ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে বণিক বার্তাকে বলেছিলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের দুটি অর্জনের মধ্যে একটি হচ্ছে, এটি সাতচল্লিশ থেকে এখন পর্যন্ত বিরাজমান রাজনীতির প্যারাডাইমে পরিবর্তন এনেছে। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখনো কি সেটি মনে হচ্ছে?

নিশ্চয়ই। এদিকে পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ধারক-বাহকরা রাজনীতিকে তাদের পুরনো বিভাজনের ছকে আবারো নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে তারা অনেকাংশে সফলও হয়েছে। তবু এটা সত্য যে সমাজে নতুন রাজনীতির যে পাটাতন তৈরি হয়েছে এবং রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, সেটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এখন আর রাজনীতি করা সম্ভব হবে না। আগামীতে এ চাহিদা বা রাজনৈতিক শর্ত আরো জোরালো আকারে এবং রাজনীতির নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত হবে। তখন এ বিষয় মোকাবেলা না করে এ সমাজ ও রাষ্ট্রের রাজনীতি আর এগোতে পারবে না।

জুলাই সনদ প্রণয়ন ও ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক রয়ে গেছে। অভ্যুত্থানের দুই বছর পরও রাজনৈতিকভাবে এ বিষয়ে ঐকমত্যে না পৌঁছানোর পেছনে কারণ কী হতে পারে?

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে ভিন্নমতগুলো নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করে জনগণের কাছ থেকে মতামত নেয়ার কথা ছিল। যেসব দল যেসব বিষয়ে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) উত্থাপন করেছে, জনগণ যদি তাদের নির্বাচিত করেন তবে তারা পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংশোধনের বেলায় তাদের ভিন্নমত গৃহীত হয়েছে বলে মেনে নিতে একমত হয়েছিল।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আমরা দেখা করি। আমরা তিন পর্বে এর বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিই। প্রথমত, এখনো যেসব বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে এমন ১১-১২টি বিষয় নিষ্পত্তির জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দেয়া হয়। স্থানীয় সরকার, কৃষি, সংবিধান—এমন কয়েকটি বিষয় নিয়ে টাস্কফোর্সের কথা বলেছি। বাকি দুই পর্বে জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুপারিশ ছিল। তিন পর্বে করলে সবাই চাচ্ছে এমন সাধারণ কিছু চাহিদার কথা সরকার জানতে পারত। এগুলোকে সংস্কারের স্বীকৃত রূপরেখা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ থাকত। আর যেসব চাওয়া অপ্রচলিত সেগুলোকে জাতীয় আকাঙ্ক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা যেত। সংস্কারের রূপরেখার মধ্যে যা পাওয়া যাবে সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে আগে আলাপ করতে হবে। এ পর্যায়ে সংস্কার পরিষদের নির্বাচনের কথা বলা হয়। সংস্কার পরিষদের অধীনে সংবিধানের সংস্কার করে নতুন সংবিধানের অধীনে নির্বাচন দেয়ার প্রস্তাব আমরা দিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার বা অন্য রাজনৈতিক দল তা বিবেচনায় নেয়নি। তারা যেভাবে করছিল তা নিয়ে আমাদের ভিন্নমত ছিল। তবু সবার মধ্যে একটা সাধারণ বোঝাপড়া থাকুক এটা আমরা সবাই চেয়েছি।

সংস্কার পরিষদ না করে ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হলো। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনা করল এবং সনদের কিছু বিষয়ে তাদের নোট অব ডিসেন্ট রাখল। হলো জুলাই জাতীয় সনদ। এটি স্বাক্ষরও হলো। তবে সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এ নিয়ে আমরা বারবার আলোচনা করতে চেয়েছি। বিষয়টি কোনো পক্ষকেই বোঝানো যায়নি। অনেকটা তাড়াহুড়োর মধ্যেই ঐকমত্য কমিশনের কাজ শেষ হয়।

গণভোট আদেশে এ বিষয়ের কিছুটা ভিন্নতা দেখা দেয়। গণভোটের মধ্যে প্রশ্ন আকারে যে বিষয়গুলো উত্থাপিত হলো তার সঙ্গে জাতীয় সনদের কিছুটা পার্থক্য ছিল। ওই সময় এ নিয়ে কেউই আপত্তি করেনি। শেষ পর্যন্ত গণভোটের দিকেই আমরা এগোলাম। বিএনপির ভিন্নমত ছিল এমন তিনটি প্রশ্নকে গণভোটের সিদ্ধান্তের অধীনে আনা হয়। গণভোট অধ্যাদেশে বলা হয়, যদি হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়, তবে উল্লিখিত তিনটি বিষয় ছাড়া বাকিগুলোয় ভিন্নমত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কার্যকর থাকবে। বিএনপি গণভোটের এ আদেশ মেনে নিয়ে গণভোটের পক্ষে জনগণকে হ্যাঁ দেয়ার জন্য প্রচারণা করে। তাই মনে হয়েছে, বিএনপি তাদের ভিন্নমতে উল্লিখিত তিনটি প্রশ্নকে জনগণের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে এবং জনগণকে সেভাবে ভোট দিতে উদ্ভূত করেছে। কিন্তু ভোট সম্পন্ন হওয়ার পর তারা গণভোটের সেই ফলাফলকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। তাই সংকট প্রলম্বিত হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জুলাই সনদ বা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনাও নেই। এটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য কেমন জটিলতা তৈরি করতে পারে? এটি কি নব্বইয়ের দশকের মতো পরিণতি পেতে পারে?

বর্তমানে বিএনপি তো বটেই, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা করছে না। আমার উপলব্ধি হলো, গণতন্ত্র মঞ্চকে সঙ্গে নেয়ার জন্য বিএনপি ৩১ দফা করতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ তাতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সঙ্গে একটি সংযোগ তৈরি হয়েছিল। বিএনপি বুঝতে পেরেছিল মধ্যবিত্ত ও প্রগতিশীল গোষ্ঠীর মাঝে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে না পারলে তাদের দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের আন্দোলন সফল হবে না। এজন্য গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে তারা ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে। তখন আমরা একটা প্রশ্ন উত্থাপন করি। বলি, আপনাদের সঙ্গে আমরা কোন শর্তে এক জায়গায় যাব? কেবল নির্বাচন আয়োজনই আমাদের জন্য সমাধান নয়। আমাদের দাবি সংবিধানের ভেতরে থাকা সংকট ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা পরিবর্তনের। স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোটাই পাল্টাতে চাই। তখন আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে তারা ৩১ দফা প্রণয়নে রাজি হয়। অভ্যুত্থানের আগে তারা এ বিষয়ে সমন্বয় করেছে। কিন্তু নির্বাচনের পর প্রতীয়মান হচ্ছে, এটিকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা বিশ্বাস হিসেবে এটিকে বিবেচনা করেনি।

অন্যদিকে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নির্দিষ্ট এজেন্ডা ছিল না। ৫ আগস্টের পর তারা এজেন্ডা নির্ধারণ করে। যখন তারা দেখল সিংহভাগ মানুষ এর পক্ষে তখন তারাও রাতারাতি এর পক্ষে অবস্থান নেয়। বিএনপি যতই এটা থেকে সরতে চায় জামায়াতে ইসলামী আঁকড়ে ধরে। মূলত একাত্তরকে পাশ কাটিয়ে চব্বিশকে বড় আকারে সামনে আনার কৌশল তারা নেয়। এনসিপির তরুণ নেতাদের অনেকের মধ্যেও এমন আকাঙ্ক্ষা ছিল। তবে তাদের অনেকে আগেই ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিল বলে সে আদর্শ থেকে সরে গেছে। রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা অধ্যবসায়ের বিষয়টি আর দেখা যাচ্ছে না তাদের মধ্যে। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অব্যক্ত হতাশা তৈরি হচ্ছে। যেমনটা নব্বইয়ের প্রসঙ্গ এল। এবারো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নেতৃত্বদানকারীরা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। মানুষের আকাঙ্ক্ষার মূল্য তাদের কাছে নেই। যতদিন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দায়বদ্ধতার এ বোধ আসবে না, ততদিন রাজনৈতিক জটিলতা দূর হবে না।

গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভবিষ্যতে কী ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে?

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়বে। জনগণের ভোটাধিকারের বাধ্যবাধকতা ভবিষ্যতে যে কেউ গায়ের জোরে অমান্য করার নজির হিসেবে স্থাপনের সুযোগ পাবে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এটা বাজে নজির হিসেবে কাজ করবে। জুলাই জাতীয় সনদ জনগণের সঙ্গে একটি অঙ্গীকার যেটি প্রকাশ্যে সংসদ ভবনের সামনে সম্পাদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। আন্দোলনকারী প্রায় সব রাজনৈতিক দলের গৃহীত একটি দলিল যদি বাস্তবায়ন না হয় তাহলে রাজনৈতিক বিশ্বাস ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সব কিছুই গায়ের জোরে নস্যাৎ করে দেয়ার একটি বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে। ভবিষ্যতে আর কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার বিশ্বাস করার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকবে না। সমাজের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও বিশ্বাস ভেঙে পড়বে, তাতে গণতন্ত্রের বদলে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ভিত্তি স্থাপিত হবে।

জাতীয় স্বার্থে এ মুহূর্তে বিরোধী দলগুলোর রাজনীতিতে কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাওয়া উচিত বলে মনে করেন?

সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়বিচার—এ তিন জিনিসের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের জন্ম। আধিপত্যের বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ বহুবারই দাঁড়িয়েছে। আগ্রাসনবিরোধী স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি জাতির আকাঙ্ক্ষা সবাই করে। তরুণরা কর্মসংস্থান চায়, আর্থিক খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম যেন না হয় এবং এখানে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ হবে—এমন পরিবেশই কাম্য। এ জাতীয় আকাঙ্ক্ষাগুলোকে সংসদ চালু হওয়ার পর থেকেই উপেক্ষা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে। এটা দেশের স্বার্থ পরিপন্থী। এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক দলই আলোচনা করেনি। শুধু একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আলোচনা করেছেন। জাতীয় স্বার্থের বিপক্ষে শেখ হাসিনা সরকার যেভাবে রাজনীতি করত, এখনো সেই ধারাই অব্যাহত আছে। সরকারি ও বিরোধী—দুই পক্ষ মিলেই করছে।

আমার বিবেচনায় এখন মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সংসদে খোলামেলা আলোচনা। এর ভালো-মন্দ বিশ্লেষণ করে জনগণকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এছাড়া দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও জনস্বার্থ বিনষ্টকারী যেসব জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি আছে সেসব চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা করে জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি বাতিল করার দাবিতে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া দেশে মাদক, চাঁদাবাজি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ, জ্বালানি সংকট দূর করার জন্য এবং জ্বালানি খাতে বিশেষ মনোযোগ দেয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংসদে কার্যকর ভূমিকা নেয়া বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব বলে আমি মনে করি।

গোটা পৃথিবীই মনে করছে বাংলাদেশের অর্থনীতি বেকায়দায় রয়েছে। এ বেকায়দা অবস্থায় তারা আইএমএফকে ঋণের জন্য রাজি করাতে পারেনি বলে শেষ পর্যন্ত আইনটি বাতিল হয়। এখানে তাদের প্রবণতা বোঝা দরকার।

অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। কিন্তু তারা বেশকিছু আইন করেছিল। এ আইনগুলোকে আরো শক্তিশালী করার কথা বলে স্থগিত বা বাতিল করে দেয়া হলো। এগুলোকে আরো ভালো বিল হিসেবে সংশোধন করা যেত। বৈষম্য দূরীকরণ বা মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জায়গা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ বিষয়গুলো বুঝতে শুরু করেছে। তাই সামনে এক ধরনের অনিশ্চিত ঝামেলা আসতে পারে বলে মনে হচ্ছে।

বর্তমান সংসদে প্রধান বিরোধী দলের এ পর্যন্ত যে পারফরম্যান্স পরিলক্ষিত হয়েছে, তাতে সরকারের কার্যকর সমালোচনার মাধ্যমে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা কতটুকু সম্ভব হবে বলে মনে করেন?

এইটা বলা ভালো যে, বিরোধী দল সংসদে কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য নিজেরা তেমন কোনো পারদর্শিতা প্রদর্শন করতে পারেনি কিন্তু তার চাইতে বড় সত্য, বিদ্যমান ‘সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি’ অনুযায়ী সংসদে বিরোধী দল যত চৌকস ও যোগ্যতার পরিচয় দিক না কেন, বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা অনুযায়ী এ সংসদে সরকারের বিপরীতে বিরোধী দলের পক্ষে কোনো কিছু অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। সেজন্য সংসদের মাধ্যমে বিরোধী দল কোনো কিছু অর্জন করতে পারবে—এটা আমার মনে হয় না।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে রাষ্ট্রচিন্তা ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন দীর্ঘ লড়াই করেছে। ডিজিটাল স্পেস সম্পর্কিত বিদ্যমান আইনকে কীভাবে দেখছেন?

বাংলাদেশের আইনগুলো অত্যন্ত জটিল ও গণবিরোধী। ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ নতুনভাবে প্রণয়নের সময় পুরনো অনেক গণবিরোধী ধারা বাতিল হয়েছে সত্যি কিন্তু ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মতো অন্য আরো অনেক নিপীড়নমূলক আইন সরকারের হাতে রয়ে গেছে, যা তারা প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবে। এক্ষেত্রে টেলিকমিউনিকেশন আইনের ৯৭ ধারার কথা বলা যেতে পারে যেখানে নাগরিকদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা নির্বিচারে সার্ভিল্যান্সের অধীনে আনতে পারে, ফলে মানুষের মত প্রকাশের যে অধিকার, চিন্তার যে অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার যে অধিকার—সেটা আগের মতোই ক্ষুণ্ন হতে পারে।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন দীর্ঘদিন গণতন্ত্র মঞ্চে সক্রিয় ছিল। অভ্যুত্থানের পর মঞ্চের কার্যক্রমে বেশ ছন্দপতন দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই ভেঙে গেল। সেটা কেন হলো? তাছাড়া জোট সম্প্রসারণের মাধ্যমে গণতন্ত্র মঞ্চ এক জোটে থেকে নির্বাচন করলে বিরোধী রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলত কি?

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন দীর্ঘদিন গণতন্ত্র মঞ্চে সক্রিয় ছিল। কিন্তু প্রায় শুরু থেকেই গণতন্ত্র মঞ্চে রাষ্ট্র সংস্কার একটা প্রবণতা মোকাবেলা করেই সক্রিয় ছিল। আমাদের দিক থেকে আমরা গণতন্ত্র মঞ্চকে স্বাধীন, স্বতন্ত্র এবং সংস্কারের রাজনীতির মুখপাত্র হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছিলাম। কিন্তু মঞ্চের কিছু শরিক সংগঠন মঞ্চের স্বতন্ত্র সক্রিয়তার চাইতে বিএনপির রাজনৈতিক স্বার্থে অধিকতর মনোনিবেশ করার পক্ষে ছিলেন। ২৪-এর নির্বাচনের পর আমরা গণতন্ত্র মঞ্চকে একটি স্বতন্ত্র নির্বাচনী মঞ্চে রূপান্তরের প্রস্তাব করি, কিন্তু আমরা সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হইনি। অভ্যুত্থানের পর মঞ্চের মধ্যে এ বিরোধ আরো তীব্র হয়। আমরা মঞ্চসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল নিয়ে একটি স্বতন্ত্র জোট করার উদ্যোগ নিই, কিন্তু সে চেষ্টাও ব্যর্থ করে দেয়া হয়। মঞ্চ অনেকাংশে নিষ্প্রভ এবং অকার্যকর হয়ে ওঠে। এ বিরোধ সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয় বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য গড়ে তোলার প্রশ্ন সামনে আসার পর। আমাদের দলের দিক থেকে আমরা সুস্পষ্টভাবে বিএনপির সঙ্গে আসনভিত্তিক সমঝোতার আগে রাজনৈতিক সমঝোতার নিশ্চয়তা চাই আর অন্য শরিক সংগঠনগুলো আসনের ভিত্তিতে সমঝোতা করে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন করার পক্ষে অবস্থান নেয়। আমরা রাজনীতি বিসর্জন দিয়ে আসনভিত্তিক সমঝোতা করতে রাজি হইনি। তবে ভাগ-বাটোয়ারার সময় শরিকদের ক্ষতি না হয়, সে বিবেচনায় কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই আমরা মঞ্চ ত্যাগ করি।

আমি বিশ্বাস করি, গণতন্ত্র মঞ্চ যদি নিজেদের আরো বিস্তৃত করে স্বাধীন স্বতন্ত্র নির্বাচনী জোট হিসেবে নির্বাচন করত, তাহলে সংসদে আশানুরূপ ফলাফল না পেলেও মাঠের রাজনীতিতে আজ তারা সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করত এবং বাংলাদেশের রাজনীতি একটি গুণগত পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যেতে পারত।

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি সাম্প্রতিক রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত বিষয়। এ চুক্তি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? আবার চীনের সঙ্গেও সম্পর্কের উন্নয়ন হচ্ছে। এ সমীকরণ কীভাবে দেখছেন?

বর্তমান বিশ্ব অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে একটি জটিল এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং এ পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে উঠতে পারে। সেজন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির নামে যে চুক্তি হয়েছে সেটা নিয়ে ব্যাপক পরিসরে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা প্রয়োজন এবং এ চুক্তি আমাদের অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য কতটা লাভজনক আর কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা নির্মমভাবে বিশ্লেষণ করে সব দেশপ্রেমিক শক্তির সঙ্গে যতটা সম্ভব সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। তা না হলে এ চুক্তি এবং চুক্তিজনিত অবিশ্বাস জাতিকে ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন আমাদের জন্য ইতিবাচক এবং একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের স্বার্থে সবার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানোর চেষ্টা করাই আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

বিভিন্ন বন্দর লিজের বিষয়টি কিছুদিন পর পরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। বিদেশী কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, তা বাংলাদেশের জন্য খুব একটা লাভজনক নয়। বন্দর পরিচালনায় কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সুষ্ঠু, দুর্নীতিমুক্ত ও কার্যকরী পরিবেশ কেন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না? এবং বন্দর লিজের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী ফলাফল কী হতে পারে?

আমি আগের প্রশ্নের উত্তরে বলেছি, বিশ্ব ক্রমে আগের ছকের বাইরে গিয়ে অনির্ধারিতভাবে বিপজ্জনক পথে ধাবিত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় বন্দর কেবল একটি অর্থনৈতিক কিংবা বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেটাকে কাজে লাগিয়ে এসব প্রশ্নের ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা উচিত। সেটা না করে সরকার যখন এককভাবে ঢাকঢাক গুড়গুড় পদ্ধতিতে এসব স্পর্শকাতর চুক্তি সম্পন্ন করে, তখন সরকারের বাইরে যারা আছেন তাদের মধ্যে এক ধরনের সন্দেহ, অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তা বোধ তৈরি হয়। সরকারের উচিত এ পরিবেশ দ্রুত দূর করার উদ্যোগ নেয়া এবং জাতীয় স্বার্থে বন্দর ব্যবহারে জাতীয় নীতিমালা তৈরি করা।

আপনি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রকে সংস্কারের মাধ্যমে একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য সংগ্রাম করছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলও এটিকে তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।

যারা দেশকে ভালোবাসেন এবং এ রাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আছেন তাদের প্রায় সবাই রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একমত। এটি কেবল আমি কিংবা আমাদের দলের একক কোনো প্রচেষ্টা নয়। আমরা বিশ্বাস করি, যারা নিজেদের ও দেশের ভবিষ্যৎকে এক সূত্রে গ্রথিত করে দেখেন, তারা প্রত্যেকেই এ রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য ভেতর থেকে একমত আছেন। তবে বিভিন্ন দলের নেতৃত্ব অনেক সময় তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে এ আকাঙ্ক্ষাগুলোকে উপেক্ষা করে তাদের নিজেদের স্বার্থে পুরনো ব্যবস্থাকে বিভিন্ন কায়দায় পুনর্বহালের চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ অচিরেই এ সংকট থেকে বের হয়ে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমরা মনে করি রাষ্ট্র, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ, যে আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য চব্বিশে জনগণ অকাতরে জীবন দিয়েছে সেই বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই দৃশ্যমান হবে।