দেশে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এর পেছনে প্রধানতম দায়ী জীবনাচরণ। সময়ের পরিক্রমায় প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাপনকে সহজ করে তুলেছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ ঘরে কিংবা কর্মস্থলে—সবখানেই মানুষের কায়িক শ্রম বহুলাংশে কমিয়ে এনেছে। অন্যদিকে খুব বেশিসংখ্যক মানুষের মধ্যে নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। এমনকি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও গড়ে ওঠেনি। অথচ কায়িক শ্রম, শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ডায়াবেটিসের মতো নানা অসংক্রামক রোগের হাত থেকে মানুষের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়ার পেছনে ব্যক্তি পর্যায়ে অসচেতনতার বড় প্রভাব রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে করপোরেট কালচারের দায়ও এড়ানো যায় না।

অধিকাংশ মানুষ অতিরিক্ত শর্করা ও চিনিযুক্ত খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফাস্ট ফুডের ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে। এছাড়া বর্তমানে বাজারে ভেজাল খাদ্যপণ্যেরও ছড়াছড়ি, যা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার দায় নিশ্চয় ব্যক্তির ওপর বর্তায়। তবে বাজারে ভেজাল খাদ্যপণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা সরকারের ওপরই যায়। এছাড়া সরকার পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে পারেনি, এর বড় দৃষ্টান্ত রাজধানী ঢাকা। এতে হাঁটা-খেলার মতো পরিসর হারিয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বেশির ভাগ ফুটপাতও হাঁটার অনুপযোগী। এসব কারণেও মানুষের মধ্যে হাঁটা-খেলার প্রবণতা কমেছে। বিপরীতে প্রযুক্তিনির্ভরতা বেড়েছে। অন্যদিকে বর্তমানে সরকারি বা বেসরকারি অধিকাংশ কর্মস্থলের পরিবেশও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য খুব বেশি অনুকূলে নেই। মানসিক চাপও ডায়াবেটিসের কারণ হতে পারে। কিন্তু এখনো দেশের কোনো পর্যায়ে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। কর্মীদের মানসিক চাপ মুক্তিতে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেই। বিশ্রামের জন্য উপযুক্ত স্থানের ব্যবস্থা থাকে না। এমনকি প্রয়োজনীয় সময়ও দেয়া হয় না। এছাড়া কর্মস্থলে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের সুব্যবস্থা না থাকায় কর্মীদের বাইরে গিয়ে অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে দেখা যায়। এতে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়েছে। দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের (২০-৭৯ বছর) মধ্যে ১৩ দশমিক ২ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে এ রোগে ভুগছেন বলে ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্যে উঠে এসেছে।

দেশের প্রাপ্তবয়স্করাই নয়, শিশুরাও উদ্বেগজনক হারে বর্তমানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। স্কুলে খেলার জায়গা ও খাবারের সুব্যবস্থা না থাকা, মাত্রাতিরিক্ত ফাস্ট ফুড ও অনলাইন গেমনির্ভরতা ইত্যাদি কারণে তাদের মধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। পেডিয়াট্রিকস ডায়াবেটিক ক্লিনিক অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের (পিডিসিআরসি) তথ্য অনুসারে, দেশে সাত হাজারের বেশি শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আবার বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির তথ্যানুযায়ী, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি, প্রায় ৫০ শতাংশ। গর্ভকালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে শিশুদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

শিশুদের টাইপ-১ ডায়াবেটিসের উপসর্গ দেখা দেয় তুলনামূলক কম বয়সে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস একটু বেশি বয়সের শিশু বা কিশোর-কিশোরীদের দেখা যায়। যাদের ওজন বেশি, শরীরে অতিমাত্রায় মেদ, কায়িক পরিশ্রম করে না, তাদের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্তদের লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে। আক্রান্ত প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজনের ডায়াবেটিস শনাক্ত হচ্ছে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর। দীর্ঘদিন পর চিকিৎসকের কাছে আসায় অন্ধত্ব, কিডনি নষ্ট, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও মুখে ইনফেকশনের মতো জটিল ডায়াবেটিসজনিত রোগের চিকিৎসায় বেগ পেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।

বাস্তবতা হলো, দেশের ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে আইডিএফের তথ্যে দেখা গেছে। সচেতনতার অভাবে যে এটি ঘটছে তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়ছে। আইডিএফের ভিন্ন একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে দেশে এ রোগে আক্রান্তের হার ঊর্ধ্বমুখী এবং এতে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটছে। এছাড়া ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে অষ্টম। বর্তমান ধারায় চলতে থাকলে ২০৪৫ সালে দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা হবে ২ কোটি ২৩ লাখ। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হলে অবশ্যই ডায়াবেটিস প্রতিরোধকে নীতিনির্ধারণী পর্যায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগও প্রয়োজন।

মনে রাখা প্রয়োজন যে ডায়াবেটিস প্রতিরোধযোগ্য রোগ। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এ রোগ প্রতিরোধের অন্যতম উপায়। এজন্য সরকারি-বেসরকারি প্রয়াস আবশ্যক। প্রতিরোধের পাশাপাশি এ রোগ নিয়ন্ত্রণে সবার আগে যথাসময়ে রোগ শনাক্ত হওয়া জরুরি। ওজন আধিক্য, কায়িক শ্রমের ঘাটতি, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, কোলেস্টেরল আধিক্য, উচ্চ রক্তচাপ, পারিবারিক ইতিহাস, চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তি যাদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি তাদের উচিত ডায়াবেটিস নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা। নিয়মিত রক্তের শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা। একই সঙ্গে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে বিভিন্ন রুটিন পরীক্ষা, যেমন প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের উপস্থিতি, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, তিন মাসের গড় ডায়াবেটিসের মাত্রা, লিপিড প্রোফাইল, ইসিজি প্রভৃতি পরীক্ষা করতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় ডায়াবেটিসের জটিলতা শনাক্ত হলে অনেকাংশেই মারাত্মক ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণ করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। আর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চললে অনেক ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই ডায়াবেটিসের কারণ, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও প্রতিরোধে কার্যকর স্বাস্থ্য-শিক্ষার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ তথা সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সবাইকে সচেতনভাবে এ রোগ প্রতিরোধে তৎপর হতে হবে।

চলতি বছর ডায়াবেটিস দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—কর্মস্থলে ডায়াবেটিস সচেতনতা গড়ে তুলুন। কর্মস্থলসহ সর্বত্র সচেতনতা গড়তে রাষ্ট্রকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর চর্চাকেও কর্মস্থলের নিয়মের আওতায় আনা প্রয়োজন। জীবনের একটা পর্যায়ে এসে মানুষ ঘরের চেয়ে কর্মস্থলেই বেশি সময় কাটায়। তাই শারীরিক সুস্থতার জন্য চাপমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর কর্মস্থল অতীব জরুরি হয়ে পড়ে। নয়তো নানা রোগের সূত্রপাত এখান থেকে শুরু হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সুতরাং এমন কর্মপরিবেশ তৈরি করায় মনোযোগ দিতে হবে, যা হবে ডায়াবেটিসসহ যেকোনো অসংক্রামক রোগকে প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ।