আজকের অস্থির, জটিল ও যুদ্ধবিগ্রহকবলিত বিশ্বে যখন মানবিক মূল্যবোধ বিপন্ন, তখন এ দিবসের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম। বাংলাদেশের সামাজিক অস্থিরতা, সহিংসতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সংকটসহ নানাবিধ অমানবিক পরিবেশের প্রেক্ষাপটে মানবিক দিবসের বার্তা ও আহ্বান আমাদের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক।

উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বিশ্ব মানবিক দিবসের সূচনা একটি হৃদয়বিদারক অমানবিক ঘটনা থেকে। ২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট ইরাকের বাগদাদ শহরে অবস্থিত ক্যানেল হোটেলে এক ভয়াবহ বোমা হামলায় জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি সার্জিও ভিয়েরা ডি মেলোসহ ২২ জন মানবিক ত্রাণকর্মী প্রাণ হারান। তারই প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে ত্রাণকর্মীদের সুরক্ষা ও মানবিক কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯ আগস্টকে ‘বিশ্ব মানবিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালের ১৯ আগস্ট প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালিত হয়। সেই থেকে এটি বিশ্ব মানবিক দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়ে আসছে। এবারের বিশ্ব মানবিক দিবসের মূল চেতনা—সংকটগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানবিক কর্মীদের সুরক্ষায় বিশ্বব্যাপী সংহতি জোরদার করা।

দিবসটি প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রথমত, যারা চরম প্রতিকূল পরিবেশে, জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপীড়িত মানুষের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেছেন, সেসব শহীদ ও জীবিত কর্মীর আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানানো। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের মাঝে পারস্পরিক মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো করা।

মানবিক দিবসের গুরুত্ব: এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বর্তমান বিশ্বে মানবিক দিবসের প্রয়োজনীয়তা সর্বজনীন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, যুদ্ধ, মহামারী ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে আজ কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু, গৃহহীন ও খাদ্য সংকটে রয়েছে। জাতিসংঘ অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটেরিয়েন অ্যাফেয়ার্সসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে বর্তমানে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ তীব্র মানবিক সংকটে রয়েছে এবং তাদের জন্য সরাসরি আন্তর্জাতিক অনুদান ও ত্রাণ দরকার। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ কোটি শিশু তীব্র যুদ্ধবিগ্রহ বা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে অথবা সেখান থেকে পালিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা রেকর্ড ১২ কোটি পেরিয়ে গেছে। অন্যদিকে দুঃখজনক হলেও বিশ্বজুড়ে মানবিক কর্মীদের ওপর হামলা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। শুধু গত বছরই ৩৮০ জনেরও বেশি মানবিক কর্মী দায়িত্ব পালনকালে বা নিজেদের ঘরে হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, যা ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত বছর। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে বহু মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এছাড়া ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ একদিকে বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকট এককভাবে ব্যবস্থাপনা করছে, অন্যদিকে মারাত্মক আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যায় নিমজ্জিত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের বহু মানুষ কেবল মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় দাতা সংস্থা, রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এ দিবসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও বেঁচে থাকার মর্যাদা রক্ষা করা মানবতা হিসেবে আমাদের প্রাথমিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ দিবসের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ ও ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ। প্রতি বছর এখানে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও কালবৈশাখীর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে। এর বাইরেও মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে দীর্ঘকাল ধরে মানবিক আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমাদের দেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর মানবিক তৎপরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব মানবিক দিবস কেবল আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশের দিন নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সহমর্মিতাকে শাণিত করার এক বড় উপলক্ষ। দিবসটি এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ব মানবিক দিবস গুরুত্ব পায় না এবং সেভাবে পালিত হয় না। কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম মানবাধিকার দিবস (১০ ডিসেম্বর) ও মানবিক দিবসের (১৯ আগস্ট) মধ্যকার প্রায় সমোচ্চারিত এবং কাছাকাছি ধারণার বিষয়জনিত বিভ্রান্তি, এতদ্বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের অকার্যকারিতা ও দায়হীনতা, অর্থায়নের তীব্র সংকট, সমাজবিজ্ঞানী, মিডিয়া ও বড় করপোরেটদের মনোযোগের অভাব ইত্যাদি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমন আনুষ্ঠানিক উদযাপনে ঘাটতি ও প্রচারবিমুখতা, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি ও অবসাদ, এনজিওকেন্দ্রিক দিবস হিসেবে চিহ্নিত হওয়া, নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার কারণে এ বিষয়ে অভ্যস্ততা।

মানুষ অমানবিক হয়ে যাওয়ার কারণ: প্রশ্ন হতে পারে এত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পরও মানুষ কেন অমানবিক হয়ে যাচ্ছে? কেন বর্তমান সমাজে প্রায়ই আমরা নৈতিক অবক্ষয়, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও অমানবিকতার নিষ্ঠুর চিত্র দেখতে পাই? অল্প কথায় এর জবাব দেয়া দুস্কর। মানুষ ক্রমাগত অমানবিক হয়ে ওঠার পেছনে গভীর কিছু মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। যেমন এক. পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ দিন দিন অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে। শুধু নিজের ভালো থাকার এ অন্ধ দৌড় মানুষকে চারপাশের অবহেলিত মানুষের প্রতি উদাসীন করে তুলছে। দুই. প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষকে বাস্তব জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। মানুষ এখন স্ক্রিনের ভার্চুয়াল লাইক-কমেন্টে যতটা আবেগ দেখায়, বাস্তব জীবনে পাশের কোনো মানুষের কষ্টে ততটা সহানুভূতিশীল হচ্ছে না। একে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘ডিজিটাল এম্প্যাথি ডেফিসিট’ বা সহানুভূতির ঘাটতি বলছেন। তিন. বস্তুগত সাফল্যকে (টাকা, দামি গাড়ি, ক্যারিয়ার) জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করায় পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সততা, দয়া, পরোপকার ও সহমর্মিতার মতো মানবিক গুণাবলির চর্চা হারিয়ে যাচ্ছে। চার. সমাজে ধনী-দরিদ্রের আকাশচুম্বী ব্যবধান এবং বেঁচে থাকার তীব্র সংগ্রাম সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করে। এ দীর্ঘস্থায়ী হতাশা অনেক সময় মানুষকে আক্রমণাত্মক ও সংবেদনশীলতাহীন করে তোলে।

মানবিক আচরণ বৃদ্ধির উপায়: একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা, মানবিক আচরণ প্রতিষ্ঠা ও তার পৃষ্ঠপোষকতা করা। মানবিক দিবসে সরকারের সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব রয়েছে, যেমন দেশের অভ্যন্তরে ও সীমান্তে কাজ করা সব মানবিক এবং ত্রাণকর্মীর আইনি ও শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আকস্মিক প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত বাজেট ও স্থায়ী ত্রাণ তহবিল গঠন করা অত্যাবশ্যক। এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো যাতে স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে মানবিক সহায়তা দিতে পারে, সেজন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। মানবিকতা কোনো পেশা নয়, এটি একটি মানসিকতা। এ বিষয়ে সাধারণ নাগরিকদেরও কিছু করণীয় রয়েছে—আশপাশের অসহায়, ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্টে সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানো। অতিরিক্ত বিলাসিতা ও অপচয় রোধ করে সেই অর্থ সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের কল্যাণে ব্যয় করা। সমাজের মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্য দূর করে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়া।

অমানবিকতার এ অন্ধকার থেকে বের হয়ে সমাজে পুনরায় সুস্থ মানবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পিত দীর্ঘস্থায়ী সমবেত এবং টেকসই পদক্ষেপ প্রয়োজন: এক. অন্যের কষ্টকে নিজের মনে করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ‘সামাজিক দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা’র ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত। দুই. স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তরুণদের বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক বা উৎসাহিত করা উচিত। বিপন্ন মানুষের পাশে সরাসরি দাঁড়ালে মানুষের ভেতরের অহংকার ও অমানবিকতা দূর হয়। তিন. সমাজে পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলা, সাহিত্য চর্চা, নাটক ও সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন বাড়াতে হবে। এগুলো মানুষের মনের সংকীর্ণতা দূর ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়ায়। চার. সমাজে কোনো অন্যায় বা অমানবিক ঘটনা ঘটলে তার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হতে হবে। অপরাধী পার পেয়ে গেলে সমাজের মানুষের মধ্যে ভালো কাজের প্রতি অনীহা তৈরি হয়।

শিশুকে শৈশব থেকেই মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন উদাহরণ তৈরি করা (রুল মডেলিং), ভাগ করে নেয়ার মানসিকতা শেখানো, সব জীব ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা, ভার্চুয়াল স্ক্রিন কমিয়ে বাস্তব গল্পের মুখোমুখি করা, শিশুর ইতিবাচক আবেগকে মূল্যায়ন করা ইত্যাদি। মাদার তেরেসা, মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং প্রমুখের জীবন আদর্শ তাদের সামনে তুলে ধরা। এসব বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্য বিশ্ব মানবিক দিবসের অন্যতম অঙ্গীকার।

শেষ কথা: মানুষ মানুষের জন্য—এ চিরন্তন সত্যকে ধারণ করেই মানবসভ্যতা এগিয়ে চলেছে। বিশ্ব মানবিক দিবস আমাদের আত্মোপলব্ধির সুযোগ দেয়, হানাহানি ও সংকটের ভিড়েও শেষ পর্যন্ত মানবতাই একমাত্র জয়ী শক্তি। একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে হলে মানবিক হওয়া, মানবিক আচরণ করা, পারস্পরিক সাহায্য সহানুভূতি সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। দেশ-বিদেশে প্রতিটি সমাজে এ মানবিক আচরণ চর্চা শুরু হোক একেবারেই শিশুকাল থেকে।

সিকদার আনোয়ার: খণ্ডকালীন শিক্ষক, বিইউএফটি; কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সচিব