যেকোনো দেশের কর কাঠামো সে দেশের ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। করপোরেট কর, লেনদেন কর (টার্নওভার ট্যাক্স), ভ্যাট, শুল্ক প্রভৃতির হার ন্যায্য হলে তা সহায়ক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে অযৌক্তিক করহার ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। উচ্চ করহারের কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়। এতে স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায়। ব্যবসায়ীদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়। দুঃখজনকভাবে দেশের কর কাঠামো দ্বিতীয় পরিস্থিতির প্রতিনিধিত্ব করে। কেবল কর কাঠামোই নয়, কর বা রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনাও দুর্বল। কর ফাঁকি, কর অব্যাহতি, রাজস্ব আহরণে দুর্নীতি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো অর্থবছরেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় রাজস্ব আহরণ হয় না। ফলে বাজেটের একটি বড় অংশ বাস্তবায়নে নির্ভর করতে হয় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনেও দেশের কর কাঠামো ও রাজস্ব আহরণের এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন করপোরেট করহার অন্যায্য। কর কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ব্যবসার ক্ষেত্রে অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে ৭২ শতাংশ ব্যবসায়ী। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বর্তমান চেয়ারম্যান কর কাঠামোয় বিদ্যমান ন্যূনতম করহার ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। তিনি ন্যূনতম করকে কালাকানুন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি এ কর তুলে দিলে রাজস্ব আহরণে প্রভাব পড়ার কথা জানিয়েছেন। যদিও সিপিডির গবেষণা জানাচ্ছে, দেশের ভ্যাট অব্যাহতির সুযোগ ও কর ফাঁকির কারণে এনবিআর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আহরণ করেছে। এ তথ্য অদক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে নির্দেশ করেছে। পৃথিবীর উন্নত দেশে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধিতে সর্বদা প্রত্যক্ষ করের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়। অথচ দেশে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর প্রয়োজন হলে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ বা বাণিজ্যিক কর বাড়ানোর প্রবণতা সর্বদা পরিলিক্ষিত হয়েছে। কিন্তু ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হলে যৌক্তিক করহার নির্ধারণ করা আবশ্যক। ধাপে ধাপে করপোরেট কর হার কমিয়ে আনা যায় এবং ব্যবসার মুনাফার ওপর সহনীয় মাত্রায় করহার নির্ধারণ করতে হবে। লাভ-লোকসান বিবেচনা না করে কেবল বিক্রীত পণ্যের ওপর কর আরোপ (টার্নওভার ট্যাক্স) সমীচীন নয়। তবে পৃথিবীর প্রায় সবদেশে স্বল্পমাত্রায় হলেও করপোরেট কর হার প্রযোজ্য, যা রাজস্ব আয়ে অবদান রাখে। অন্যদিকে, দেশে ব্যবসা-বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নত হলে কর্মসংস্থান বাড়বে। শ্রমজীবী মানুষের মজুরি বাড়বে। এতে করযোগ্য ব্যক্তির সংখ্যা বাড়লে রাজস্ব আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধিতে প্রয়োজন ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা। যেকোনো করহার যৌক্তিক ও নিম্ন এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সহনীয় পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন। ভ্যাট ও কর অব্যাহতির বিষয়গুলো আরো পর্যালোচনা করে পুনর্নির্ধারণ করা দরকার। সিপিডির তথ্য জানাচ্ছে, দেশের ভ্যাট আইন অনুযায়ী স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ করা হলেও বর্তমানে অনেক পণ্য ও সেবায় অব্যাহতি রয়েছে। বর্তমানে ভ্যাটের কার্যকর গড়হার ১১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সুতরাং ভ্যাটসহ অন্যান্য কর যৌক্তিক করতে হবে।

দেশে কর-জিডিপির অনুপাত বিগত অর্থবছরে ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে ৬ দশমিক ৬ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। এ হার রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যয়, ঋণ পরিশোধ কিংবা পর্যাপ্ত নাগরিক সেবা দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। অথচ করছাড়ের নামে করযোগ্য ব্যবসায়ী বা ব্যক্তিদের অনেকেই বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে। আর যারা কর দিচ্ছেন, তাদের ওপরই করের চাপ বাড়ছে। উপরন্তু নিয়মিত করদাতারা অডিট ব্যবস্থার দুর্বলতা, ম্যানুয়াল সিলেকশনের অপব্যবহার এবং কর কর্মকর্তাদের জবাবদিহির অভাবে নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর তাদের অনাস্থাও তৈরি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কর কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে হলে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানোয় মনোযোগ দিতে হবে। সেই সঙ্গে কর অব্যাহতির সব সুযোগ বন্ধ করা জরুরি। বর্তমানে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনধারীর সংখ্যা এক কোটির বেশি। কিন্তু সে অনুপাতে আয়কর রিটার্ন জমা পড়ার সংখ্যা অনেক কম। যদিও গত অর্থবছরে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের কারণে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭ লাখেরও বেশি করদাতা অনলাইনে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। একই সময়ে ২১ লাখেরও বেশি করদাতা ই-রিটার্নের জন্য নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। প্রত্যক্ষ কর আহরণ বাড়ানো প্রয়োজন। করযোগ্য সব ব্যক্তিকে করজালের আওতায় আনতে হবে। কমসংখ্যক রিটার্ন জমা দেয়ার জন্য অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত করদাতা জরিপের অনুপস্থিতি এবং কর প্রশাসনের অটোমেশনের ধীরগতিও দায়ী। এছাড়া রিটার্ন দাখিলের প্রমাণও (পিএসআর) যথাযথভাবে তদারকি না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি স্থায়ী অর্থনৈতিক ইউনিটকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনা যায়নি। ভ্যাট ফাঁকি দেয়াও একধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ভ্যাট নিবন্ধনযোগ্য সব প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো এসব ট্রেডার ও সেবা প্রদানকারীর মার্কেট এবং এলাকাভিত্তিক সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। নানা কৌশলের কারণে এসব সমিতি বা অ্যাসোসিয়েশনের নিবন্ধন দেয়া যায় না।

সামগ্রিকভাবে দেশে কর আহরণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে সম্প্রসারণ হয়নি। ফলে কর প্রদানে মানুষের আগ্রহ কম। মানুষকে কর প্রদানে উৎসাহ দিতে এনবিআরের কর আহরণ ব্যবস্থা দক্ষ করতে হবে। পুরো ব্যবস্থা অটোমেটেড করা প্রয়োজন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এনবিআর নয়, রাজস্ব আহরণে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের অটোমেশন ও সমন্বয় নিশ্চিত করা দরকার। এছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির চর্চা থাকতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ভ্যাট ও কর যেন কেউ ফাঁকি দিতে না পারে, সেজন্য কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো এনবিআরের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

দেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে রাজস্ব বাড়ানোর বিকল্প নেই। এজন্য এর ব্যবস্থাপনার ওপর জনগণের বিশ্বাস ফেরানোও জরুরি। সেজন্যও ন্যায্য কর কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা থাকতে হবে। নয়তো নাগরিককে কর প্রদানে আগ্রহী করে তোলা যাবে না।