ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি জার্মানিও আজ রাজস্ব সংকটে টালমাটাল—পেনশন, কল্যাণ ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ক্রমবর্ধিত দায় রাজনীতিকদের পক্ষে না কমানো যাচ্ছে, না কর বাড়িয়ে অর্থ জোগানো যাচ্ছে। কেউ কেউ তাই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে গণতন্ত্র আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারে না, কারণ জনগণ নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে জীবনযাপনে রাজি নয়। কিন্তু এর বিকল্প ব্যাখ্যাও রয়েছে: আমাদের রাজস্ব সংকটের কারণ আমরা গণতন্ত্রে নয়, বরং নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে চলা একধরনের অলিগার্কিক শাসনে বাস করছি।
মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন সেই সব মানুষকে ক্ষমতার আসনে বসায় যাদের হাতে বাড়তি সময় ও অর্থ থাকে, যা প্রকৃত ক্ষমতায়িত হওয়ার সঙ্গে এক নয়। নির্বাচনে জিতলেও তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার কারণে মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; আবার বাজেট আগেই ভারাক্রান্ত, আর বন্ড-বাজারের ভয় দেখিয়ে রাজস্ব নীতিতেও তাদের হাত-পা বেঁধে রাখা হয়। এসব পরিস্থিতিতে প্রতিভাবান, যোগ্য মানুষ কেন রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন না—অন্যের হাতে ক্ষমতা থেকে নিজের অসহায়ত্ব দেখার চেয়ে তারা অন্য পথ বেছে নেন।
এদিকে আসল ক্ষমতা প্রয়োগ হচ্ছে অন্যত্র। ফ্রান্স এখন ইউরোপের রাজস্ব সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা করে নিয়েছে। সেখানকার শীর্ষ ৫০০ পরিবারের সম্পদ ১৯৯৬ সালে যেখানে ছিল জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। পুরো ইউরোপেই যেন একই প্রবণতা—জার্মানি হোক বা নরডিক দেশ, কোথাও ব্যতিক্রম নেই।
এ বিপুল সম্পদ বৃদ্ধি ধনীদের উৎপাদনশীলতা বা উদ্যোক্তা প্রতিভার অসাধারণ বিস্ফোরণে হয়নি। অন্যতম কারণ হলো প্রকৃত মজুরির দীর্ঘমেয়াদি পতন, জনগণের বড় অংশের জীবনে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি; রাষ্ট্রীয় খাত থেকে বড় করপোরেশনগুলোর নতুন উপায়ে মূল্য আহরণ, যা জনসেবা খারাপ করেছে এবং সরকারের ভবিষ্যৎ দায় বাড়িয়েছে এবং কর ফাঁকির নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি, যা কেবল সম্পদশালীদেরই নাগালে।
পুঁজির মালিকরা শ্রম ও রাষ্ট্র—উভয়কেই ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে শোষণ করছে। তারা যে ‘বীমা প্রিমিয়াম’—অর্থাৎ কর দিতে রাজি ছিল, সেটিও এখন কমাতে চাইছে। অথচ রাষ্ট্রকেই আবার তাদের উদ্ধারে ছুটতে হয়, তাদের দেয়া নিম্নমানের বেসরকারি সেবার জন্য অতিরিক্ত মূল্য গুনতে হয়। অথচ এরা সাবেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পরিষেবাগুলো নিজেদের করে নিয়েছে। উচ্চমূল্য দিতে হলেও গ্রাহকরা উচ্চমূল্যের সেবা পাচ্ছেন না। বরং দিন দিন এ কার্টেলগুলো সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
জনসমর্থন কমতে থাকলে সরকার জরুরি ভিত্তিতে ভবিষ্যৎহীন রাষ্ট্রকে আরো অনুদান, পেনশন দায় ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় চাপিয়ে দেয়; যেগুলোর জন্য অর্থ জোগানোর সামর্থ্য নেই বললেই চলে। বন্ড-বাজার যখনই গরম হয়ে ওঠে, গণমাধ্যম তখন পুরনো ফুটেজ দেখায়। এর মধ্যে অন্যতম জায়গা পায় গ্রিসের বিক্ষোভ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও অন্যান্য বিদেশী ঋণদাতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দাঙ্গায় রূপ নিয়েছিল। গণমাধ্যমের বার্তা যেন খুব পরিষ্কার: ‘সবারই কোমর বাঁধতে হবে, নয়তো আমরা গ্রিস হয়ে যাব।’
