অনেক বছর বিরতির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ছাত্র সংসদের আইন আছে, এমন দুটো প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এখনো এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা যায়নি। আরো যে অর্ধশতাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেগুলোয় ছাত্র সংসদ গঠনের আইন নেই বিধায় নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তবে এমন বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ছাত্র সংসদের দাবি জানিয়ে তৎপরতা দেখিয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা গেছে।
সব গণতন্ত্রমনা মানুষ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগকে স্বাগত জানায় এবং এর সর্বাঙ্গীণ সফলতা কামনা করে। এরই মধ্যে দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন পুরোদমে। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বেশকিছু নিয়মবিধিও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যেমন যেখানে-সেখানে পোস্টার না লাগানো, শব্দদূষণের বিবেচনায় প্রচারযন্ত্র ব্যবহারে শৃঙ্খলা রক্ষা, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে প্রার্থীদের প্রচারপত্র বিলি করা, প্রতিপক্ষ প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অশালীন উক্তি, কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেয়া বা মন্তব্য থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে যে দুয়েকটি ছোটখাটো ব্যতিক্রম ছাড়া প্রার্থীরা এসব নিয়মবিধি অনুসরণ করে যার যার প্রচার-প্রচারণা ভালোভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচন পরিচালনা কর্তৃপক্ষ এজন্য বিশেষ প্রশংসা পেতে পারে। এসব কিছু ঠিক আছে। কিন্তু সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা কাকে ভোট দেবেন তা ঠিক করবেন কীভাবে? তাদের কাছে অন্তত কিছু কার্যকর সুযোগ থাকতে হবে প্রার্থীর সামগ্রিক যোগ্যতা যাচাইয়ের। অতীতে এ দেশেরই একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রচলিত এমনই একটি উদ্ভাবনী ব্যবস্থার কথা তুলে ধরা এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ভোটাররা প্রার্থী নির্বাচন করবেন কীসের ভিত্তিতে। এ লক্ষ্যে দেখা যাচ্ছে, প্রার্থীরা যার যার দলীয় ঘোষণাপত্র, প্রার্থী পরিচিতি ও নিজ নিজ যোগ্যতা ভোটারদের কাছে সশরীরে গিয়ে তুলে ধরছেন এবং ভোট প্রার্থনা করছেন। এখন থেকে ৬০ বছর আগে ১৯৬৫-৬৬ সেশনে বাকৃবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক পদে নির্বাচনকালে যখন প্রত্যেক ভোটারের কাছে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছিলাম, তখন প্রথম শুনেছিলাম সেই বিখ্যাত উক্তি যে ‘প্রার্থীর পায়ে লক্ষ্মী, যত হাঁটা, তত ভোট’। এবারো নিশ্চয়ই প্রার্থীরা এর ব্যতিক্রম করছেন না। বারবার ভোটারের কাছে গিয়ে মূল্যবান ভোটের জন্য অনুরোধ করছেন। এসবই সংগত, ঠিক আছে। কিন্তু সশরীরে সাক্ষাৎ বা ব্যক্তিগত উপস্থাপনাই কি যথেষ্ট পাবলিক ফোরামে প্রতিপক্ষের ঘোষণা ও অভিব্যক্তির বিপরীতে প্রার্থীর ধীশক্তি, বুদ্ধিমত্তা, বাগ্মিতা, শব্দচয়ন ও বাচনভঙ্গি, ঘোষিত লক্ষ্যগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচির মাধ্যমে উপস্থাপনযোগ্যতা (আরটিকুলেশন) ইত্যাদি জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটা জানার উপায় কী?
এ পরিপ্রেক্ষিতেই তুলে ধরছি ছয় দশক আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ইপাকসু) নির্বাচনে প্রচলিত প্রার্থীদের প্রজেকশন বিতর্কের কথা। একেবারে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী ডিবেটের আদলে। তৎকালীন প্রশাসনিক ভবনের (বর্তমানে করিম ভবন) সামনে দুই দলের ভিপি প্রার্থীরা মুখোমুখি দুটি ডায়াসে দাঁড়াতেন। মাঝখানে একজন থাকতেন মডারেটর বা সভাপতি। সাধারণত ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা সভাপতিত্ব করতেন। প্রথম দিকে একজন আমেরিকান অ্যাডভাইজারও মডারেটর হতেন। প্রথম রাউন্ডে প্রত্যেক প্রার্থী যার যার নির্বাচনী এজেন্ডা ও বক্তব্য তুলে ধরতেন। দ্বিতীয় রাউন্ডে হতো একে অপরের উত্থাপিত পয়েন্টের ওপর প্রশ্ন ও প্রতিপ্রশ্ন (ক্রস আর্গুমেন্ট)। এই পাবলিক পরিচিতি পর্বটি এতটাই প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য হয়ে উঠত যে ভোটার ছাত্র (তখন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী ভর্তি করা হতো না) ভোটাররা অন্তত সামনাসামনি প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও মেধার উৎকর্ষ কার কতখানি তা জানা বোঝা ও বিচার-বিশ্লেষণ করার একটা সুযোগ পেতেন। আমি দেখেছি, কোনো ভোটার হয়তো একজনকে ভোট দেবেন বলে মন স্থির করেছিলেন। কিন্তু প্রজেকশন সভায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বক্তব্য, তার ঘোষিত অঙ্গীকারের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন, স্পস্টায়ন বা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পয়েন্ট খণ্ডনের যথার্থতা শুনে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। এটাই হচ্ছে প্রজেকশন সভার সৌন্দর্য।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু বর্তমানে ছাত্ররাজনীতিকে আরো গঠনমূলক ও সৃষ্টিধর্মী করে গড়ে তুলতে চাচ্ছে, এটাই উপযুক্ত সময় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এ ধরনের প্রজেকশন সভা আয়োজন করার। আমার ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও এটা পছন্দ করবে। ব্যক্তিগতভাবে এটা দেখেছি বলে আমার ধারণা হয়েছে, এমন একটি ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচনে চালু হোক। প্রজেকশন সভার মাধ্যমে মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায়, যে প্রার্থী যাই অঙ্গীকার করুক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সম্পদ, বাজেট এবং এক বছরের কার্যকালে কি করা সম্ভব আর কি করা সম্ভব নয়—সে সম্পর্কে ভোটাররা একটা সম্যক ধারণা পেতে পারেন এবং তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিতে পারেন। যেহেতু এ পদ্ধতিতে অধিকতর যোগ্য ও দায়িত্বশীল ছাত্র প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে আসবেন বলে আশা করা যায়, সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা সংস্কারেও এটা প্রভূত উপকারে আসতে পারে।
এমএ সাত্তার মন্ডল: ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়










