বাংলাদেশের রূপান্তরের সঙ্গে এ দুই সম্পদের রূপান্তরও জড়িত। তাই আমাদের মনোযোগ মানুষ ও জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের দিকে দিতে হবে। কৃষির উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, দেশের শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এর অর্থ এই নয় যে তারা সবাই সার্বক্ষণিক কৃষক; তবে তাদের জীবিকার প্রধান ভিত্তি কৃষি। অথচ জিডিপিতে কৃষির অবদান মাত্র ১২-১৩ শতাংশ। অর্থাৎ শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও অর্থনীতিতে তাদের অবদান তুলনামূলক কম। এ থেকেই বোঝা যায়, এ খাতে বড় ধরনের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
অন্যদিকে দেশের কৃষিজমির উৎপাদনশীলতাও প্রত্যাশিত নয়, এখানে হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদন চীনে ধানের গড় উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। আবার এখানে শস্য উৎপাদনের পর অপচয়ও বড় সমস্যা। খেত থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছার আগেই বিভিন্ন কৃষিপণ্যের প্রায় ১২-৩০ শতাংশ অপচয় হচ্ছে; কোনো কোনো সবজির ক্ষেত্রে এ হার ৪০ শতাংশ। এ অপচয় শুধু খাদ্যের নয়, উৎপাদনের অন্যান্য উপাদান ও জ্বালানিরও অপচয়।
এখন দেশের শক্তি খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, মোট গ্যাস সরবরাহের ৩৫ শতাংশই এলএনজিনির্ভর। আবার এ গ্যাস ব্যবহার করে গ্রিড ও ক্যাপটিভ খাতে প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। অর্থাৎ দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অনেকাংশেই এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের বিদ্যুৎ খাত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৬৫০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা। এ হার ভিয়েতনামের তুলনায় মাত্র ২৫ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডের তুলনায় ২০ শতাংশ। এসব দেশের পর্যায়ে যেতে হলে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার কতটা বাড়াতে হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
এক্ষেত্রে কেবল নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমাধান না। জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বিশ্ব দ্রুত সেদিকেই এগোচ্ছে; এর সুযোগও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভর করে অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। আর জ্বালানি ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দুতে চারটি খাতকে রাখতে হবে—কৃষি, শিক্ষা, শক্তি এবং পরিবহন ও লজিস্টিকস। এক্ষেত্রে শিল্পকে আলাদাভাবে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রয়োজন নেই। কেননা এ চার খাত শক্তিশালী হলে শিল্পায়নের ভিত্তিও স্বাভাবিকভাবে তৈরি হবে। একই সঙ্গে সমগ্র শক্তি ব্যবস্থাপনাও এ চার খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। অর্থাৎ পুরো শক্তি নিরাপত্তার উদ্দেশ্য হবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক রূপান্তর
নিশ্চিত করা।
কিন্তু এ লক্ষ্য অর্জনের পথে তিনটি বড় বাধা রয়েছে—দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং নীতিগত পরিকল্পনার ঘাটতি। অনেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে এর চেয়েও বড় সমস্যা দুর্নীতি। দুর্নীতি শক্তি খাতকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সেটা জাতীয় রিভিউ কমিটিতে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন চুক্তি পর্যালোচনা করার সময় দেখেছি। অনেক বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) ভেতরে সুস্পষ্ট রেন্ট-সিকিং বা খাজনাভিত্তিক সুবিধা গ্রহণের প্রবণতা দেখা গেছে। প্রতিটি চুক্তিতে নয়, কিন্তু বহু চুক্তিতেই এমন প্রবণতা স্পষ্ট। এর ফলে রাষ্ট্রের ব্যয় বেড়েছে এবং জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে অদক্ষতা কেবল বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনায় নয়; কৃষি, প্রশাসন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সর্বত্র বিদ্যমান। কৃষিপণ্যের অপচয় যেমন উৎপাদন ব্যবস্থার অদক্ষতার উদাহরণ। তেমনি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও একই সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে প্রশাসনিক কাঠামোর অদক্ষতা এবং অনেক ক্ষেত্রে রেন্ট-সিকিং প্রবণতা নীতিনির্ধারণকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিদ্যুৎ খাতে অদক্ষতার একটি উদাহরণ হলো ব্যাটারিচালিত রিকশা। