বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই (অর্থাৎ, মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক) উত্তীর্ণ হয়েছে। সে অনুযায়ী, জাতিসংঘ ২০২১ সালে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করে যে বাংলাদেশ ২০২৪ সালে এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে যাবে। তবে করোনার কারণে এ সময় দুই বছর পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণে নির্ধারিত হয়েছে।

এ উত্তরণ যেমন গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অসাধারণ অর্জনকে স্বীকৃতি দেয়, তেমনি এটি বেশকিছু বড় চ্যালেঞ্জও বয়ে আনে। এলডিসি উত্তরণের ফলে বেশকিছু আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেয়া হবে; যার মধ্যে রয়েছে বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার, বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা, রেয়াতি অর্থায়ন (সহজ শর্তে ঋণ) এবং নির্দিষ্ট কিছু কারিগরি সহায়তা।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ-সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জসমূহ

বিশ্ববাজারে অগ্রাধিকার সুবিধা হারালে রফতানি প্রতিযোগিতা, বিদেশী বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উন্নত দেশগুলোর বাজারে অগ্রাধিকার সুবিধা হারানোর কারণে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অগ্রাধিকারমূলক বাজারে প্রবেশাধিকার হারানো: বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ-নির্দিষ্ট বাণিজ্য চুক্তির অধীনে অনেক উন্নত বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার ভোগ করে। উত্তরণের পর বিকল্প কোনো বাণিজ্য চুক্তি করা না হলে, রফতানি পণ্য বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রধান বাজারগুলোয় উচ্চ শুল্কের মুখোমুখি হতে পারে।

সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ হ্রাস: এলডিসি মর্যাদা থাকায় স্বল্প সুদে ঋণ এবং উন্নয়ন সহায়তা পাওয়া যায়। উত্তরণের ফলে বাজারভিত্তিক ঋণের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা ঋণ পরিশোধের খরচ বাড়িয়ে দেবে।

বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি: বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা ছাড়া বাংলাদেশের পণ্য সরাসরি সেসব দেশের রফতানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে যাদের প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীলতা আরো উন্নত।

মানদণ্ড পূরণের বাধ্যবাধকতা: উত্তরণের পর শ্রম অধিকার, পরিবেশগত টেকসইতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের সুরক্ষা এবং পণ্যের গুণগত মান-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলো আরো কঠোরভাবে মেনে চলার প্রয়োজন হবে।

এ উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে। মারাত্মক সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মহামারী-পরবর্তী প্রভাব, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ এরই মধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন বছরের জন্য উত্তরণ পিছিয়ে দেয়ার একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিয়েছে।

জাতিসংঘের পর্যালোচনা প্রক্রিয়াটি প্রথমে জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি), তারপর জাতিসংঘের ইকোসক এবং সবশেষে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোট থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতিমূলক সময়সীমা তিন বছর (২৪ নভেম্বর, ২০২৯) বাড়ানোর আবেদনে জাতিসংঘ ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

সফলভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের কৌশল

অতীতে সময়সীমা বাড়ানো সত্ত্বেও স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। মনে রাখা প্রয়োজন, উত্তরণে বিলম্ব ঝুঁকিমুক্ত নয়। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আস্থা সম্পর্কে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি নেতিবাচক সংকেত পাঠাতে পারে। অধিকন্তু, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কেবল স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধা ধরে রাখার ওপর নয়, বরং সংস্কারের ওপর নির্ভর করে। এজন্য বাংলাদেশের উচিত উত্তরণে বিলম্বের চেয়ে স্বল্পোন্নত-পরবর্তী প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণে বেশি মনোযোগ দেয়া। সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো কমিয়ে উত্তরণের সুবিধাগুলো সর্বোচ্চ করতে সতর্ক প্রস্তুতি অপরিহার্য।

বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে রফতানি পণ্য ও গন্তব্যের বহুমুখীকরণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশকে বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, শিল্প বৈচিত্র্যায়ণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে একটি সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সরকার ও বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে একটি আক্রমণাত্মক ও দ্বিমুখী কৌশলে কাজ করতে হবে, যার একদিকে থাকবে অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক দরকষাকষি বা সমঝোতা।

