! ল্যান্ড বেজড টার্মিনাল হলে স্টোরেজ করা যাবে, এক্সপোর্ট করা যাবে। অর্ধেকের বেশি ব্যয় কমে যাবে। বে-টার্মিনাল নিয়ে সরকারকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকতে দেখছি। গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে ইন্টারমিডিয়ারি টার্মিনাল আপনার লাগবে না? কর্ণফুলী নদীতে যে জেটিগুলো আছে সেগুলো প্রায় কাজের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
আরেকটা বিষয় নিয়ে বলে আমি আলোচনা শেষ করছি। সরকার কতগুলো অটোমেটিক প্রাইসিং ঠিক করেছে জ্বালানির ক্ষেত্রে। আমরা মনে করি এটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নয়। এ মূল্য নির্ধারণ কীভাবে হচ্ছে সেটা আমরা বুঝতে পারছি না। এ প্রাইস নির্ধারণ যদি স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটিক) না হয় তাহলে তা ঠিকভাবে কাজ করবে না। আমাদের এলপিজি বাজার অনেক বড় হয়েছে। এখানে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে। তবে মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা দরকার। মনে হচ্ছে, বেসরকারি খাত বাংলাদেশের শত্রু। আমাদের সঙ্গে এনগেজ হচ্ছেন না, এমনকি বোঝারও চেষ্টা করছেন না নীতিনির্ধারকরা। আমি মনে করি, এমনভাবে চলতে থাকলে এলপিজি মার্কেট কয়েক বছরের মধ্যে একেবারে অচল হয়ে যেতে পারে। আমি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এটাই প্রত্যাশা করছি, তারা ভালো কিছুর সূচনা করে যাবে যা পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার এগিয়ে নিয়ে যাবে।
আজম জে চৌধুরী: চেয়ারম্যান, ইস্ট কোস্ট গ্রুপ
[১১ নভেম্বর বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈষম্য, আর্থিক অপরাধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির নিরাময়’ শীর্ষক তৃতীয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৪-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]










