কউনিকেশন পেশায় নিয়োজিত থাকায় নিজ অভিজ্ঞতা থেকেই এমনটা দেখেছি। কিন্তু কমিউনিকেশন অর্থাৎ নিজ প্রতিষ্ঠান বা ব্র্যান্ডকে বাজারে ক্রেতা, সেবাপ্রত্যাশীদের কাছে নিজেদের উপস্থাপন করা একই সঙ্গে এটিকে একটি মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টান্ত হিসেবে টিকিয়ে রাখার কাজটিই করতে হয় কমিউনিকেশন ফাংশনকে। নিজে কাজ করতে গিয়ে যতটা বুঝেছি, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের কমিউনিকেশন-সংক্রান্ত বাস্তবতা অনেক গভীর ও জটিল। নিজ অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, কমিউনিকেশন পেশাজীবীরা প্রতিষ্ঠানের বড় একটি স্তম্ভ। অর্থাৎ তারা প্রতিষ্ঠানের চোখ, কান ও মুখপাত্রের কাজ করেন।

কমিউনিকেশন পেশাজীবীরা কেন গুরুত্বপূর্ণ? প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত, সেবা, নতুন ধারণা ও পণ্য কীভাবে ক্রেতা বা গ্রাহক অর্থাৎ নিজেদের কাঙ্ক্ষিত বাজারে ছড়িয়ে পড়ার সহজ পথটি গড়েন তিনি। প্রতিষ্ঠানের মূল বার্তা কীভাবে গ্রাহক বা ক্রেতার বোধগম্য হবে, তার সেবা বা পণ্য ক্রয়ের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তটির প্রতি বাজারকে আকৃষ্ট করবে তার সৃজনশীল সুযোগটি তাদেরই পরিকল্পনা সাজিয়ে করতে হয়। তাই কমিউনিকেশন ফাংশন তথ্য সংগ্রহ করে সেটা শুধু পৌঁছে দেয় এমন নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের যেকোনো কাজের নানা ধরনের অর্থ তৈরি করে, এর মধ্যে মূল্য সংযোজন করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এবং সংকটের সময় প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হিসেবে সুরক্ষা দেয়।

দক্ষ কমিউনিকেশন প্রফেশনালকে অনেক কিছু বুঝতে হয়, জানতে হয়। প্রতিষ্ঠান কী করছে, কেন করছে এবং কাদের লক্ষ্য করে কিছু করছে এগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং এ বিষয়ে তাকে বিশদ ধারণা রাখতে হয়। কারণ তার কাছে প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত বা কাজের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা না থাকলে কোনো ধরনের কমিউনিকেশনই কার্যকর হবে না। তাই তাদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে প্রতিষ্ঠানকে ভেতর থেকে বোঝা। প্রতিষ্ঠানের কৌশল, সংস্কৃতি, ঝুঁকি—এসব বিষয়ে ভালো জ্ঞান থাকা খুব জরুরি। তারা বিভিন্ন ডিভিশন ও বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন, বিস্তারিত আলোচনা করবেন, তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং সেই তথ্যকে অর্থপূর্ণ বার্তায় রূপ দেবেন।

কমিউনিকেশন প্রফেশনালরা সমাজের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার জন্য পরিকল্পনা সাজাবেন এবং সে অনুযায়ী যোগাযোগ করবেন। কমিউনিকেশনের অর্থ শুধু কোনো কিছু বলা নয়। শুনতে হবে বেশি। একজন ভালো কমিউনিকেশন প্রফেশনাল জানেন, সহকর্মী, গ্রাহক, বিনিয়োগকারী, সংবাদমাধ্যম সবার আলাদা ভাষা আছে, আলাদা প্রত্যাশা আছে। সেই প্রত্যাশাকে বুঝে সঠিক বার্তা তৈরি করাই তাদের একটা প্রধান কাজ। তারা জানেন কখন কী বলা উচিত, আর কখন চুপ থাকা উচিত। কারণ প্রতিষ্ঠানের সুনাম ব্যবস্থাপনাই তার প্রধান কাজ। আর এটি তাকে পেশাদারত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়।

রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট বা সুনাম ব্যবস্থাপনা মহাগুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে পেশাদার জায়গা থেকে কাজটি জটিল ও অনেক ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জিং। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম একদিনে তৈরি হয় না। তবে একদিনেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই কমিউনিকেশন পেশাজীবীরা সবসময় নজর রাখবেন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কী বলা হচ্ছে, কীভাবে বলা হচ্ছে, মানুষ কীভাবে তার সংস্পর্শে আসছে এবং কেমন প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে সেটিও পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ও কাঙ্ক্ষিত বাজারের ক্রেতা/সেবাগ্রহীতা কিংবা ক্লায়েন্টদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় করে দূরত্ব কমিয়ে আনার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেন। এজন্য আগে থেকেই সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে তাকে ম্যানেজমেন্টকে সতর্ক করতে হয়। এজন্য কমিউনিকেশন ফাংশনকে প্রতিষ্ঠানের বিবেক রূপকার্থে অভিহিত করা হয়।

আধুনিক সময়ে দায়িত্বটি আরো কঠিন হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভুল বার্তা মুহূর্তে ভাইরাল হতে পারে। তাই কমিউনিকেশন প্রফেশনালদের দ্রুত কাজ করার এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে, তথ্য যাচাইয়ে সতর্ক হতে হবে এবং উত্তর দেয়ার সময় সংবেদনশীল হতে হবে। তারা শুধু কনটেন্ট তৈরি করবেন না; সমাজের প্রতিক্রিয়া, ট্রেন্ড ও মতামত সারাক্ষণ মনিটর করবেন। প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বস্থানীয়দের পরামর্শ দেয়া এক্ষেত্রে বড় দায়িত্ব। এটাকে লিডারশিপ অ্যাডভাইস বলা যায়। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্ব সারাক্ষণই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এ কৌশলগত সিদ্ধান্ত জনমানুষের কাছে কেমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, তা সবসময় শীর্ষ নেতৃত্বের বুঝতে পারার কথা নয়। এখানে কমিউনিকেশন প্রফেশনালরা পরামর্শ দেবেন, ব্যাখ্যা করবেন এবং বিকল্প পথও বাতলে দেবেন। তারা নেতৃত্বস্থানীয়দের বাজারে না গিয়েই সেখানে পৌঁছার জন্য প্রস্তুত করবেন। কীভাবে কথা বলতে হবে, কীভাবে কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে এবং কীভাবে আস্থা তৈরি করতে হবে—এসব বিষয়ে ডিকটেশন তাদের দিয়ে থাকেন।

একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কমিউনিকেশনও একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সহকর্মীরা যদি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, পরিকল্পনা ও মূল্যবোধ না বুঝতে পারেন, তাহলে এক্সটারনাল কমিউনিকেশন কখনই শক্তিশালী হয় না। তাই সহকর্মীদের সঙ্গে স্বচ্ছতার সাথে, নিয়মিত ও মানবিক যোগাযোগ তৈরি করা এ পেশার একটা বড় দায়িত্ব।

আমি মনে করি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কমিউনিকেশন একটা মানবিক দক্ষতা। শুধু ভাষা জানলেই হয় না; সহানুভূতি প্রকাশ করতে জানতে হয়, আবেগ অনুভব করার ক্ষমতা এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার সক্ষমতা প্রয়োজন হয়। শুধু লিখতে পারলেই একজন সুন্দর কমিউনিকেশন প্রফেশনাল হওয়া যায় না; তিনি একজন লেখক, অনুবাদক, একজন কৌশলবিদ, একজন শ্রোতা ও একজন সেতুবন্ধ সৃষ্টিকারী।

কমিউনিকেশন পেশাজীবীদের কাজ একটাই আস্থা তৈরি করা। কারণ প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে শুধু পণ্য বা সেবার ওপর নয়; টিকে থাকে গ্রাহক ও মানুষের বিশ্বাসের ওপর। আর তা, দিন শেষে গড়ে তোলার দায়িত্ব কমিউনিকেশন পেশাজীবীদের হাতেই।

ইকরাম কবীর: কমিউনিকেশন পেশাজীবী