রফতানি বহুমুখীকরণ ত্বরান্বিত করা: তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো অপরিহার্য। মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক থেকে। পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনৈতিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে। ওষুধ শিল্প, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশলের মতো খাতগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। উচ্চফলনশীল বিকল্প খাত, বিশেষ করে ওষুধ শিল্প, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, জাহাজ নির্মাণ এবং হালকা প্রকৌশল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক প্রণোদনা ও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন। বৈচিত্র্যকরণ একটিমাত্র খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।

রফতানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদার করা: উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার আধুনিকায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের রফতানি খাতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এছাড়া লজিস্টিকস ও পরিবহন খরচ কমাতে হবে, পণ্যের মান ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে এবং ডিজিটাল বাণিজ্য সক্ষমতা প্রসারিত করতে হবে।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ শক্তিশালী করা: বিশ্বব্যাপী জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর মধ্যে একটি বাংলাদেশের (৯ শতাংশের কম)। কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়নের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ পুঁজি গঠনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) করের আওতা বাড়াতে হবে, শুল্ক প্রক্রিয়া ডিজিটাল করতে হবে এবং স্বতঃস্ফূর্ত কর ছাড়ের সুবিধা কমাতে হবে।

আর্থিক খাতের সংস্কার বাস্তবায়ন। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ (এনপিএল) কমাতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাকে বৈশ্বিক বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে আমাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের (যেমন আইএমএফ) সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন জোরদার করা: উত্তরণ-পরবর্তী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে দক্ষ জনশক্তি অপরিহার্য। বাংলাদেশকে শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে, প্রযুক্তিগত ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে, ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে, গবেষণা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা জোরদার করতে হবে এবং শিল্প খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (একাডেমিয়া) মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। নবসম্পদে বিনিয়োগ শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং শিল্পের আধুনিকায়নে সহায়তা করবে।

অবকাঠামো উন্নয়ন: প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য আধুনিক অবকাঠামো প্রয়োজন। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিবহন নেটওয়ার্ক, বন্দর ও লজিস্টিক সুবিধা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো। বিশেষভাবে ব্যবসার লিড টাইম (পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সময়) সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বড় বড় অবকাঠামোগত বিনিয়োগের (যেমন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল) পরিচালনগত লজিস্টিকস উন্নত করার জন্য আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। দক্ষ অবকাঠামো উৎপাদন খরচ কমায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজতর করে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস মর্যাদা নিশ্চিত করা: ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি গন্তব্য। ইইউর জিএসপি প্লাস স্কিমের জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে বাংলাদেশকে অবশ্যই শ্রম আইন, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সক্রিয়ভাবে সংস্কার করতে হবে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার বজায় রাখে।

নতুন দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন: এলডিসি সুবিধা হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাংলাদেশকে একতরফা সুবিধার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যাপকভিত্তিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির (পিটিএ) দিকে যেতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, আসিয়ান দেশগুলো এবং উদীয়মান বাজারগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য যেমন একটি বড় অর্জন, তেমনি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। উত্তরণ বিলম্বিত করা একটি অস্থায়ী সমাধান। স্বল্পমেয়াদে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও উত্তরণ (গ্র্যাজুয়েশন) বিলম্ব একটি সুযোগও বটে—বৈচিত্র্যময়, উদ্ভাবননির্ভর ও স্থিতিশীল অর্থনীতিতে রূপান্তরের। দীর্ঘমেয়াদে, স্বল্পোন্নত যুগে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে অবশ্যই কাঠামোগত রূপান্তর এবং সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা তৈরিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি বাংলাদেশকে শুধু উত্তরণের ঝুঁকি কমাতেই সাহায্য করবে না, বরং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথকেও ত্বরান্বিত করবে।

ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: সিনিয়র প্রফেসর, কেজ বিজনেস স্কুল, প্রধান, জিওপলিটিকস স্ট্র্যাটেজি ল্যাব (ফ্রান্স)