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ, ব্যাটারি চার্জিং এবং পরে সেই ব্যাটারি থেকে মোটর চালানো—পুরো প্রক্রিয়ার সম্মিলিত দক্ষতা ১৫ শতাংশেরও কম; ব্যক্তিগত মূল্যায়নে এটি ১০ শতাংশেরও কম হতে পারে। অর্থাৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবহনসেবা দেয়া হলেও শক্তি ব্যবহারের দিক থেকে এটি অত্যন্ত অদক্ষ। অর্থাৎ আমদানি করা ব্যয়বহুল এলএনজিও আমরা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছি না। তাই এর বিকল্প ও অধিক কার্যকর ব্যবহারের উপায় নিয়ে ভাবতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সৌরশক্তি ব্যবহার করে দিনের বেলায় চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। রেলস্টেশন, মেট্রোরেল স্টেশনসহ বিভিন্ন গণপরিবহন অবকাঠামোকে চার্জিং হাব হিসেবে ব্যবহার করারও সুযোগ রয়েছে।
এর বাইরে রয়েছে নীতিগত পরিকল্পনায় ঘাটতি। উদাহরণ হিসেবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) বিদ্যুৎ ব্যবহার ধরা যেতে পারে। পাওয়ার গ্রিডের বিভিন্ন সময়ের লোড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গ্রীষ্মকালে শুধু ঘর ঠাণ্ডা রাখার জন্য প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, এ ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কি আমদানি করা এলএনজি ব্যবহার করে শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণেই ব্যয় করা হবে, নাকি একই বিদ্যুৎ শিল্প উৎপাদন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, কোল্ড স্টোরেজ কিংবা অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হবে? এ সিদ্ধান্তই নীতিগত পরিকল্পনার অংশ।
এগুলোর বাইরে জ্বালানি রূপান্তরে প্রযুক্তিগত বাস্তবতাও বিবেচ্য। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গ্রিডে ইচ্ছামতো ৮ হাজার বা ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব নয়।
উদাহরণ হিসেবে একটি ৪০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা বলা যায়, যার প্রযুক্তিগত সর্বনিম্ন উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ২৪০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সচল রাখলে এর নিচে উৎপাদন নামানো যায় না। আবার বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ইচ্ছামতো বারবার চালু বা বন্ধও করা যায় না। একবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় চালু করতে অতিরিক্ত সময়, জ্বালানি ও ব্যয় প্রয়োজন হয় এবং দক্ষতাও কমে যায়। তাই গ্রিডের সক্ষমতা, বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংযোজন সব কিছু পরিকল্পনায় আনতে হবে।
সবশেষে বাংলাদেশের জন্য একটি সুস্পষ্ট জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি, প্রতিটি বিনিয়োগ এবং প্রতিটি জ্বালানি পরিকল্পনার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ, জনগণের ভোগক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সমাজের উৎপাদনক্ষমতার ধারাবাহিক পুনরুৎপাদন নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্য অর্জনে চারটি খাত—কৃষি, শিক্ষা, শক্তি এবং পরিবহন ও লজিস্টিকস—হতে হবে উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। একই সঙ্গে দুটি মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য—ভূমি সংস্কার ও শিক্ষা সংস্কার।
বিশেষ করে ভূমি সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেন্ট-সিকিং প্রবণতার একটি বড় উৎস ভূমি। উৎপাদনে কোনো অবদান না রেখেও উৎপাদিত সম্পদের মূল্য আত্মসাৎ করার যে প্রবণতা, সেটিই রেন্ট-সিকিং। এটি দুর্নীতিরই একটি রূপ, যা আমলাতন্ত্র, রাজনীতি কিংবা ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এ প্রবণতা কমাতে হলে উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থার সংস্কার অপরিহার্য। একই সঙ্গে শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে মানবসম্পদের গুণগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল জ্বালানি সরবরাহের বিষয় হয়ে থাকবে না; বরং তা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের কার্যকর ভিত্তি হয়ে উঠবে।
ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী: সাবেক উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]










