দক্ষিণ এশিয়ার দেশ আফগানিস্তান। দেশটি ভূমিকম্পপ্রবণ। এটি এমন একাধিক ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত, যেখানে ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেট মিলিত হয়েছে। ২০২২ সালে ৫ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত এক হাজার মানুষ নিহত এবং তিন হাজারের বেশি আহত হয়েছিল। ওই ভূমিকম্পটি আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে আঘাত হেনেছিল। দুই দশকে এটিই ছিল দেশটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পজনিত দুর্যোগ। যদিও সে ভূমিকম্পটি ছিল মাঝারি মাত্রার। কিন্তু ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে, কারণ এর কেন্দ্র ছিল অগভীর, মাত্র ১০ কিলোমিটার বা ছয় মাইল গভীরে। এর পরের বছর দেশটিতে ৬ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। তালেবান সরকারের তথ্যমতে, প্রায় চার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। যদিও জাতিসংঘের তথ্যমতে, নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০।
গত রোববারও আফগানিস্তানে ভয়াবহ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল অগভীর, অর্থাৎ মাত্র আট কিলোমিটার বা পাঁচ মাইল। এ ভূমিকম্পে এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। হতাহতের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আফগানিস্তানের এ ভূমিকম্পে বহু মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা বিশ্বব্যাপী হৃদয়বিদারক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কাদা ও কাঠের ঘরবাড়ি ধসে অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে, আহত হয়েছে অসংখ্য মানুষ, বাস্তুহারা হয়েছে হাজার হাজার পরিবার।
এ মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে বাংলাদেশের উচিত আফগানিস্তানের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। দেশটির দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো নৈতিক, মানবিক ও বৈশ্বিক দায়িত্বও বটে। অতীতেও বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দুর্যোগে ত্রাণ ও সহায়তা পাঠিয়েছে। এবারো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ সহায়তার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্প্রদায় দেশটির পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আফগানিস্তানে অবস্থিত জাতিসংঘ মিশন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তান মানবিক ও ত্রাণসহায়তা দিতে প্রস্তুতি নিয়েছে। বাংলাদেশেরও জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণসহায়তা পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ খাবার পানি ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছার উদ্যোগও নেয়া প্রয়োজন। এজন্য চিকিৎসক, নার্স ও প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীর সমন্বয়ে একটি বিশেষ টিম গঠন করা যেতে পারে।
আফগানিস্তানের এ ভূমিকম্প বাংলাদেশের জন্যও বড় সতর্কবার্তা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বেশকিছু হালকা ও মাঝারি ধরনের ভূকম্পন এ ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে অদূরভবিষ্যতে বাংলাদেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। তাই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বিশেষজ্ঞরা এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। অথচ সম্ভাব্য ভয়াবহ ভূমিকম্প মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রস্তুতির অভাব আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। বস্তুত ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ, যার পূর্বাভাস পাওয়া যায় না। এজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
ভূমিকম্প নিয়ে বাংলাদেশের উদাসীনতার সুযোগ নেই। প্রস্তুতিহীনতা যে কী ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা আমরা এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রত্যক্ষ করেছি। আফগানিস্তানে ভূমিকম্প-পরবর্তী মৃতের সারি ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। সম্প্রতি মিয়ানমার, তুরস্ক ও নেপালে বড় মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক। এমন পরিস্থিতিতে আলোচনায় আসছে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহরের তালিকায় থাকা ঢাকার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে। আর্থ অবজারভেটরি সেন্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা এ তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। ফলে এখানে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। তাই এখনই সময় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের। ভবন নির্মাণে কড়াকড়ি, জনসচেতনতা, উদ্ধার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রস্তুতি এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয় গড়ে তোলার মাধ্যমে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করতে হবে। অন্যথায় একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প যে বিপর্যয় নিয়ে আসবে, তা মোকাবেলা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট, ময়মনসিংহ এবং রংপুর, ঢাকা, কুমিল্লা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিছু অংশ। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের চারটি জেলা বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। একইভাবে ময়মনসিংহ বিভাগের পাঁচটি জেলাও ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নরসিংদী জেলার অংশবিশেষ, পুরো কিশোরগঞ্জ জেলা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে আছে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলার উত্তরাংশ।
গত বছর ‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট: রাজউক অংশ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকার ৪০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যমতে, বাংলাদেশ ভূকম্পনের সক্রিয় এলাকায় অবস্থিত। দুর্যোগ সূচক অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের মধ্যে রয়েছে ঢাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ছোটখাটো কম্পন দেশে আরো শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কাকে নির্দেশ করছে।
মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় না। তবে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্প বিপজ্জনক মাত্রা ছাড়ালেই বিশেষজ্ঞরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বিপর্যয়ের মাত্রা ভয়াবহ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। গত কয়েক দশকে ঢাকার সম্প্রসারণ দ্রুত ও অপরিকল্পিতভাবে হয়েছে। ঢাকার পুরনো অংশটি শক্তিশালী গঠনের মাটির ওপর গড়ে উঠেছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে বর্ধিত হওয়া অংশে মাটির গঠন দুর্বল। এসব এলাকার বড় অংশই মূলত ভরাট হওয়া জলাভূমির ওপর গড়ে উঠেছে। রিখটার স্কেলে ৭ বা এর চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে এসব এলাকায় বড় ধরনের প্রাণ ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি যথাযথভাবে পাইলিংয়ের মাধ্যমে নির্মিত ভবনগুলোও এ বিপর্যয়ের আওতামুক্ত নয়।
ঢাকার ভবনগুলো সম্পর্কে এ ধরনের আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই বলা হচ্ছে। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত লক্ষণীয় নয়। এ ধরনের উদাসীন মনোভাবের ফল ব্যাপক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে পেতে হবে কিনা এমন দুশ্চিন্তা সচেতন নাগরিকদের মনে ফুটে ওঠে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই জীবন অতিক্রম এবং বড় ভূমিকম্প না হওয়ায় বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পায় না। এভাবেই প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক, সবার মধ্যেই উদাসীনতা কাজ করায় ভূমিকম্প প্রতিরোধী স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। এসবের উদাহরণই মিলছে নানা দুর্ঘটনায় স্থাপনার দুর্বলতা প্রকাশের মাধ্যমে।
দুঃখজনক হলেও সত্য দীর্ঘ সময় ধরে হালকা মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হলেও আমাদের প্রতিক্রিয়া বরাবরই ছিল ন্যূনতম। অপরিকল্পিত ঘনবসতি এবং বিল্ডিং কোডের দুর্বল প্রয়োগ ঢাকাকে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। শহরটির ভূপ্রাকৃতিক অবস্থান, মানুষের বসবাসের ঘনত্ব ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এ ঝুঁকিকে আরো প্রকট করে তুলেছে। এ ভয়াবহ সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের আর কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। এখনই প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ, সচেতনতা বৃদ্ধি, ভবন নির্মাণে কঠোর তদারকি এবং দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার ও পুনর্বাসনে সুসংহত পরিকল্পনা।
আফগানিস্তানে দুর্গতদের জরুরি সহায়তা পাঠানোর পাশাপাশি সরকারকে ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। তাৎক্ষণিক যেসব পদক্ষেপ নেয়া জরুরি, তার মধ্যে রয়েছে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া, শিশুদের জন্য দুর্যোগ শিক্ষার ব্যবস্থা, স্বেচ্ছাসেবক প্রশিক্ষণ এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনা।










