কভিড মহামারী থেকে শুরু করে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান, নানা কারণেই গত কয়েক বছরে শিক্ষা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাতে সঠিক সময়ে নির্ভুল বই তুলে দিতে ব্যর্থতা আমাদের জন্য জাতিগত লজ্জা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বই ছাপাতে দেরি হওয়ায় চলতি বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছতে চার মাস দেরি হয়েছিল। এতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন যেমন চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে, সরকারকেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। বই পৌঁছতে দেরি হওয়ায় ব্যাহত হয়েছে শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠন। আবার সঠিক সময়ে বই না পেয়ে বাধ্য হয়েই সামর্থ্যবান অভিভাবকরা ইন্টারনেট থেকে পিডিএফ কপি প্রিন্ট নিয়ে পড়িয়েছেন, আবার কেউবা চড়া দামে বাজার থেকে পিডিএফ থেকে ছাপানো বই কিনতে বাধ্য হয়েছেন। তবে শহরাঞ্চলে এ সুবিধা থাকলেও মফস্বল বা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এ সুবিধা খুবই অপ্রতুল। কারণ সেখানে ইন্টারনেটের ব্যবহার ও সহজলভ্যতা সীমিত। যেসব অভিভাবকের সামর্থ্য ছিল না তারা বই না পেয়ে সন্তানের পড়াশোনা অনেকটাই পিছিয়েছেন। ফলে বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনায় চরম বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। তাই শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে পাঠ্যবই বছরের শুরুতেই সবার কাছে পৌঁছানো অত্যাবশ্যক। সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিতে সরকারের অঙ্গীকার এখানে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকায় বই মুদ্রণ ও বিতরণে দেরি হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। এর পরও জানুয়ারিতে মাধ্যমিকের তিন শ্রেণীর বই দেরিতে পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মূল কারণ প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, দরপত্র বাতিল, পুনঃদরপত্র আহ্বান ও সমন্বয়ের অভাব। সময় হাতে থাকা অবস্থায় পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি ও মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে কাজ যথাসময়ে শুরু হয়নি। এ বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলেও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতাই এবার বই মুদ্রণ বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যবই ছাপার জন্য প্রথমে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল গত মে-জুনে। তবে গত সেপ্টেম্বরে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এ দরপত্র বাতিল করা হয়। পরে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ২২ অক্টোবর ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ৪২তম সভায় এ তিন শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়। এর আগে ১৪ অক্টোবর মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরির নবম-দশম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের ক্রয়াদেশ অনুমোদন দেয়া হয়। এদিকে মাধ্যমিকের বেশকিছু লটের বই মুদ্রণের এখনো চুক্তিই হয়নি। সর্বশেষ ৬ নভেম্বর এনসিটিবির ওয়েবসাইটে ষষ্ঠ, নবম ও দশম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকের ১৭টি লটের পুনঃদরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী দরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ২৫ নভেম্বর। এরপর চুক্তি স্বাক্ষর থেকে বই সরবরাহে দুই মাসের অধিক সময় প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকের মুদ্রণ ডিসেম্বরের সম্পন্ন করা কঠিন হবে। এতে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো কঠিন এক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতায় আগামী বছরের শুরুতে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা সব বই হাতে পাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় বেড়েই চলেছে।
এ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এনসিটিবি আগভাগেই দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করে মূল্যায়নের কাজও শেষ করেছিল। কিন্তু ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে সেপ্টেম্বরে, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যবই ছাপার দরপত্র বাতিল করা হয়। নতুন দরপত্র আহ্বানের পর যাচাই-বাছাই শেষ হলেও তিন শ্রেণীর বই ছাপার কার্যাদেশ দেয়া হয়নি। শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, নভেম্বর-ডিসেম্বরে মুদ্রণকারীরা সাধারণত গাইড বই ছাপার কাজে ব্যস্ত থাকে। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পোস্টার, লিফলেট ছাপানোর কাজও বাড়বে। এ বাস্তবতায় মাধ্যমিকের সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছতে যে দেরি হবে, সেটা সহজেই অনুমেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, দেরিতে বই পৌঁছার কারণে যে শিখন ঘাটতি তৈরি হবে, তার দায় কে নেবে? ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ ও এনসিটিবির কারণে শিক্ষার্থীরা কেন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কভিড মহামারীর কারণে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এমনিতেই শিখন ঘাটতিতে ভুগছে। এর পরও প্রতি বছর পাঠ্যবই ছাপাতে দেরি হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের ভুগতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
অতীতে ভুলে ভরা পাঠ্যপুস্তক নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। প্রায় প্রতি বছর পাঠ্যবই ছাপা হয়ে সেগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে বিতরণের পর ভুল-ত্রুটি, অস্পষ্টতা ও নানা অসংগতি ধরা পড়লে সরকার পরবর্তী সময়ে ‘সংশোধনী’ দিয়ে মনে করে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু এভাবে বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা আর নৈরাজ্য চলতে দেয়া যায় না। কাজেই মানসম্মত ও ত্রুটিমুক্ত বই প্রকাশে কর্তৃপক্ষকে আরো বেশি আন্তরিক হতে হবে।
বছরের প্রথম দিনে নতুন বই হাতে পাওয়ার যে আনন্দ, তা শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহও বাড়ায়। সেটি যদি প্রতি বছর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে তাহলে শিক্ষার মানোন্নয়ন মুখে বলা যত সহজ, বাস্তবে তা অর্জন তত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েরই বই পেতে দেরি হলে শিক্ষাবর্ষের প্রথম কয়েক মাসই নষ্ট হয়ে যাবে। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের বই দেয়া কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মাধ্যমিকের তিন শ্রেণীর বই ছাপানো নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, এনসিটিবিকে দ্রুত তা নিরসন করতে হবে। শুধু কার্যাদেশ দিয়ে বসে থাকলেই চলবে না, সময়মতো বইগুলো ছাপা হচ্ছে কিনা, নিয়মিত তার তদারক করতে হবে। প্রতি বছরই এ ধরনের সংকট এনসিটিবির অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতারই বহিঃপ্রকাশ। সময় এসেছে এ দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করার।










