জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ের সুবর্ণ সুযোগ এখন বাংলাদেশের রয়েছে। তবে জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের সুযোগটি কাজে লাগিয়ে প্রকৃত মানবসম্পদে রূপান্তর হচ্ছে কিনা এ বিষয়টি বাড়তি মনোযোগের দাবি রাখে। এক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক এবং বর্তমানে এটিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মোচনের সুযোগ রয়েছে। মাত্র চার দশকের ব্যবধানে অনুন্নত পর্যায় থেকে বিশ্বমানের মানবসম্পদ উন্নয়ন কাঠামো গড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে চীন।

মানব উন্নয়ন সূচকে অবস্থানগত ব্যবধান

জাতিসংঘের বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানব উন্নয়ন সূচকের (এইচডিআই) নিরিখে ১৯৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩০। সূচকের ফল অনুযায়ী বাংলাদেশ ‘মধ্যম মানব উন্নয়ন’ শ্রেণীভুক্ত। অন্যদিকে চীনের এইচডিআই এখন ‘উচ্চ মানব উন্নয়ন’ শ্রেণীতে রয়েছে, যা ‘অতি উচ্চ মানব উন্নয়ন’ শ্রেণীর একেবারে কাছাকাছি। ১৯৯০ সালে চীনের এইচডিআই ছিল অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে। সেখান থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে তারা বিশ্বের একমাত্র দেশ, যারা ‘নিম্ন’ থেকে উচ্চ মানব উন্নয়ন শ্রেণীতে উত্তরণ ঘটিয়েছে। এ অগ্রগতির পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত অগ্রগতি। ইউনেস্কোর ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির উচ্চ শিক্ষায় মোট ভর্তির হার ২০২৩ সালে দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ২ শতাংশ, যা কয়েক দশক আগেও অনেক কম ছিল। তুলনামূলকভাবে একই বছরে বাংলাদেশের এ হার ২৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ চীনের তুলনায় বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির হার প্রায় আড়াই ভাগ কম।

শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৯ (এসডিজি-৯)-এর নিরিখে ব্যবধান

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৯ শিল্পায়ন, উদ্ভাবন ও গবেষণা অবকাঠামোকে মজবুত করার ওপর জোর দেয়। এর একটি প্রধান মাপকাঠি হলো গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) জিডিপির অনুপাতে ব্যয়। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের সামগ্রিক আরঅ্যান্ডডি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, একই সময়ে চীনের এ ব্যয় ছিল ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ; প্রায় পঁচাশি গুণ ব্যবধান, যা কেবল সংখ্যাগত নয়, কাঠামোগতও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপেও একই প্রবণতা ধরা পড়ে যে আমাদের গবেষণা ব্যয় বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ের দেশগুলোর কাতারে। এর ফল হিসেবে দেশের রফতানি খাত, বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্প, এখনো মূলত সস্তা শ্রমনির্ভর ও কম প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে, যেখানে মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। বিপরীতে চীন গত দুই দশকে তার উৎপাদন খাতকে ক্রমান্বয়ে উচ্চ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর শিল্পে রূপান্তর করেছে, যার পেছনে রয়েছে টেকসই ও পরিকল্পিত আরঅ্যান্ডডি বিনিয়োগ। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার (টিভিইটি) সীমাবদ্ধতাও উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) একটি পর্যালোচনা অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনেকগুলো মন্ত্রণালয় ও সংস্থা দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমে জড়িত থাকলেও একটি সমন্বিত, চাহিদানির্ভর এবং শিল্পসংশ্লিষ্ট দক্ষতা কাঠামোর ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সুশাসন: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬ (এসডিজি-১৬)-এর প্রাসঙ্গিকতা

