বর্তমানে প্রাণ-আরএফএলে আমরা ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ কাজ করি। ৩০ বছর আগে আমি আমার বাবার সঙ্গে ব্যবসা করতাম। তখনকার গ্র্যাজুয়েটদের মান এবং এখনকার গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে অনেক পার্থক্য। আপনারা ভালো কাজ করছেন। আমার মনে হয়, ভালো শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব প্রশিক্ষণ দরকার।

আজকের দিনে একজন গার্মেন্টসের ম্যানেজারের বেতন একজন মাস্টার্স ডিগ্রিধারী ম্যানেজারের থেকে বেশি। বাংলাদেশ এমন একটা অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কর্মক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষিত মানুষের চাহিদা উত্তরোত্তর কমবে। তাহলে কি আগামীতে উচ্চ শিক্ষিত মানুষের চাহিদা থাকবে না? অবশ্যই থাকবে। গার্মেন্টস সেক্টরে সমস্যা হলে আমরা মিড ম্যানেজমেন্টের শ্রমিক পাই না। এন্ট্রি লেভেলের শ্রমিক দিয়ে কারখানা চালানোর চেষ্টা করি। এখন যদি কর্মক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি হাতেকলমের কাজ যুক্ত করা যায় তাহলে বাংলাদেশ আগামী দিনে শীর্ষ গার্মেন্টস উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হবে। আজকে গার্মেন্টস সেক্টরে সমস্যা হলে—আমরা মিড অ্যালাইনমেন্টে শ্রমিক পাই না।৷ আমরা যখন এন্ট্রি লেভেলের শ্রমিক দিয়ে গার্মেন্টস চালানোর চেষ্টা করি তখন কিন্তু আমরা শিক্ষিত মানুষ পাচ্ছি না। শিক্ষিতরা যদি হাতেকলমে কাজ করার মানসিকতা নিয়ে আসেন, তাহলে ভালো হয়।

হাতেকলমে শেখার পাশাপাশি আমাদের শিক্ষার্থীদের সফট স্কিল শেখাতে হবে। একই সঙ্গে ইংরেজি শিক্ষায় মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় এটি ছাড়া অগ্রসর হওয়া কঠিন। আর হাতেকলমে শেখার বিষয়ে আমাদের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) সঙ্গে বেশি যোগাযোগ করবেন। তাহলে আমাদের থেকে এ বিষয়গুলো জানা সম্ভব হবে।

আমি কয়েকজন উপাচার্যের কথা শুনলাম। তারা কর্মসংস্থান নিয়ে কথা বলছিলেন। এজন্য আমি তাদের অভিনন্দন জানাই। স্যার, আপনারা বেশি করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট করবেন। আমার মেয়ে যখন কানাডায় পড়ছিল, তাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট শুরু হয়েছে গ্রেড ১২ থেকে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট যদি ভালো হয়, আমরা একটি ভালো প্রজন্ম পাব, যারা বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।

আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। এখানে (সম্মেলনে) গ্রামীণফোনের সিইও আছেন, তিনি নিশ্চয়ই একমত হবেন—গ্রামীণ ব্যাংক বা গ্রামীণফোনের সিইও হতে গেলে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আপনারা যদি পরিশ্রমী মানুষগুলোকে কর্মক্ষেত্রে পাঠান তাহলে তারা ভালো করবেন।

তবে সরকারি, বেসরকারি—এ বিতর্ক শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। এর একটা সমাধান প্রয়োজন। আমি যুক্তরাষ্ট্রে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। আমি দেখেছি, সেখানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে শিক্ষার মান উন্নত করার চেষ্টা করছে। সেই সঙ্গে সবার মধ্যে যদি আত্মবিশ্বাস, উদ্যোগ, সেবার মানসিকতা জাগ্রত করা যায় তাহলে অচিরেই আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ পাব।

পাশাপাশি একাডেমিক এক্সিলেন্সের ওপর নজর রাখা দরকার। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ধন্যবাদ জানাই—তারা আগের কারিকুলামের অনেক পরিবর্তন করেছে। আমি যুক্তরাষ্ট্রে দেখেছি তাদের কারিকুলাম প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। যদি তাদের কারিকুলাম পরিবর্তন হতে পারে তাহলে তো বাংলাদেশের আরো বেশি কারিকুলাম পরিবর্তন হওয়া উচিত। কারণ আগামী ৩০ বছর চীন থেকে প্রচুর ব্যবসা বাংলাদেশমুখী হবে। বাংলাদেশমুখী এ ব্যবসাগুলোর জন্য বর্তমান কারিকুলামের পরিবর্তন করা দরকার। আমি খুব খুশি, কারণ আপনারা ম্যাথমেটিকস, ডাটা অ্যানালিটিকস নিয়ে কথা বলেছেন। আগামী দিনে এগুলোই আমাদের এগিয়ে যেতে ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশের শিক্ষিত যুবকদের যদি চাকরি না থাকে, তাহলেও চিন্তার কোনো কারণ নেই। কারণ তারা বহির্বিশ্বে চলে যেতে পারে। বর্তমানে আরব দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে শুধু লো স্কিল্ড ওয়ার্কার নয়, হাই স্কিল্ড ওয়ার্কারও চাচ্ছে। আমরা যদি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারি তা দেশের জন্য ভালো হবে। আজকের পৃথিবী হাই স্কিল্ড ওয়ার্কারের জন্য বসে আছে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান যদি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে পারি, তাহলে বিশ্বের অনেক দেশের শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়াশোনা করতে আসবে। ভারত থেকে প্রচুর শিক্ষার্থী বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোয় পড়তে আসছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান যদি আইআইটি, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট বা এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের মতো হয়, তাহলে আগামীতে অবশ্যই আরো বেশি শিক্ষার্থী বাইরে থেকে বাংলাদেশে পড়তে আসবে।

এর জন্য শুধু নিজের দেশে সীমাবদ্ধ না থেকে পৃথিবীর দিকে তাকানো প্রয়োজন। তাহলে আমরা বাংলাদেশকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যেতে পারব, যেখানে বিদেশ থেকে মানুষ পড়তে ও জানতে আসবে। বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট বা মানুষের কর্মসংস্থানের কোনো সমস্যা হবে না। আগামী দিনে বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানি সৃষ্টি হবে, যেখানে গ্র্যাজুয়েটরা বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে সুন্দর একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।

আমরা সবাই বাংলাদেশকে ভালোবাসি। বাংলাদেশে মেধাবী মানুষ অনেক আছে। আমাদের প্রাণ-আরএফএলকে চালাচ্ছেন বাংলাদেশী গ্র্যাজুয়েটরা। তারাই আমাদের বিশ্বমণ্ডলে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছেন। আগামী দিনে বাংলাদেশে আরো অনেক বহুজাতিক কোম্পানি হবে। বাংলাদেশী গ্র্যাজুয়েটরাই পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে একটি সুন্দর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবেন।

আহসান খান চৌধুরী: চেয়ারম্যান ও সিইও, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ

[‘উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক শিরোনামে বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম বাংলাদেশ উচ্চ শিক্ষা সম্মেলন ২০২৪ অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]