বদরুদ্দীন উমরকে বলা যায় আওয়ামী-ভারতীয় মতাদর্শের অ্যান্টিথিসিস। এ প্রস্তাবের পক্ষে দুটি প্রমাণ দেব। প্রথম প্রমাণ, উমরের গণ-অভ্যুত্থান তত্ত্বই কামিয়াব হলো জুলাই অভ্যুত্থানে। উমর বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় গণ-অভ্যুত্থানে গণবিরোধীদের পরাস্ত না করে কোনো নির্বাচন সুফল দেবে না। প্রমাণ ১৯৬৯ ও ১৯৯১। প্রতিবিপ্লবী ১/১১-এর পরের নির্বাচনে ফ্যাসিবাদের পত্তন হয়েছিল, গণতন্ত্র না (দেখুন: ফারুক ওয়াসিফ/জরুরি অবস্থার আমলনামা: বাংলাদেশের সিভিকো মিলিটারি করপোরেট গণতন্ত্র, ২০০৯)
বিএনপি যে ২০১৪ ও ২০২৪-এর ভোট বর্জন করেছিল, সেটাও ওই লাইনেরই চিন্তা। কিন্তু উমর আরো এগিয়ে বলেছিলেন, কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকার বানালেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। এটা তার ‘নির্বাচন না গণঅভ্যুত্থান’ বইয়ে বিস্তারিত আছে।
আর দ্বিতীয় প্রমাণ, আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিবাদ হিসেবে প্রথম উমরই চিহ্নিত করেন ও সেই চোখেই তিনি গত ১৭ বছর লিখে গেছেন। আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদের খণ্ডন উমর করে গেছেন সারা জীবনের কাজে। ভাষা আন্দোলনের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবকে বসানো যায়নি উমরের অকাট্য গবেষণা পুস্তক ও লেখালেখির জন্য। আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদ যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অধীন সেটাও তিনি মনে করতেন। দেশভাগের দায় যে মুসলমানদের না, বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বইয়ে তা দেখান জয়া চ্যাটার্জিদেরও অনেক আগে।
৭ মার্চ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, ২৫ মার্চে মুজিব আত্মসমর্পণ করেছেন, আওয়ামী লীগের বড় অংশই মুক্তিযুদ্ধে অনুপস্থিত, আওয়ামী লীগ ভারতীয় আধিপত্যবাদের বাহন—এসব উমর ১৯৭২ সাল থেকেই বলে আসছেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদ=বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদ=বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ—এ সমীকরণ উমর ১৯৭২ সালেই লিখে দেখিয়ে দিয়েছেন। ভারতকে মোকাবেলা না করে বাংলাদেশ যে এগোতে পারবে না, এ ব্যাপারে উমর কট্টর ছিলেন। উমর মনে করেন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নেই, তবে তার ভাষায় ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা আছে।
২০২৪-এর জুলাইয়ের আন্দোলন যে গণ-অভ্যুত্থান ও এটা যে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান কেন উপমহাদেশের সব গণ-অভ্যুত্থানের চেয়ে বড় ঐতিহাসিক ঘটনা, এ জ্ঞান তিনিই প্রথম বণিক বার্তার আনিকা মাহজাবিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন ২৮ জুলাই, প্রকাশ ২৯ জুলাই। এরপর ৩ আগস্টেও আমাকে দেয়া সমকালের সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার পরিণতি নিয়ে যা বলেন, তা দুদিন পরে সঠিক প্রমাণিত হয়।
আজকের তরুণেরা উমরের বইগুলোর মধ্যে পড়তে পারেন নিচের বইগুলো। সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাস বোঝার প্রাথমিক বোধ এ বইগুলো গড়ে দেয়।
যুদ্ধপূর্ব বাঙলাদেশ, যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ, বাঙলাদেশের সমাজ বিকাশের ধারা
সাম্প্রদায়িকতা, সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা, সংস্কৃতির সংকট
বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও তৎকালীন সমাজ
ভারত প্রসঙ্গে, নির্বাচন না গণঅভ্যুত্থান, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস
এ আজীবন বিপ্লবী, সাহসী ও নিরাপস মানুষটিকে আবারো বিপ্লবী সালাম জানাই।
ফারুক ওয়াসিফ: মহাপরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)