মানবসম্পদ উন্নয়ন কেবল শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের বিষয় নয়—এটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িত, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬-এর মূল বিষয়বস্তু। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে (সিপিআই) ১৮২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০তম, স্কোর ২৪—অর্থাৎ নিচ থেকে গণনা করলে আমরা বিশ্বের ১৩তম সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। অন্যদিকে ৪৩ স্কোর নিয়ে চীনের অবস্থান ৭৬তম। এই দুর্বল সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শুধু সরকারি প্রশাসনে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা সরাসরি প্রভাব ফেলে সেই সব প্রতিষ্ঠানের ওপরও যেগুলো মানবসম্পদ তৈরি করে—যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দুর্বল জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক অদক্ষতা যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষেত্রের উপযোগী স্নাতক বা উদ্যোক্তা তৈরির সামর্থ্য কমিয়ে দেয়, শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের মানও কমে যায়, আর এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর। সুশাসন ও নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে করা বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। অথচ এ গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি নীতিনির্ধারণী আলোচনায় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।

টেকসই উৎপাদন ও দক্ষতা: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১২ (এসডিজি-১২)-এর সংযোগ

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১২ দায়িত্বশীল উৎপাদন ও ভোগ-ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়। এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের এমন একটি দিক, যার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে, বিশেষত এমন এক বিশ্বে যেখানে সবুজ রূপান্তর দ্রুত এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে, তবে সামগ্রিক শিল্প খাতে সবুজ ও বৃত্তাকার অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি এখনো স্পষ্ট। চীন তার বৃত্তিমূলক শিক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উচ্চ প্রযুক্তি উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাকে তার জাতীয় বৃত্তিমূলক শিক্ষা নীতির কেন্দ্রে স্থান দিয়েছে, যা দেশটির রাষ্ট্রীয় পরিষদের ২০২১ সালের নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে—বিশেষত শিল্প-শিক্ষা সমন্বয় জোরদার করে, যাতে দক্ষতা উন্নয়ন কেবল কর্মসংস্থানমুখী না হয়ে টেকসই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা: বিদ্যমান কাঠামো ও সম্ভাবনা

আশার কথা হলো বাংলাদেশ-চীন মানবসম্পদ সহযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে—আর তা কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সমঝোতাতেই সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়েও গভীরভাবে প্রোথিত। এর একটি দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টান্ত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, যা ২০০৬ সালে চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে এবং ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী ৫০০-এর বেশি কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মধ্যে থেকে ‘সেরা সিআই অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করে। এ সহযোগিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ‘হুবেই-দক্ষিণ এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্মেলন’-এ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ইয়াংজি নদীর অববাহিকায় অবস্থিত হুবেই প্রদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ (থ্রি গর্জেস ইউনিভার্সিটি তার মধ্যে অন্যতম) মোট ১২টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। এ উদ্যোগ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় এবং যৌথ উদ্ভাবনী কার্যক্রমকে উৎসাহিত করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি গুয়াংজুভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টেলিশিয়ার সঙ্গে পাঁচ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে ক্যাম্পাসে সেন্টার ফর চাইনিজ ইকোনমি, ইনোভেশন অ্যান্ড কো-অপারেশন প্রতিষ্ঠা করে। তবে এ সহযোগিতার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে তখনই, যখন অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও সামগ্রিকভাবে এগিয়ে এসে একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তুলবে—যেখানে চীনা প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমকে সরাসরি যুক্ত করা যাবে। ফলে প্রযুক্তি হস্তান্তর শুধু যন্ত্রপাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার হস্তান্তরেও রূপ নেবে।

নীতিগত সুপারিশ ও উপসংহার

উপরিউক্ত তুলনামূলক চিত্র থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে পিছিয়ে থাকার কারণ একমাত্রিক নয়, এটি একই সঙ্গে স্বল্প আরঅ্যান্ডডি বিনিয়োগ (এসডিজি-৯), দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা (এসডিজি-১৬) এবং টেকসই শিল্প দক্ষতার ঘাটতির (এসডিজি-১২) সম্মিলিত ফল। এ প্রেক্ষাপটে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বিবেচনাযোগ্য।

