দেশের অর্থনীতির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের সহজলভ্যতা দেশের অর্থনীতিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। দেশে পর্যাপ্ত উত্তোলনযোগ্য গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে। অথচ সঠিক পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের অভাবে মজুদকৃত গ্যাস উত্তোলন করা যাচ্ছে না। যার ফলে দেশে গ্যাস সংকট নিরসনে আবিষ্কৃত উত্তোলনযোগ্য গ্যাস কোনো কাজে আসছে না। জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে দেশের চলমান সংকট নিরসনে আমদানিনির্ভর জ্বালানি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। জ্বালানি সংকট নিরসনে দেশের উত্তোলনযোগ্য গ্যাস উত্তোলনে ও ব্যবহারে সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপ জরুরি। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সংকট নিরসন করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। 

দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দুটি ভূতাত্ত্বিক কাঠামো সম্ভাবনাময়। এর একটি সুরমা বেসিন। অন্যটি বেঙ্গল বেসিন। বৃহত্তর সিলেট, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদীসহ যেসব এলাকায় বিদ্যমান গ্যাস ক্ষেত্রগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে এর সবই সুরমা বেসিনের অন্তর্ভুক্ত। মূলত ওই অঞ্চলেই অনুসন্ধান, আবিষ্কার ও উত্তোলন করে আসা হয়েছে। সেই তুলনায় বেঙ্গল বেসিনে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান অবহেলিত বা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। ফলে একমাত্র ভোলা ছাড়া বেঙ্গল বেসিনে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আবিষ্কার হয়নি। অথচ বিশেষজ্ঞরা বেঙ্গল বেসিনকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় মনে করেন। শুধু প্রয়োজন অনুসন্ধান করে তা আবিষ্কার করা। তবে এ বিশাল কর্মকাণ্ড একা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) পক্ষে করা সম্ভব নয়। এজন্য দরকার আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান কোম্পানির সহযোগিতা। সেই সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ফলে দেশ ক্রমাগতভাবে জ্বালানি আমদানির বিপজ্জনক নির্ভরশীলতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। দেশের জ্বালানি সম্পদের উন্নয়ন না করা হলে আমদানির এ ঝোঁক দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে তা বলা মুশকিল।

ভোলার গ্যাস আবিষ্কারের পর প্রায় তিন দশক অতিক্রম করেছে। অথচ এ গ্যাস ব্যবহার নিয়ে সরকার আগে থেকে কোনো পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্তে আসেনি। দেশে বর্তমানে বিভিন্ন খাতে গ্যাসের তীব্র সংকট। এ সংকট মোকাবেলায় ভোলার উত্তোলনযোগ্য মজুদ গ্যাস উৎপাদন করে ব্যবহার করা সম্ভব হলে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। চলমান সংকটে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস থাকার পরও তা ব্যবহার করতে না পারা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশীয় গ্যাস উত্তোলন ও ব্যবহারে আরো সঠিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। 

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভোলার গ্যাসকে মূল ভূখণ্ডে সরবরাহের জন্য সরকারি উদ্যোগের পাইপলাইন নির্মাণ করা হলে স্বল্প খরচে এ গ্যাস ব্যবহার করা যাবে। পাইপলাইন করে গ্যাস গ্রিডে আনার চিন্তাটা আরো আগেই করা দরকার ছিল। দেশের জ্বালানি খাতের সামগ্রিক বিষয় চিন্তা করলে সরকার নিজে বিনিয়োগ করে এ গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করতে পারে। তাতে গ্যাস খাতের সংকট কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করা যায়।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুসারে, দ্বীপ জেলা ভোলায় এখন পর্যন্ত তিনটি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। এখানে গ্যাসের মোট উত্তোলনযোগ্য মজুদ আবিষ্কার হয়েছে ১ হাজার ২১৭ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। এর মধ্যে একটি গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করে স্থানীয় শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হচ্ছে। গত জুন পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় এখন উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট মজুদ ১ হাজার ৭৫ বিসিএফ। বাজারদর হিসাব করে দেখা গেছে, মজুদ এ গ্যাসের মূল্য ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে অর্থনৈতিক মুনাফাযোগ্যতা নিয়ে সংশয় থেকে এসব ক্ষেত্রের গ্যাস মূল ভূখণ্ডে সরবরাহের জন্য পাইপলাইন নির্মাণ করা যায়নি।

সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ সক্ষমতার ৩৫ শতাংশই আসার কথা আমদানিনির্ভর গ্যাস ও এলএনজি-নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। বিদ্যুতের একটি বড় অংশ আসবে আমদানিনির্ভর কয়লা ও জ্বালানি তেল থেকে। নবায়নযোগ্য উৎস বা দেশীয় উৎস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনায় জোর দেয়া প্রয়োজন। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সবকিছুকে প্রভাবিত করে। ব্যক্তি, হাউজহোল্ড, ব্যবসা, কৃষি সব খাতেই জ্বালানির দামের প্রভাব পড়ে। জ্বালানির মূল্যই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। প্রথমত, আমদানি করা, তারপর এখানে আসার পর দাম বাড়ানো হচ্ছে দফায় দফায়। বহিঃস্থ কারণে শুরু, কিন্তু অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বারবার বাড়ানোর ফলে এটা মূল্যস্ফীতির চাপকে আরো বাড়িয়েছে। প্রাপ্যতা সংকট সবসময়ই সমস্যা ছিল, এখন তা আরো বেড়েছে। এটা নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা।

আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের নানামুখী ঝুঁকি থাকে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, উৎপাদন ও দাম নিয়ে কারসাজিসহ বিভিন্ন কারণে জ্বালানির বাজার সারা বছরই দোদুল্যমান থাকে। মাঝে মাঝেই দাম বেড়ে রেকর্ড করে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিশেষজ্ঞরা এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, এলএনজি, জ্বালানি তেল প্রভৃতির বাজার অস্থিতিশীল। এর দাম দ্রুত ওঠানামা করে। কোনো কারণে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন উদ্যোক্তারা। 

বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর পেছনে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যের গ্যাসের সরবরাহ। স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান আসায় স্বল্প মূল্যে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে এটি প্রদান করা গেছে। এতে স্বল্প মূল্যে পণ্য উৎপাদন করা গেছে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানি তেলের সঙ্গে এলএনজির দামও বাড়ছে। আগামীতে আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্ধারিত সময়ে চালু করা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার সবসময়ই দোদুল্যমান। ফলে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিষয়টি বিবেচনায় রেখে একক জ্বালানিনির্ভরতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। বাংলাদেশে জল ও স্থলভাগে আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটিকে কাজে লাগাতে হবে। 

জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ বেগবান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এখনো পরিপক্ব হয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে। 

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন সময় দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে কাজ করেছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়নি। জ্বালানি খাতে বিভিন্ন সময়ে উচ্চাভিলাষী ও অবাস্তব প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এসব প্রক্ষেপণ ও পরিকল্পনার বড় অংশজুড়েই ছিল আমদানিনির্ভর জ্বালানি। প্রাথমিক জ্বালানির বিষয়টি নিয়ে একটা পরিপূর্ণ সমাধানে আসা যায়নি। অথচ এর সমাধানও রয়েছে। কিন্তু গোষ্ঠী স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো প্রাধান্য দিতে গিয়ে জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধানের পথগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি, যার খেসারত জনগণকে দিতে হচ্ছে। 

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কেমন, তা নিয়ে তেমন কোনো সমীক্ষা হয়নি, গবেষণা হয়নি। এ ধরনের গবেষণা ও বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা সংশোধনপূর্বক দেশীয় উৎসনির্ভর করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লাসহ অন্যান্য সম্পদ ব্যবহারে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উত্তোলন, উদ্ভাবনের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন।