আবার এসব প্রতিষ্ঠানে যদি আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না যায়, তবে তা রাষ্ট্র ও জনজীবনে ভোগান্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ ঝুঁকি এড়াতে হলে অবশ্যই সরকারের উচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর পারফরম্যান্স নিয়মিত মূল্যায়ন করা। তার ভিত্তিতে নানা সময়ে নেয়া সরকারের সিদ্ধান্তগুলো হালনাগাদ করা। যেমন বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি, পরিবহন, খাদ্য, সারসহ কৌশলগত অনেক খাতে রাষ্ট্রের অধীন থাকার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকা অদক্ষ, লোকসানি কিংবা আর্থিক দায় রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠানের দায়দায়িত্ব সরকারের অনির্দিষ্টকাল বহন করার যৌক্তিকতা নেই।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় একটি অংশ এমন এক ভঙ্গুর আর্থিক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা কেবল ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা সরকারের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।

অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে উঠে এসেছে, দেশের ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার মোট দায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত দায়ই ৪ লাখ ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। ৪৯টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে উচ্চ ও অতি উচ্চ ঝুঁকির হিসেবে; এসব প্রতিষ্ঠানের দায় মোট দায়ের প্রায় ৬২ শতাংশ। উপরন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগেরই নিজস্ব আয় ও পরিচালন সক্ষমতা দিয়ে সেই দায় সামাল দেয়ার পরিস্থিতি নেই। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত সরকারের ঘাড়ে এসে পড়ছে।

কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে কিংবা পরিচালন ব্যয় মেটাতে না পারলে সরকারকে ভর্তুকি, অনুদান, পুনঃমূলধনীকরণ, ঋণ পুনর্গঠন অথবা অন্য কোনো উপায়ে সহায়তা করতে হয়। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতার ব্যয় বহন করতে হয় জনগণকে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রচ্ছন্ন দায়। সাম্প্রতিক সরকারি মূল্যায়নেও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও দুর্বল সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বিপুল পরিমাণ প্রচ্ছন্ন দায়কে সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল ‘সরকারি প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দেখার পুরনো মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি, বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সম্পদের ব্যবহার, জনসেবার বিচারে তাদের অবদান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে হবে কোন প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের মালিকানায় থাকবে, কোনটি সংস্কারের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াবে, কোনটি বেসরকারি অংশীদারত্বে যেতে পারে এবং কোনটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ বা একীভূত করাই উত্তম।

দুঃখজনক হলো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর এ সংকট দীর্ঘদিনের হলেও এর সমাধানে ধারাবাহিক ও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। এমনকি পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারে বিশেষ অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে সে প্রত্যাশা বর্তমান সরকারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে।

সরকারের উচিত এক্ষেত্রে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া। বিশেষ করে সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতি ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান পেয়েছে। এতে সরকারকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। সুতরাং সরকার যদি নিজস্ব চাপ কমাতে চায়, অবশ্যই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্মূল্যায়ন হতে হবে। বিশেষ করে সরকার লোকসানি, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখতে সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে কিনা সে বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

রাজস্ব আহরণে চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং সরকারের সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান দায়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সরকারি অর্থের ওপর চাপ কমানো এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কার অর্থনৈতিক নীতিরই অংশ হওয়া উচিত।

এক্ষেত্রে প্রথম কাজ হতে পারে প্রতিষ্ঠানগুলো পারফরম্যান্সভিত্তিক শ্রেণীকরণ। শুধু মুনাফা করছে কিনা, সেটিই একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেবা প্রদানের দক্ষতা, ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা, সামাজিক সুফল ও আর্থিক স্থায়িত্ব—সবকিছুকে বিবেচনায় নিতে হবে। একইভাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মুনাফা, সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহার, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা, পরিচালন নগদ প্রবাহ ও বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু লোকসানে রয়েছে, সেগুলোকে কীভাবে পুনর্গঠন করা যায় তা ভাবতে হবে। কত বছরে লোকসান কমবে, কতটা ঋণ পুনর্গঠন হবে, পরিচালন ব্যয় কীভাবে কমবে, সম্পদের ব্যবহার কীভাবে বাড়বে—এসবের সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে। সরকারি সহায়তাও হতে হবে শর্তযুক্ত। কোনো প্রতিষ্ঠান সংস্কারের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ না করলে তার ব্যবস্থাপনা ও পর্ষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হতে পারে এবং যেসব খাতে বেসরকারি খাত এরই মধ্যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বেসরকারীকরণ, পিপিপি কিংবা যৌথ উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বেসরকারীকরণ যেন সরকারি সম্পদ কম মূল্যে হস্তান্তরের আরেকটি সুযোগে পরিণত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সম্পদের যথাযথ মূল্যায়ন, স্বচ্ছ দরপত্র, প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ও স্বাধীন নজরদারি ছাড়া এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া উচিত নয়।

যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসান করছে, বাজারে তাদের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই এবং জনস্বার্থে তাদের অস্তিত্ব অপরিহার্য নয়, সেগুলোকে কেবল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কারণে টিকিয়ে রাখারও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে বন্ধ, একীভূত বা সম্পদ পুনর্বিন্যাসের মতো দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারীদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে সংস্কারের নেতিবাচক প্রভাব তাদের ওপর না পড়ে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়, ভর্তুকি, সরকারি গ্যারান্টি ও প্রচ্ছন্ন দায় নিয়ে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা উচিত। এতে সরকারের আর্থিক ঝুঁকি সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি জনগণও পরিষ্কার ধারণা পাবে। সর্বোপরি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তথা সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ বিগত সময়ে সুশাসনের অভাবেই দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়েছে।