বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ নামক সংস্থা বিশ্বের ১৫২টি দেশের ১ হাজার ২০০টির বেশি শহরে যান চলাচলের গতির ওপর গবেষণা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির ২০টি শহরের মধ্যে তিনটি বাংলাদেশের—ঢাকা (প্রথম স্থান), ময়মনসিংহ (নবম স্থান) ও চট্টগ্রাম (১২তম স্থান) (প্রথম আলো ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩)। গবেষণার প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সড়কে চলাচলের গতি ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়াতে পারলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১০ শতাংশ বাড়ে।

২০১৮ সালে চট্টগ্রাম স্ট্র্যাটেজিক আরবান ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান তৈরি করে বিশ্বব্যাংক। তাতে চট্টগ্রাম নগরে যানবাহনের বর্তমান গড় গতির (কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়) হিসাব দিয়েছে। (১) কার—সকালে ১৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার, বিকালে ১০ দশমিক ৭ কিলো; (২) বাস—সকালে ১৩ দশমিক ৯ কিলো, বিকালে ১০ দশমিক ৩ কিলো; (৩) মোটরবাইক সকালে ১৮ দশমিক ৭ কিলো, বিকালে ১৩ দশমিক ৪ কিলো; (৪) সিএনজি—সকালে ১৬ কিলো, বিকালে ১১ দশমিক ৭ কিলো; (৫) টেম্পো সকালে ১৬ দশমিক ২, বিকালে ১২ দশমিক ৭ কিলো; (৬) রিকশা—সকালে ৯ দশমিক ১ কিলো, বিকালে ৮ দশমিক ২ কিলো; আর (৭) লরি—সকালে ২০ দশমিক ৮ কিলো, বিকালে ১৫ কিলো। বর্তমানের এ গড় গতি খুবই কম। আর এ মুহূর্ত থেকে যদি কোনো ধরনের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা করা না হয় তাহলে ২০৩০ সালে যানবাহনের গড় গতি নেমে আসবে ৫ থেকে ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। অর্থাৎ পুরো বন্দর নগরী স্থবির হওয়ার পর্যায়ে চলে আসবে। 

স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানে ২০১৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বন্দর নগরের ট্রাফিক জেনারেশনের ওপর কী ধরনের পরিবর্তনগুলো আসবে তার পূর্বাভাসও দিয়েছে। তা হলো: (১) মোট দৈনিক যাতায়াত ট্রিপ বাড়বে ৬০ শতাংশ, যা ৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন থেকে ১০ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন; (২) গণপরিবহন ট্রিপ বাড়বে ৪০ শতাংশ, যা ২ দশমিক ৯ মিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ১ মিলিয়ন; (৩) পদচারী ট্রিপ বাড়বে ৪০ শতাংশ, যা ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন; (৪) প্রাইভেট কার ট্রিপ বাড়বে ১৬০ শতাংশ, যা শূন্য দশমিক ৮ মিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন এবং (৫) ট্রাক ট্রিপ বাড়বে ২২০ শতাংশ, যা ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার। 

একুশ শতকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নগর গতিশীলতা বাড়ানো। কারণ বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিং করপোরেশন (আইএফসি) গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ নগরে বসবাস করবে ২০৩০ সালের মধ্যে। এ বিশাল জনগোষ্ঠী নগর গতিশীলতা ব্যবস্থাপনায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে, যেটা সামাল দেয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

একটা নগরের সুষ্ঠু পরিবহন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে নগরের গতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায্যতা, দূষণমুক্ত পরিবেশ, সমতা ও সুখ। চট্টগ্রাম শুধু নগর নয়—এটা বন্দর নগর। অন্য নগরের চেয়ে বন্দর নগরের পরিবহন পরিকল্পনা বহুমাত্রিক ও জটিল। এটা একটা বিজ্ঞান। সরলীকরণ করে কারো একক সিদ্ধান্তে বিচ্ছিন্নভাবে বন্দর নগরের পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে টেকসই, গতিশীল ও বাসযোগ্য করে গড়ে তোলা আদৌ সম্ভব নয়। 

