বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত ৩০ বছরে এ সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে ৮০ কোটিরও বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশেও এ সংখ্যা নেহাতই কম নয়। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। গত বছর প্রকাশিত ডায়াবেটিস চিকিৎসার জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, ২০-৮০ বছর বয়সী ১৪ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ রোগটিতে ভুগছেন। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে অষ্টম। আশঙ্কা রয়েছে, বর্তমান ধারায় চলতে থাকলে ২০৪৫ সালে দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা হবে ২ কোটি ২৩ লাখ। দেশের এত বিপুলসংখ্যক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ নির্ণয় না হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্যে। সংস্থাটি আরো বলছে, দেশে রোগটি ঊর্ধ্বমুখী; ১০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় ডায়াবেটিসে।
- ডায়াবেটিসের কারণে মানুষের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকও হতে পারে। নষ্ট হয়ে যেতে পারে কিডনি। এছাড়া ডায়াবেটিসের কারণে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ৩৪ শতাংশ দৃষ্টি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সম্প্রতি বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। জরিপে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে তাদের দুটি চোখই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুচিকিৎসার অভাবে তারা দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারেন।
- ডায়াবেটিসের এত ঝুঁকি থাকার পরও মানুষ এ রোগ সম্পর্কে সচেতন নয়। ফলে একদিকে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না। এ রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করতে হলে যথাসময়ে শনাক্ত করা জরুরি। কারণ এটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চললে অনেক ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য রোগ শনাক্ত করাটা জরুরি। নয়তো আক্রান্তদের চিকিৎসার আওতায় আনা যাবে না। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির জরিপ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের ২৫ শতাংশের বেশি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেও মাত্র ৮০ লাখ রোগী বিভিন্নভাবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। অন্যরা চিকিৎসার আওতার বাইরে থেকে যান। ৬০-৭০ শতাংশ রোগী জানেন না যে তিনি এ রোগে আক্রান্ত। ফলে ৫-১০ বছর আক্রান্ত থাকা ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে শতকরা ৬০ জনের বিভিন্ন জটিলতা দেখা যায়। এর মধ্যে হৃদরোগ ও কিডনিসংক্রান্ত জটিলতা অন্যতম। মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৯০ সাল থেকে বিশ্বে ডায়াবেটিসের হার ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় আক্রান্তের হার বাড়ার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। কিন্তু আক্রান্তের হার বাড়লেও ওইসব অঞ্চলে চিকিৎসা নেয়ার হার তেমন একটা বাড়েনি। সুতরাং ডায়াবেটিস আক্রান্তদের সচেতন করতে হবে, যাতে তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
- ডায়াবেটিস একটি বিপাকজনিত সমস্যা। রক্তের গ্লুকোজ বেড়ে গেলে সাধারণত এ রোগ হয়ে থাকে। বংশগত কিংবা পারিপার্শ্বিক কারণে শরীরে ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণ কমে গেলে বা এর কার্যক্ষমতা কমে গেলে কিংবা দুইয়ের মিলিত প্রভাবেও এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। এটি জন্মগত ও খাদ্যাভ্যাসের কারণেও হতে পারে। শুধু প্রাপ্তবয়স্করাই নয়, বাংলাদেশে শিশুরাও এখন ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিস সাধারণ দুই ধরনের—টাইপ-১ তথা শরীরে ইনসুলিন তৈরি না হওয়া ও টাইপ-২ তথা ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া।
- নানা কারণে এ রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বাড়ছে। সময়ের পরিক্রমায় জীবনযাপনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের ফলে হাঁটা-খেলার মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়ছে। পরিবর্তন এসেছে খাদ্যাভ্যাসেও। এসব কারণে মানুষের মধ্যে শরীরচর্চা কিংবা শারীরিক পরিশ্রম অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। ফলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুরা উদ্বেগজনক হারে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পেডিয়াট্রিকস ডায়াবেটিক ক্লিনিক অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের (পিডিসিআরসি) তথ্য অনুসারে, বর্তমানে ৭ হাজার ৪২৫-এর মতো শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আবার বাডাসের তথ্যানুযায়ী, দেশে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের হার ৬ থেকে ১৪ শতাংশ। এছাড়া গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি, প্রায় ৫০ শতাংশ। গর্ভকালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে শিশুদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- শিশুদের টাইপ-১ ডায়াবেটিসের উপসর্গ দেখা দেয় তুলনামূলক কম বয়সে। আক্রান্ত শিশু দিন দিন শুকিয়ে যায়, ঘন ঘন প্রস্রাব করে আর দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে, এমনকি রক্তে শর্করা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় কিটোসিস হয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস একটু বেশি বয়সের শিশু বা কিশোর-কিশোরীদের দেখা যায়। যাদের ওজন বেশি, শরীরে অতিমাত্রায় মেদ, কায়িক পরিশ্রম করে না, তাদের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্তদের লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে। আক্রান্ত চারজনের তিনজনই চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর ডায়াবেটিস শনাক্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর চিকিৎসকের কাছে আসায় অন্ধত্ব, কিডনি নষ্ট, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও মুখে ইনফেকশনের মতো জটিল রোগ দেখা দিচ্ছে।
- ওজন আধিক্য, কায়িক শ্রমের ঘাটতি, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, কোলেস্টেরল আধিক্য, উচ্চ রক্তচাপ, পারিবারিক ইতিহাস, চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তি যাদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি তাদের উচিত ডায়াবেটিস নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা। নিয়মিত রক্তের শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা। একই সঙ্গে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে বিভিন্ন রুটিন পরীক্ষা, যেমন প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের উপস্থিতি, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, তিন মাসের গড় ডায়াবেটিসের মাত্রা, লিপিড প্রোফাইল, ইসিজি প্রভৃতি পরীক্ষা করতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় ডায়াবেটিসের জটিলতা শনাক্ত হলে অনেকাংশেই মারাত্মক ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণ করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
- ডায়াবেটিসের কারণ, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও প্রতিরোধে কার্যকর স্বাস্থ্য-শিক্ষার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ তথা সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সবাইকে সচেতনভাবে রোগ প্রতিরোধে তৎপর হতে হবে। এ বছর ডায়াবেটিস দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ডায়াবেটিস: সুস্বাস্থ্যই হোক আমাদের অঙ্গীকার’। সবাই নিয়ন্ত্রিত ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবেন—এটাই প্রত্যাশা।










