বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের প্রতি ক্রমবর্ধমান যৌন নির্যাতনের একটি অন্যতম ভয়াবহ রূপ ধর্ষণ। ধর্ষণ এমন এক সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে, যেখানে এ ধারণাকে বিদ্যমান সামাজিক রীতিনীতির একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে ধরা হয়। ধর্ষণ সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন আচরণগত নিদর্শন হলো প্রায়ই অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ (ভিকটিম ব্লেমিং), নারীর চরিত্র অথবা পোশাককে দায়ী করা (স্লাট শেমিং), ধর্ষণকে তুচ্ছ করা এবং যৌন নির্যাতনের ফলে সৃষ্ট ক্ষতিকে অস্বীকার করা। ধর্ষণের এ সংস্কৃতির সঙ্গে নানা কারণ জড়িত, বিশেষ করে সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান অসম অবস্থান, যেখানে নারীর স্বাধীনতা ও যৌনতার ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জনের জন্য ধর্ষণকে একটি সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নারীর শরীর এবং তাদের যৌনতার সঙ্গে ‘সম্মান’ সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে, যে কারণে যুগ যুগ ধরে নারীদের ওপর যৌন নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের সম্মানহানি করা হয়ে থাকে। নিপীড়নের এ চর্চা মূলত জেন্ডার বৈষম্যমূলক কাঠামোর বহিঃপ্রকাশ। 

ধর্ষণের এ সংস্কৃতিতে নারী যেমন বেড়ে ওঠে, ঠিক তেমনি সেই সংস্কৃতির অংশ হিসেবে পুরুষও ধর্ষণ বা নারীর প্রতি সহিংসতা সাধারণীকরণকে আত্মস্থ করেই বেড়ে ওঠে। সব পুরুষ হয়তো ধর্ষক নন, কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা পুরুষকে ঐতিহাসিকভাবে আত্মস্থ করতে শেখায় যে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত অথবা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিতে যেকোনো সময়ে শ্রেণী, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে নারীর শারীরিক সীমা লঙ্ঘন করা সম্ভব। এ ধরনের আধিপত্যবাদী পৌরুষের বহিঃপ্রকাশ আজ সমাজের সর্বস্তরে প্রতীয়মান। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আধিপত্যবাদী পৌরুষের বহিঃপ্রকাশের দায় কি শুধু ব্যক্তি পুরুষের? নাকি এ ধরনের পৌরুষ নির্মাণে সমাজ ও রাষ্ট্র অনুঘটক হিসেবে কাজ করে? পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র নারীকে যতখানি নারী হতে শেখায়, ঠিক সেভাবেই শেখায় পুরুষকে পুরুষ হতে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবার ও সমাজের সর্বস্তরে পুরুষের কর্তৃত্ব এবং নারীর কাঠামোগত অবদমন প্রতিষ্ঠা পায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সামাজিকীকরণের এ প্রক্রিয়ায় বেড়ে ওঠা নারীও পিতৃতন্ত্রের ক্ষমতার ধারণাকে বহন করে এবং চর্চা করে। 

২০২৪ সালের দ্বারপ্রান্তে এসেও  যখন সারা বিশ্বে নারী শিক্ষা, জেন্ডার উন্নয়ন, নারীর কর্মসংস্থান, জেন্ডার সমতা ধারণার জয়জয়কার এবং টেকসই উন্নয়নের জোয়ার জেগেছে, তখন প্রশ্ন জাগে সত্যিকার অর্থে আমরা কতদূর এগোতে পেরেছি। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই আমরা দেখতে পাই একাধিক নারী ও শিশুর প্রতি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা। বিগত কয়েক বছরে দেশে ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ২০২৪ অনুযায়ী, গত মে ও জুনে ৬২০ জন নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ধর্ষণের সংখ্যা ৯৪টি, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের সংখ্যা ২৭টি, ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা পাঁচটি, ধর্ষণের চেষ্টার সংখ্যা ৫০টি এবং যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৬২টি। যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তারা মূলত নারী, শিশু ও কিশোরী। এমনকি প্রতিবন্ধী এবং বয়স্ক নারী ও শিশু এ নির্যাতনের হাত থেকে বাদ যায়নি। দিন দিন নারী ও শিশু নির্যাতনের ধরন আরো অমানবিক এবং হিংস্র হচ্ছে, যেমন বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করা, গলার হাড় ভেঙে ফেলা, পেলভিসের হাড় ভেঙে ফেলা, যৌনাঙ্গে কোনো পদার্থ ঢুকিয়ে দেয়া, শ্বাসরোধে হত্যা, পুড়িয়ে মেরে ফেলা এবং মৃতদেহকে ধর্ষণ করা। সম্প্রতি আমাদের প্রতিবেশী দেশেও একজন নারী চিকিৎসকের ওপর নৃশংসভাবে গণধর্ষণ এবং হত্যা সংঘটিত হয়েছে। দেশে ও বিদেশে এ ধরনের পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় আমরা মর্মাহত। 

সাধারণত এ ঘটনাগুলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, নারীর অধস্তন অবস্থা এবং বিচার বিভাগের অকার্যকারিতা বা দীর্ঘসূত্রতার দিকেই আঙুল তোলে। এছাড়া অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার পেছনে তদন্তে দেরি বা গাফিলতি, ধর্ষণের প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাওয়া অথবা ক্ষমতাশালী অভিযুক্তদের প্রভাবে প্রমাণ নষ্ট করে ফেলার নজিরও দেখা যায়। আর তাই আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার আজও আলোর মুখ দেখেনি। বরং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং ধর্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত সামাজিক লজ্জা উল্টো ভুক্তভোগী এবং তার পরিবারকে বিভিন্নভাবে হয়রানির সম্মুখীন করে। আমাদের উদ্বেগের প্রতিফলন হয় তখনই যখন আমরা ভাবি সমাজে কোথায় আমরা বারবার হেরে যাচ্ছি! কেন আমাদের সামাজিকতায়, আন্তঃসম্পর্কগুলোর মধ্যে লুক্কায়িত অপরাধীদের চিনতে পারছি না? ধর্ষণের পুনরাবৃত্তি আজ নতুন নয়, তবু কেন রাষ্ট্র এবং বিচার ব্যবস্থার বোধোদয় হয় না? 

বাংলাদেশের সংবিধান যেখানে গণজীবনের সর্বত্র নারী ও পুরুষের সমান অধিকার লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করে এবং জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশ দেয়, সেখানে ধর্ষণ বা যেকোনো ধরনের যৌন নির্যাতন নারীর বৈষম্যহীন পথচলা এবং উন্নয়নের ধারণার পথে অন্তরায়। নারীরা পরিবার, পথঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহন এবং কর্মক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয় যা সার্বিক নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পাশাপাশি নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাধার সৃষ্টি করে। নারীদের অনিরাপত্তা, বিদ্যমান বৈষম্য, নির্যাতন ও আইনের শাসনের দুর্বল প্রয়োগের দায় সমাজ ও রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না। আর তাই চলমান অসমতা ও বৈষম্যমূলক কাঠামোকে পরিবর্তনের জন্য নারী-পুরুষের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় জেন্ডার সংবেদনশীলতার প্রয়োজন রয়েছে। তেমনিভাবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর সর্বস্তরে জেন্ডার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত না হলে ধর্ষণের মতো অপরাধ নির্মূল অসম্ভব। সে লক্ষ্যে, জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতার সামাজিক পদ্ধতিগত সমস্যাগুলোর ওপর আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। যৌন নির্যাতন রোধে আইনের প্রয়োগ, সংস্কার এবং বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে পদক্ষেপ নিতে হবে। উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক হিসেবে সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, একটি জেন্ডার সংবেদনশীল সমাজ গঠনে কার্যকর ও সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেয়া হোক, যাতে ধর্ষণের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের কাছে আমাদের প্রত্যাশা একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনে তারা সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। 

ড. তানিয়া হক, ড. সাবিহা ইয়াসমিন রোজী, অদিতি সবুর, মো. মাইনুল ইসলাম, গুলে জান্নাত এবং আফসানা ইসলাম: শিক্ষক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়