দীর্ঘায়ু ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য সবচেয়ে অপরিহার্য পরিবেশগত উপাদান হলো বিশুদ্ধ বায়ু। এদিকে বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশে বায়ুদূষণের মাত্রা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। ২০২২ সালে বেসরকারি স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেশে ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৪টি জেলারই বায়ুর মান আদর্শ মাত্রার চেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত দূষিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয় দেশের ১৮টি জেলাকে। এছাড়া ওই গবেষণায় মাত্র ১০টি জেলার বায়ুর মান আদর্শ মাত্রার মধ্যে আছে বলে জানা যায়। ২০২৩ সালেও বায়ুদূষণের মাত্রায় কোনো হেরফের হয়নি। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের ‘বৈশ্বিক বায়ুমান প্রতিবেদন ২০২৩’ থেকে জানা যায়, সর্বোচ্চ বায়ুদূষণের তালিকায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। যেখানে ২০২২ সালের প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ বায়ুদূষণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বায়ুদূষণ ভয়ংকর রূপ পরিগ্রহ করেছে।

আইকিউএয়ারের তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতি ছিল ৭৯ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম। বায়ুদূষণের অন্যতম উপাদান ‘পিএম ২.৫ বা অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতি হিসাব করেই মূলত বায়ুমান নির্ণয় করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে এ অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, গত বছরে বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতি ছিল আদর্শ মানদণ্ডের প্রায় ১৬ গুণ।

প্রাকৃতিকভাবে ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণেই বায়ু দূষিত হয়ে থাকে। তবে মানবসৃষ্ট কারণে বর্তমানে বায়ুদূষণ এ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলা যায়। অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, যত্রতত্র গড়ে উঠা সেকেলে ঘরানার ইটভাটা, ছোট-বড় শিল্প-কারখানা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং ময়লা-আবর্জনা পোড়ানো ইত্যাদি কারণে দূষণ বেড়েই চলেছে। ক্যাপস গবেষণা অনুযায়ী, দেশের বায়ুদূষণের ৫০ শতাংশেরও বেশি ঘটে শিল্প-কারখানা থেকে। এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় জমিতে ছিটানো কীটনাশক, রান্নাঘরের জ্বালানির ধোঁয়া থেকেও বায়ুদূষণ হচ্ছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণও বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ রাজধানী ঢাকা। ঢাকার আশপাশের প্রায় ১ হাজার ২০০টি ইটভাটা রয়েছে। আর কলকারখানা তো জালের মতো ছড়িয়ে আছে ঢাকা শহরে। ফলে দূষণ বেড়েই চলছে। আইকিউএয়ারের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে দূষিত রাজধানীর তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। অভ্যন্তরীণ কারণ ছাড়াও দেশে বায়ুদূষণ ঘটে থাকে পাশের দেশ থেকে আগত দূষিত বায়ুর কারণে। যাকে বলে ট্রান্স-বাউন্ডারি এয়ার পলিউশন বা আন্তঃমহাদেশীয় বায়ুদূষণ। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারির দিকে দিল্লি, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে ‘ট্রান্স-বাউন্ডারি ইফেক্ট’ হিসেবে বাংলাদেশে দূষিত বায়ু প্রবেশ করে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ফসল সংগ্রহ করার পর খড়-গাদাগুলোকে পুড়িয়ে দেয়া এবং দীপাবলির কারণে দিল্লির বায়ুদূষণ শীতকালে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তার প্রভাব পড়ে দেশের বায়ুমণ্ডলে। বায়ুদূষণ এভাবে চলতে থাকলে মানুষের আয়ুষ্কাল এবং সুস্থ জীবন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে। 

বায়ুমণ্ডলের অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা সহজেই মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে এবং তা নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করে। ডব্লিউএইচওর তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণের কারণে বছরে ৪২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। অর্থাৎ মানুষের আয়ু কমে যাচ্ছে। আর বায়ুদূষণ থেকে যেসব স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি হয়, এর মধ্যে গুরুতর হলো শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের সংক্রমণ, কিছু কিছু ক্যান্সার, অ্যালার্জি ইত্যাদি। অতিরিক্ত বায়ুদূষণের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়ছে মানুষের প্রজনন ক্ষমতায়। এতে পুরুষের শুক্রাণু তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটছে, শুক্রাণুর মান কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে মেয়েদের ডিম্বাণু কমে যাচ্ছে কিংবা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এছাড়া বাতাসে সিসার পরিমাণ বেশি হলে তা মস্তিষ্কের ক্ষতি সাধন করে। শিশুদের বুদ্ধিমত্তা লোপ পায় এর ফলে। শুধু যে মানবশরীরের ক্ষতি হয় এমন নয়, বায়ুদূষণ পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। ক্ষুদ্রাকার কণাগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায় এবং একসময় অ্যাসিড বৃষ্টির সূত্রপাত ঘটায়, যা প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে থাকে। এ ভয়াবহতা থেকে নিস্তার লাভ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। 

দেশে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হলো ইটভাটা। বায়ুদূষণ হ্রাস করার লক্ষ্যে ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯)’ শীর্ষক আইন প্রণয়ন করা হয়। ক্যাপসের গবেষণা অনুযায়ী, কেবল ঢাকার আশপাশের প্রায় ১ হাজার ২০০টি ইটভাটা, ছোট-বড় কয়েক হাজার শিল্প-কারখানা আছে। বায়ুদূষণরোধ, নিয়ন্ত্রণ এবং বায়ুমানের উন্নতি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সুরক্ষায় ‘নির্মল বায়ু্ আইন-২০২৯’ গৃহীত হয়। দেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ক-তে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবেশ সুরক্ষা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। বায়ুদূষণের বর্তমান তথ্য-উপাত্ত বলছে, এসব আইন-অনুচ্ছেদের কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই। সুতরাং আইন কার্যকর করতে হবে শুরুতেই। অবৈধ ইটভাটা নিষ্ক্রিয় করতে হবে এবং প্রয়োজনে আধুনিকায়ন করতে হবে; শিল্প-কারখানার মালিকদের বাধ্য করতে হবে বায়ুদূষণ রোধে যথাযথ উদ্যোগ নিতে। মোট কথা, দায়ী খাতগুলোকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে এ দূষণ কখনই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। দেশে বায়ুর মান নিয়ে গবেষণা জোরদার করতে হবে, যেন দূষণের মাত্রা আগের চেয়ে বেড়েছে নাকি কমেছে সে সম্পর্কে নিয়মিতভাবে অবগত থাকা যায় এবং সে মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। পরিবেশ অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। 

শুষ্ক মৌসুমে দূষিত শহরগুলোয় ২-৩ ঘণ্টা পরপর পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা, নির্মাণকাজের সময় নির্মাণ স্থান ঢেকে রাখা, নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের সময় ঢেকে নেয়া, রাস্তায় ধুলা সংগ্রহের জন্য সাকশন ট্রাক ব্যবহার করা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। এছাড়া বনায়ন, ছাদবাগান উৎসাহিত করার জলাধার সংরক্ষণ করাও জরুরি। এ বিষয়ে জনগণকে সম্পৃক্ত ও সচেতন করতে হবে। বায়ুদূষণ রোধ ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ কাম্য।