প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা পর্যায়ে শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রায়োগিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণকে প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, উদ্ভাবনভিত্তিক সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা নিয়েও বের হতে পারে। দ্বিতীয়ত, চীনের সঙ্গে বিদ্যমান সহযোগিতাকে বাংলাদেশের জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত করা দরকার, যাতে বৃত্তি বা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বিচ্ছিন্ন প্রকল্প না হয়ে একটি টেকসই কাঠামোর অংশ হয়। তৃতীয়ত, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া কোনো শিক্ষা বা দক্ষতা বিনিয়োগই টেকসই ফল দেবে না। এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ প্রয়োজন। চতুর্থত, জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী কমিটি ও কমিশনগুলোতে (যেমন শিক্ষা নীতি প্রণয়ন কমিটি, দক্ষতা উন্নয়ন কাউন্সিল, বা বাণিজ্য ও শিল্পসংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদ) সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিভাবান শিক্ষক ও গবেষকদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বর্তমান বাস্তবতায় দেশের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেসরকারি খাতের, অথচ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনো সীমিত। এ ব্যবধান নীতিনির্ধারণকে বাস্তব শ্রেণীকক্ষ ও গবেষণাগারের অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।

এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি কাঠামোগত অসামঞ্জস্য হলো গবেষণা তহবিল বরাদ্দ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে মোট বরাদ্দ ছিল প্রায় ৮৪৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে ৭৯৩ কোটি টাকা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে মাত্র ৫৬ কোটি টাকা। এ অসামঞ্জস্য বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ একই সময়ে দেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং ও গবেষণা প্রকাশনায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক ফলাফল দেখিয়েছে। অর্থাৎ সম্পদ বরাদ্দের কাঠামো এখনো ঐতিহাসিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের (সরকারি বনাম বেসরকারি) ভিত্তিতে নির্ধারিত হচ্ছে, প্রকৃত গবেষণা সক্ষমতা বা ফলাফলের ভিত্তিতে নয়। এটি কেবল ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়, এটি জাতীয় গবেষণা সক্ষমতার একটি বড় অংশকে অব্যবহৃত রেখে দেয়ার সমতুল্য।

তাই সুপারিশ হলো গবেষণা তহবিল বরাদ্দের মানদণ্ড প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানার (সরকারি/বেসরকারি) পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক, ফলভিত্তিক এবং স্বচ্ছ মূল্যায়নের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন, যাতে যোগ্যতাসম্পন্ন যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জাতীয় গবেষণা তহবিলে সমান সুযোগে প্রবেশাধিকার পান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সাম্প্রতিক করহার হ্রাসের সিদ্ধান্ত একটি ইতিবাচক সূচনা, তবে তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রত্যক্ষ গবেষণা অনুদানের অনুপাতে বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন। সবশেষে আঞ্চলিক অংশীদারত্বকে কেবল বিনিয়োগ ও অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তা যেন জ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি প্রকৃত মাধ্যম হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। চীনের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে মানব উন্নয়নে রূপান্তর সম্ভব, তবে তা আসে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত বিনিয়োগের ফল হিসেবে—কোনো একক প্রকল্প বা স্মারকের মাধ্যমে নয়। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি তাই কেবল চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ তা নয়; বরং এ সম্পর্ককে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষাগত রূপান্তরে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে সেটি। আর এ রূপান্তর তখনই টেকসই হবে, যখন নীতিনির্ধারণ ও সম্পদ বরাদ্দ—উভয় ক্ষেত্রেই দেশের প্রকৃত গবেষণা ও শিক্ষার সক্ষমতাকে, তা সরকারি হোক বা বেসরকারি, ন্যায্যভাবে স্বীকৃতি দেয়া হবে।

ড. মুহম্মদ ফয়সল চৌধুরী: সহযোগী অধ্যাপক ও পরিচালক (বিবিএ প্রোগ্রাম), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি