২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। এক্ষেত্রে অর্থনীতিতে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা আনয়ন এবং রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ আসন্ন বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। বস্তুত এমন এক সময়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে, যখন অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করাকে প্রাধান্য দিয়ে বাজেট তৈরি করা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) বাজেটে মোটা দাগে বেশকিছু বিষয় প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যে কারণে এ বাজেটের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, আসন্ন বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের সংস্থান এবং মূল্যস্ফীতির এ সময়ে সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছে বিআইডিএস। এছাড়া ঘোষিত বাজেটে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা অর্জনের পদক্ষেপ নেই বলেও পর্যবেক্ষণ করেছে সংস্থাটি।
বর্তমান সময়ে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরাই মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা বাস্তবতাবিবর্জিত বলেই অর্থনীতিবিদরা মন্তব্য করছেন। এছাড়া রাজস্ব সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি বাস্তবায়নও চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে চলতি অর্থবছর বাজেটের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করা না গেলেও আগামী বাজেটে একই ধরনের প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে মূল্যস্ফীতির পেছনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব দেখানো হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশই সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে এটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ শতাংশ পিছিয়ে আছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ পরিস্থিতিতে চলতি বছরের তুলনায় আগামী বাজেটে ৩৭ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির টার্গেটকে অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে।
আসন্ন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ কোটি টাকা। বিশাল আকারের এ রাজস্ব সংগ্রহ করা সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এছাড়া বিশ্বে বিভিন্ন সংকটের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া চাপের মধ্যে রয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন সংস্থান করতে ব্যাংকনির্ভরতা কমানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে বিআইডিএসের পক্ষ থেকে। কেননা এর ফলে উদ্যোক্তারা ঋণ সংকটে ভুগবে। এর চেয়ে কম সুদে বিদেশী ঋণ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টিও এ বাজেটে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। প্রয়োজনে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ আংশিক কমিয়ে এবং অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি হ্রাস করে এ খাতে বরাদ্দ দেয়ার বিষয়ে জোর দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে রফতানি কিংবা রেমিট্যান্সে ভর্তুকি না দিয়ে কৃষি এবং খাদ্যে দেয়া যায়। এছাড়া এক্সচেঞ্জ রেট আটকে রাখলে এটা আরো বাড়বে। বর্তমানে যেহেতু সংকট চলছে, এ সময়ে রিজার্ভ ডলারের মূল্য ধরে না রাখাটাই বিচক্ষণতার পরিচয় হবে।
অন্যদিকে কর আহরণে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিন) থাকলেই ২ হাজার টাকা আদায় নৈতিকতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেছে বিআইডিএস। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের দু-আড়াই কোটি মানুষ কর দিতে সক্ষম। কিন্তু কর অনাদায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে কর আদায়ের বিষয়ে জোর দেয়া প্রয়োজন বলে অর্থনীতিবিদরা মত দিচ্ছেন।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য দিকনির্দেশনা প্রয়োজন থাকলেও এ বাজেটে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। এছাড়া কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ায় কৃষির ওপর সর্বাধিক জোর প্রদানের বিষয়েও বাজেটে গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল। কেননা কৃষি খাতে পণ্যবাজার ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল। তাছাড়া প্রথম অর্ধবছরে খরা হওয়ায় পরবর্তী অর্ধবছরে বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা আমন ধানের উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা অবলম্বনের বিকল্প নেই।
২০৩০ সালে এসডিজি অর্জন, ২০৩১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রে পৌঁছতে দেশের অর্থনীতির আকার স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। এজন্য দেশের বাজেটের আকারও বাড়ছে। কিন্তু এ বাজেট কতটা বাস্তবায়নযোগ্য তা নিয়ে ভাববার অবকাশ রয়েছে। সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ, লেনদেনের ভারসাম্য পরিস্থিতি উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, রিজার্ভ বাড়ানো, অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ এবং জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি বাজেট বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। বর্তমানে ডলার সংকট ও বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগ, আমদানি, রফতানি, রেমিট্যান্স, রিজার্ভ সবকিছুর গতি নিম্নমুখী হলেও মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সার্বিকভাবে বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আর্থিক সুশাসন, যথাযথ মনিটরিং, বিনিয়োগ ও উৎপাদনের পরিমাণ আরো বাড়ানো দরকার। এর মাধ্যমে বাণিজ্যবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কার্যকর করে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় করা জরুরি। এজন্য মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে সুসমন্বয় বজায় রাখতে হবে।
বাণিজ্য ঘাটতি ও চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ঘাটতি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ শুল্ক বসিয়ে আমদানি নিরুৎসাহিত করে রফতানি বাড়ানোর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পরার্মশ দিয়েছে বিআইডিএস। এর মধ্য দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য রাজস্ব সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এনবিআরের পরিষেবা বাড়ানো, ভ্যাট আইন ২০১২ বাস্তবায়ন, সম্পত্তি করের প্রয়োগ ও এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। উল্লেখ্য, জিডিপির তুলনায় কর আহরণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রায় সর্বনিম্নে। এজন্য অর্থমন্ত্রীকে বাজেটে বারবার কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানোর কথা বলতে হয়েছে। যে কারণে রাজস্ব বাড়িয়ে বাজেট বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন অর্থবছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। এক্ষেত্রে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে—সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।