চট্টগ্রাম নগরে চলাচলকারী যানবাহন নিয়ে একটি আনুমানিক চিত্র কল্পনা করি। ৩৩ জন যাত্রী পরিবহন করতে কোন পরিবহন কতটা লাগছে এবং প্রতিযাত্রী সড়কের কতটা জায়গা (স্পেস) দখল করছে তার তথ্য: 

(১) বাস লাগে—একটি আর যাত্রীপ্রতি জায়গা প্রয়োজন ৭ দশমিক ৮২ বর্গফুট; (২) টেম্পু লাগে ৩ দশমিক ২টি আর যাত্রীপ্রতি জায়গা প্রয়োজন ৭ দশমিক ৯১ বর্গফুট; (৩) বেবিট্যাক্সি লাগে ১৫টি আর যাত্রীপ্রতি জায়গা প্রয়োজন ১১ দশমিক ৭৫ বর্গফুট; (৪) রিকশা লাগে ২১টি আর যাত্রীপ্রতি জায়গা প্রয়োজন ১৬ দশমিক ১৫ বর্গফুট; (৫) কার লাগে ২৭ দশমিক ৫টি আর যাত্রীপ্রতি জায়গা প্রয়োজন ৮২ দশমিক ৯১ বর্গফুট। এখানে দেখা যাচ্ছে, পাঁচ ধরনের মিক্সড যানবাহনে যাত্রী পরিবহন করছে ৫× ৩৩ = ১৬৫ জন। এ ১৬৫ জন যাত্রী পরিবহন করতে মিক্সড (যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক) যানবাহন লাগছে ৬৭ দশমিক ৭টি আর মিক্সড যানবাহন ব্যবহার না করে যদি গণপরিবহন বাস ব্যবহার করা হয় তাহলে সমপরিমাণ যাত্রী পরিবহন করতে বাস লাগবে মাত্র পাঁচটি। 

মিক্সড যানবাহনে যাত্রীপ্রতি যে সড়কের জায়গা লাগছে তা পার্কিং (দাঁড়ানো) অবস্থায়। আর যখন গাড়িগুলো বেশি গতিতে চলবে তখন পার্কিং অবস্থার চেয়ে অনেক গুণ বেশি জায়গার প্রয়োজন হবে।

চট্টগ্রাম নগরে একই সড়কে যান্ত্রিক, কম গতির অযান্ত্রিক যানবাহন (রিকশা) এবং মানুষ চলাচল করে। সড়কে ভিন্ন ভিন্ন গাড়ির জন্য ভিন্ন ভিন্ন কোনো লেন নির্দিষ্ট করা নেই। ফলে এ গাড়িগুলোর মধ্যে কার আগে কে যাবে তার একটা বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। যান্ত্রিক যানবাহনের সামনে চলে আসে ধীর গতির অযান্ত্রিক যানবাহন। এতে যান্ত্রিক যানবাহনের গতি যাচ্ছে কমে। সৃষ্টি হচ্ছে অহেতুক যানজট, নষ্ট হচ্ছে শ্রমঘণ্টা আর দূষিত হচ্ছে বায়ু। 

দুর্ভাগ্য আমরা একুশ শতকে এসেও বাস্তব সত্য উপলব্ধি করতে অক্ষম! অবাক করার বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা না করে শুধু প্রাইভেটকার চলাচলকে প্রাধান্য দিয়ে অগ্রাধিকারহীন বিশাল অংকের উড়াল সড়ক নির্মাণ করেই চলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উপলব্ধিই করতে পারছে না যে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া, গণপরিবহন চাহিদা ব্যবস্থাপনা ছাড়া ও সুষ্ঠু ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনা ছাড়া বিশ্বের কোথাও শুধু অপরিকল্পিত অগ্রাধিকারহীন উড়াল সড়ক করে নগর গতিশীলতা বাড়াতে পারেনি। 

‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট’তে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৭টি এজেন্ডা গৃহীত হয়। তার ১১ নম্বর এজেন্ডায় আছে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাতসহনশীল এবং টেকসই নগর ও জনবসতি গড়ে তোলা’। আর অভীষ্ট ১৬-তে বলা হয়েছে ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য, সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ সুগম করা এবং সব স্তরে কার্যকর, জবাবদিহিতাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ’। অথচ আমরা আজ অবধি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলিনি। হাঁটছি ঠিক উল্টো পথে। 

টেকসই গতিশীল নগরায়ণ করতে প্রয়োজন গুণমানসম্পন্ন আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যা আমাদের নেই! যদিও ১৯৯৫ সালের দীর্ঘমেয়াদি ট্রাফিক অ্যান্ড ট্রান্সপোরটেশন ডেভেলপমেন্ট স্ট্র্যাটিজি প্ল্যানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠানে থাকতে হবে যোগ্য অভিজ্ঞ নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবহন বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, পরিবহন অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ এবং আরো প্রয়োজনীয় পেশাজীবী ব্যক্তিবর্গ। দীর্ঘ ২৯ বছরে কর্তৃপক্ষ একটা প্ল্যানিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজন বোধ করেনি, যা দুর্ভাগ্যজনক! 

আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোয় পলিসি গ্রহণ, পরিকল্পনা, প্রকল্প সমীক্ষা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে জ্ঞানসম্পন্ন যথার্থ জনবল নেই। শুধু তা-ই নয়, তারা জনগণকে সম্মান করে না, জনগণের সুপারিশ আমলেও নেয় না। তারা নিজেদেরকে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে মনে করেন। তারা প্রয়োজনভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা পরিকল্পনা না করে বিশাল অংকের অভিলাষভিত্তিক গোষ্ঠী স্বার্থে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে বেশি আগ্রহী। তারা পরিবহন অবকাঠামোয় যে বিনিয়োগ করছে তা মোটেই অভিঘাতসহনশীল ও নয়। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক জন রুম বলেন, ‘অভিঘাতসহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ মানে অধিক অর্থ ব্যয় নয়, বরং উত্তম ব্যয়। অভিঘাতসহনশীল অবকাঠামো মানে সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সড়ক তৈরি নয়, বরং মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করা। 

বর্তমানে চট্টগ্রামে যে প্রক্রিয়ায় নগরায়ণ হচ্ছে তাতে টেকসই গতিশীল পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে ওঠার পরিবর্তে তা নগর সভ্যতা, ইতিহাস, ইতিহ্য ও উন্মুক্ত পরিসরকে ধ্বংস করছে। নগর গতিশীলতায় সৃষ্টি করছে অচলায়তন। 

সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি বন্দরনগরকে টেকসই ও গতিশীল করে গড়ে তোলার। প্রয়োজন শুধু সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো, যা অপরিহার্য। মনে রাখতে হবে, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ছে। নতুন পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে এবং আগামী এপ্রিল-মের মধ্যে নতুন টার্মিনাল অপারেশনে যাবে। বিদেশী সৌদি কোম্পানি এ বন্দর পরিচালনা করবে। বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং যাবে বেড়ে। 

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে বন্দরনগরকে গতিশীল করা অপরিহার্য। প্রয়োজন সুষ্ঠু গণপরিবহন ও পণ্যপরিবহন ব্যবস্থাপনা। এ মুহূর্তে করণীয়: (১) অভিজ্ঞ ট্রান্সপোর্টেশন প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদ দিয়ে বন্দরনগরের জন্য একটি ইন্টিগ্রেটেড মাল্টিমডেল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা; (২) গুণমানসম্পন্ন জবাবদিহিমূলক প্ল্যানিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং (৩) কারো একক সিদ্ধান্তে বিচ্ছিন্নভাবে অগ্রাধিকারহীন পরিকল্পনা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা। 

সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া: সড়ক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি