কয়েক বছর ধরেই দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড সর্বোচ্চ ছিল। এ বছর তিন লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। গত বছরও এ রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এ সময় এক লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ৫৭৫ জন মারা যান। এদিকে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। মারা গেছেন ২৭৮ জন। শুধু তাই নয়, সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৪২ শতাংশ। এ থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে দায়িত্বপ্রাপ্তদের দিক থেকে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি থেকে গেছে। কেননা ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে এর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

কীটতত্ত্ববিদরা দীর্ঘদিন ধরেই ডেঙ্গু প্রতিরোধের ওপর জোর দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, মশার লার্ভা নির্মূল করা ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ উপায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো কর্তৃপক্ষের এদিকে মনোযোগ নেই। প্রতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে গেলে কর্তৃপক্ষকে কিছুটা নড়েচড়ে বসতে দেখা যায়। কিন্তু ততদিনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অথচ ডেঙ্গু পরিস্থিতির বোঝা ও মোকাবেলার জন্য প্রতি বছর প্রাক-বর্ষা জরিপ পরিচালনা করা হয়। সে জরিপে দেখা গেছে, মশার প্রজনন উৎস হিসেবে সিমেন্টের পানির ট্যাংক সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, ২২ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মেঝেতে জমে থাকা পানি। অন্যান্য প্রজনন উৎসের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের ড্রাম, ওয়াটার মিটার চেম্বার, প্লাস্টিকের বালতি, ফুলের টব ও ট্রে, প্লাস্টিকের পাইপের গর্ত, পরিত্যক্ত টায়ার, বাড়ির ভেতরের পানির চ্যানেল ইত্যাদি। আর এডিস মশার লার্ভার সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব পাওয়া গেছে বহুতল ভবনগুলোয়, যার হার ৫৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

এ বছরের প্রাক-বর্ষা জরিপের তথ্য মোতাবেক কীটতত্ত্ববিদরা সতর্কও করেছিলেন যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হতে পারে। বিশেষত গত জানুয়ারি থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় এডিস মশার লার্ভার অস্বাভাবিক বেশি ঘনত্ব পাওয়া যায়। যে কারণে তাদের আশঙ্কা ছিল কার্যকর ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ বছরও এর সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়বে। কীটতত্ত্ববিদদের সুপারিশ ছিল, ডেঙ্গুর হটস্পটগুলোয় মশা নিধন ও দেশের সর্বত্র এর প্রজনন উৎসগুলো ধ্বংসে কাজ করতে হবে। কিন্তু এর পরও মশার লার্ভা ধ্বংসের তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যে কারণে বর্তমানে রাজধানীসহ পুরো দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বলা বাহুল্য, এ কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার সর্বোচ্চ। এমন পরিস্থিতিতে আগামীতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। কারণ ডেঙ্গুর ধরন, উপসর্গ ও মৌসুম অনেক বেশি পাল্টে গেছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ভাষ্যমতে, ডেঙ্গুর ১, ২, ৩ ও ৪ নামে চারটি ধরন আছে। এর মধ্যে গত তিন বছর মানুষ বেশি আক্রান্ত হয়েছে ধরন-২-এ (ভ্যারিয়েন্ট)। চলতি বছর এর সঙ্গে ধরন-৩-এ আক্রান্তও বেড়েছে। নতুন এ ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় রোগীর ঝুঁকিও বেড়ে গেছে। ডেঙ্গুর ধরন বদলে যাওয়ার প্রভাব উপসর্গে পড়েছে। ফলে সহজে শনাক্তও করা যাচ্ছে না। আবার এক সময় ডেঙ্গুকে বর্ষাকালের রোগ বলা হতো। আগস্টে এতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হতো। কিন্তু বর্তমানে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হতে দেখা গেছে। সেই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও এ সময় বেড়েছে। এমনকি নভেম্বরেও এর রাশ টানা যায়নি। এবারো আশঙ্কা করা হচ্ছে চলতি মাসে এর প্রাদুর্ভাব কিছুটা কমতে পারে। তবে উল্লেখযোগ্য হারে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমবে না।

এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী সঠিকভাবে কীটনাশক প্রয়োগ না করা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশন সমস্যা ও আবহাওয়ার প্রভাবে মশার বংশবিস্তার। পাশাপাশি অপর্যাপ্ত সরকারি উদ্যোগ, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা ও ফগিংনির্ভর মশা নিধনের ভ্রান্ত ধারণাও এর জন্যও দায়ী। প্রতি বছরই বর্ষার শুরুতে মশা দমন কার্যক্রম জোরদারের আশ্বাস দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে স্বাস্থ্য খাতের অদূরদর্শিতা ও অব্যবস্থাপনাই চোখে পড়ে। কীটনাশক প্রয়োগ থেকে শুরু করে নালা-নর্দমা পরিষ্কার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম দেখা যায়। মশা নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসরণ না করে ‘আনুষ্ঠানিকতা’ দেখানো প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেঙ্গু রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনার কোনো কার্যক্রমই বিজ্ঞানসম্মতভাবে হচ্ছে না। সব কার্যক্রম হাসপাতালভিত্তিক। রোগী শনাক্ত হওয়া মানেই তাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, এমন ধারণা এখানে প্রচলিত। যাদের অবস্থা সংকটাপন্ন তাদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। বাকিদের সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দিলে এর নিরাময় সম্ভব। তবে এসবের পাশাপাশি নাগরিকদের অসচেতনতার দায়ও রয়েছে। তাদেরও সতর্ক হতে হবে। বহুতল ভবনগুলোয় যারা বাস করেন, তাদের সচেতন হতে হবে, যাতে কোথাও পানি না জমে।

সরকারের উচিত ডেঙ্গু প্রতিরোধসংক্রান্ত কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করা। জনগণকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। এর বাইরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ডেঙ্গু শনাক্তের ব্যবস্থা করা দরকার। ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে গেলে রোগীদের হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। এটি জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থাকে নির্দেশ করে। অথচ এক্ষেত্রে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগানো সম্ভব। মনে রাখা প্রয়োজন, ডেঙ্গু বর্তমানে শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি নগর ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ রক্ষা ও শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। ডেঙ্গুর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া যায় এডিস মশা প্রজননকালেই।