কিন্তু ‘সবার’ মানে সত্যিই কি সবাই? ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর নৈতিক যুক্তি স্বীকার করলেও ধনকুবেররা হুমকি দেন—কর দিলে তারা দুবাই, মোনাকো, কিংবা হয়তো মঙ্গল গ্রহেই চলে যাবেন। রাজনীতিকরা ধরে নেন এটা ভয়াবহ হবে, তাই সম্পদ কর প্রস্তাব মুহূর্তেই সরিয়ে রাখেন।
এ একতরফা শ্রেণীযুদ্ধে সরকার নিজেকে আবদ্ধ পায় দুদিকে—অস্থির বন্ড-বাজার এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও জনতুষ্টিমূলক অঙ্গীকার। রাজনীতিবিদরা তখন জনগণকে উসকে দেন ট্রান্সজেন্ডার, মুসলিম, ইহুদি অভিবাসী উদ্বাস্তুদের দিকে। যাকে পাওয়া যায় তাকেই বলির পাঁঠা বানিয়ে সাময়িক সংকট কাটানোর চেষ্টা যেন।
ক্ষমতায় এসেই এরা আগের প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়। স্থায়ী রাজস্ব সংকটের অজুহাতে আগের সরকারগুলোর মতো সামাজিক নিরাপত্তা খাত সংকুচিত করে; শোষিত, করপীড়িত, কম বেতনের ও বঞ্চিত মানুষদের আবারো দেশপ্রেমের পাঠ শোনানো হয়। অথচ এসব কাটছাঁট কখনই রাজস্ব ঘাটতি কমায় না কারণ ধনীদের জন্য তারা করছাড়ও দিতে থাকে, যারা কর ফাঁকি দেয়াকে একধরনের খেলায় পরিণত করেছে।
নিজেদের সমর্থকদের উত্তেজিত রাখতে তারা নির্মমতার প্রদর্শনী সাজায়। মধ্যযুগীয় কর্তৃত্ব, সামরিকতা, পুরুষতন্ত্র ও ঈশ্বরতত্ত্বে ভরা দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। এ অবস্থায় উদারতাবাদকে দেখা হয় অভিজাতদের লুটপাটের স্বাধীনতা হিসেবে; আর ‘এক জাতি, এক দল, এক নেতা’—এই স্বৈরতান্ত্রিক স্লোগান হয়ে ওঠে তাদের নতুন আদর্শ।
এ বর্বর অতীতের পুনরুত্থান ঠেকাতে ভালো মানুষ রাস্তায় নামে, ‘নো কিংস’ (কোনো রাজা চাই না) স্লোগান তোলে। দৃশ্যটি অনুপ্রেরণাদায়ক হলেও আশাবাদ জোগায় কম।
এ ধরনের মানবতাবাদী ভাষণ ও গরম সম্পাদকীয়গুলো পড়লে যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো আত্মসমালোচনার অভাব। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষমতায় ঠেলে দিয়েছিল যেসব ‘ডেমোক্র্যাট ব্যারন’, যারা রিপাবলিকানদের সঙ্গে মিলে অর্ধশতাব্দী ধরে রাষ্ট্রকে দুর্বল করেছে, শ্রমজীবীকে পিছিয়ে দিয়েছে, অনিশ্চয়তায় ডুবিয়ে রেখেছে—তাদের দায় কোথায়?
যদি অলৌকিকভাবে মধ্যপন্থীরা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে, তাহলে কী ঘটবে? সাম্প্রতিক ইতিহাসেই এর নজির দেখতে পারব। যুক্তরাষ্ট্রে মূলধারার ডেমোক্র্যাট, ফ্রান্সে ইমানুয়েল মাখোঁ, যুক্তরাজ্যে কিয়ার স্টারমার—সবাই নীতির জায়গায় এক। জনগণকে বলা হবে পেনশনকে আর ভোক্তা মূল্যসূচকের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা যাবে না; কর্মক্ষম ভাতা কাটছাঁট করা হবে ‘অলসতা’ ঠেকাতে।
রাজাকে কেন্দ্র করে সমালোচনা করলেও ব্যারনদের ছাড় দিলে ট্রাম্প বা তার অনুসরণকারীদের ‘সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতা’ ঠেকানো যাবে না। ব্যারনরা যদি প্রশ্নহীন ক্ষমতা উপভোগ করতে থাকেন ততদিনই রাজা নিরাপদ থাকেন।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ইয়ানিস ভারুফাকিস: গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক










