কিন্তু তাদের স্বাস্থ্য নানা ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বণিক বার্তার সাম্প্রতিক সরজমিনভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, অনেক থানার ব্যারাক ও অস্থায়ী আবাসনের চারপাশে ঝোপঝাড়, জমে থাকা পানি এবং তীব্র মশার উপদ্রব। কোথাও ছোট ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে, কোথাও পর্যাপ্ত পানি বা স্যানিটেশনেরও ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা শেষে বিশ্রাম নেয়ার মতো পরিবেশও তাদের অনেকের নেই। কাজেই এমন পরিবেশে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে হতাশারও উদ্রেক ঘটায়।
রাষ্ট্রের নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব যারা পালন করেন, স্বাস্থ্যকর ও পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধার অভাবে তাদের একাংশ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এতে কেবল তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন, তা নয়। নানা রকম জনসেবাও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমনিতেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ে নিরপরাধী অনেক পুলিশ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। যেগুলোর জের ধরে পরবর্তী সময়ে তাদের কার্যক্রমের গতি তুলনামূলক শ্লথ হতে দেখা যায়। তাদের মানসিক অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ জননিরাপত্তা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার কৌশল কেবল উন্নত অস্ত্র, প্রযুক্তি বা প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভর করে না; আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুস্থতার ওপরও নির্ভর করে। তাই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর আবাসন কেবল মৌলিক চাহিদা নয়, বরং একই সঙ্গে কার্যকর আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার অংশও বটে। সুতরাং সরকারকে অবশ্যই মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। এক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে তাদের পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যকর আবাসন সুবিধার আওতায় আনতে হবে।
দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ক্রমেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গুর মৌসুম তথা বর্ষাকালও চলছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে তাদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে হবে। এর অংশ হিসেবে শুধু মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা বা কীটনাশক ছিটানোই যথেষ্ট নয়। বিস্তৃত কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। যেমন যেসব পুলিশ ব্যারাক ও অস্থায়ী আবাসনে পুলিশরা বসবাস করছেন, সেগুলোর চারপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন, প্রয়োজনীয় মশারি ও অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করাও জরুরি। ডেঙ্গু আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় বিশ্রামের ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপরও পড়বে।
তবে এ সাময়িক স্বাস্থ্যঝুঁকির বাইরেও তারা স্ক্যাবিস বা অন্যান্য ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন। আর এ সতর্কতার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত তথা আবাসন সংকট। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ বাহিনীর মোট সদস্যের তুলনায় সরকারি আবাসন সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। ফলে বিপুলসংখ্যক সদস্যকে অস্থায়ী বা অপর্যাপ্ত আবাসনে থাকতে হয়। এ বাস্তবতা পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে পরিকল্পিত বিনিয়োগও প্রয়োজন। পুরনো ব্যারাকগুলো পর্যায়ক্রমে সংস্কার, ধারণক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন ব্যারাক ও আবাসন নির্মাণ, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানির সংযোগ এবং পর্যাপ্ত খোলা পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যেসব থানা এখনো ভাড়া করা ভবন বা অনুপযুক্ত স্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর জন্যও পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে পুলিশের কল্যাণকে ব্যয় নয়, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায় বিনিয়োগ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একজন পুলিশ সদস্য যদি পর্যাপ্ত বিশ্রাম, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ন্যূনতম জীবনযাত্রার সুযোগ পান, তাহলে তার পেশাগত দক্ষতা, মানসিক স্থিতি এবং জনসেবার মান—সবই উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দীর্ঘদিন বসবাস করলে অসুস্থতা, মানসিক অবসাদ এবং কর্মস্পৃহা কমতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর পড়বে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু আধুনিক সরঞ্জাম বা প্রযুক্তি সংযোজনই যথেষ্ট নয়; যারা সেই কাঠামো সচল রাখেন, তাদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত করা আবশ্যক। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সেই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। তাই এ সংকটকে মৌসুমি সমস্যা হিসেবে না দেখে, পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্য, কর্মপরিবেশ ও আবাসনকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। তাছাড়া যারা প্রতিদিন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে থাকেন, তাদের নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বেরই অংশ।
বিশ্বের অনেক দেশেই পুলিশের জন্য আবাসন সুবিধা নেই। আবার অনেক দেশে আছে। তবে উন্নত সব দেশই পুলিশ সদস্যদের আবাসন ও কল্যাণ সুবিধাকে আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার সক্ষমতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। সেসব দেশ পুলিশ সদস্যদের জন্য, বিশেষত তাদের কর্মরত স্থানের আশপাশে উন্নত বিশ্রামাগার, প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও মানসিক সেবা নিশ্চিত করেছে। সুতরাং আবাসন সুবিধার পাশাপাশি পুলিশদের দায়িত্বরত স্থানেও তাদের সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন পুলিশ বক্সে পর্যাপ্ত জায়গা, আশপাশে মানসম্মত শৌচাগার আছে কিনা এসব বিষয়ে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে।










