দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। এ রেমিট্যান্স আসে প্রবাসীদের আয় থেকে। বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস হিসেবে রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে সহায়তা করে। এটি দেশের জিডিপিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে। অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা আনতে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছরই হাজার হাজার শ্রমিক বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এসব শ্রমিকের উল্লেখযোগ্য অংশ নারী। নারীদের বেশির ভাগই কাজ করেন গৃহকর্মী কিংবা গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, জর্ডান ও লেবাননই তাদের প্রধান গন্তব্য। নানা কারণে সেখানে তাদের মৃত্যু হয়। প্রতি বছর প্রবাসী নারী শ্রমিকদের মৃত্যুর বড় একটি অংশ আত্মহত্যাজনিত। আর এসব ঘটনার বেশির ভাগই ঘটে সৌদি আরবে। সেখানে নারী শ্রমিকরা প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, একাকিত্ব ও কর্মপরিবেশের চাপে ভেঙে পড়েন। গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশে গেছেন ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৩ নারী কর্মী। একই সময়ে দেশে এসেছে ৪১২ নারীর মরদেহ। এর মধ্যে আত্মহত্যার শিকার হয়েছেন ৮৪ অভিবাসী নারী। উদ্বেগজনক বিষয় হলো এসব আত্মহত্যার ৭৬ শতাংশ ঘটেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। অস্বাভাবিক মৃত্যু প্রতিরোধে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ বৃদ্ধি ও বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে আরো সক্রিয় হতে হবে। মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশের তদন্ত করা উচিত। তদন্ত করে দোষী সাব্যস্ত হলে বিচার করতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কেউ বিচারের আওতায় আসছে না। যে কারণে বারবার এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

কোনো অভিবাসী শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হলে তার সুবিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। দুঃখজনক বিষয় হলো বাংলাদেশের শ্রমিকরা অবিচারের শিকার হলেও সরকার বেশির ভাগ সময় তার প্রতিকার করতে পারছে না। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় না থাকায় অভিবাসী কর্মীরা নির্যাতন ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। মামলা করলেও সুবিচার পাচ্ছেন না। অভিবাসীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব নিতে হবে। অন্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। এক ছাদের নিচে যদি সব সেবা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে মন্ত্রণালয় ভালোভাবে কাজ করতে পারবে না। অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যুসনদ তৈরিতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড রয়েছে। বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে সে মান যেন সংশ্লিষ্ট দেশ অনুসরণ করে সেটি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জোর তৎপরতা চালাতে হবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইন হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবসম্পদ রফতানিকারক দেশ। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১১ কোটি ৩৯ লাখ। ২০২৩ সালে দেশটির জিডিপির ৮ দশমিক ৯ শতাংশ এসেছে প্রবাসী আয় থেকে। ফিলিপাইনের অর্থনৈতিক বিকাশে প্রবাসীদের আয়কে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বর্তমানে অধিকাংশ ফিলিপিনো অভিবাসী শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়, বিশেষ করে সৌদি আরবে। ফিলিপাইনে আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৭০-এর দশকের আগে পর্যন্ত বিদেশে ফিলিপিনোদের কর্মসংস্থান ছিল সীমিত। এর পেছনে রাষ্ট্রীয় কোনো সহায়তা বা নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। এরপর থেকে ফিলিপাইনের বিভিন্ন সরকার বিদেশে কর্মসংস্থান প্রসারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। এর পেছনে একদিকে যেমন বেকারত্ব হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার আয়ও বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ফিলিপাইনের অভিবাসনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে হাইড্রোকার্বন সম্পদের বিপুল মজুদের কারণে। এতে তেল ও নির্মাণ খাতে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দেয়। আর সেই সুযোগে বহু ফিলিপিনো শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোয় কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। একই সময় যুক্তরাষ্ট্রেও ফিলিপিনো অভিবাসীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এটি ফিলিপাইনের পক্ষে সম্ভব হয়েছে দক্ষ মানবসম্পদ রফতানির কারণে।

এদিকে ফিলিপিনো অভিবাসীদের মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মাত্র ৩ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কাজ করেছিলেন, যেখানে ছিল অধিকাংশ পুরুষ। কিন্তু ২০২১ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ৯০ হাজারে, যার ৬০ শতাংশই নারী। সৌদি আরব শুধু বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের নির্যাতন করে না। তারা আফ্রিকার দেশ কেনিয়া ও উগান্ডা এবং এশিয়ার দেশ ফিলিপিনো নারী শ্রমিকদের নির্যাতন করে। প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি নির্যাতন, হয়রানি ও শোষণের অভিযোগ সামনে এলে ফিলিপিনো সরকার সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে সাময়িকভাবে কর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের নির্যাতন, হয়রানি ও শোষণের অভিযোগ উঠলেও আমরা সেখানেই কর্মী পাঠাচ্ছি। কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি না।

বিদেশে নারী শ্রমিকের মৃত্যু যে কারণেই হোক, সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতিটি মৃত্যুর পুলিশি তদন্ত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিলে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে হবে। আর মরদেহ দেশে আসার পর পরিবার অভিযোগ করলে তারও তদন্ত করতে হবে। শুধু কারণ লিখে লাশের সঙ্গে চিকিৎসকের দেয়া মৃত্যুর সনদ পাঠিয়ে দায় সারা যাবে না।

দুই বছর ধরে বিভিন্ন কারণে মধ্যপ্রাচ্যে নারী যাওয়া কমেছে। মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে যাওয়া, একাধিক বাসায় কাজ করানো, ১৪-১৬ ঘণ্টার কাজ, সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটি না থাকা, কম বেতন, অনিয়মিত বেতন, নিয়মিত খাবার না দেয়া উল্লেখযোগ্য। এর বাইরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও আছে। যৌন নিপীড়নের অভিযোগও আছে। গৃহকর্মী পাঠানো নিয়ে নেতিবাচক প্রচারে যাওয়ার আগ্রহ কমে গেছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না দেয়ায় গৃহকর্মী বাদে অন্য কোনো খাতে নারীদের জন্য কাজের তেমন সুযোগ তৈরি করা হয়নি। আর বাসায় কাজ করতে গিয়ে নারীরা যে নিয়মিত নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসছেন, এটা নিয়ে একটা সচেতনতা তৈরি হয়েছে। তাই মিথ্যে প্রলোভনে নারীরা যেতে আর উৎসাহী হচ্ছেন না। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ২০২২ সালে বিদেশে নারী কর্মী গেছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭৬ হাজার ১০৮ জনে। ২০২৪ সালে তা আরো কমে ৬১ হাজার ১৫৮ জনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে কমেছে ২৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে কমেছে ২০ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক আইনে রয়েছে কর্মীদের সুন্দর কর্মপরিবেশে থাকতে দিতে হবে। সুন্দর কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে সরকারের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক প্লাটফর্মেও এ বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। নিয়োগের চুক্তিপত্রগুলো স্পষ্ট করতে হবে এবং কাজে যোগদানের আগেই কর্মীকে সে বিষয়ে অবহিত করতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশী নাগরিককে যে দেশে পাঠানো হবে সেই দেশের সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো আগেই জানিয়ে দিতে হবে, যাতে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন। প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়মিত তদারকিতে সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসকেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রবাসে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে আন্তরিক প্রয়াস কাম্য।