দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা হলো অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। ব্যাংক ব্যবস্থা প্রাণবন্ত থাকলে অর্থনীতি স্থিতিশীল ও গতিশীল থাকে। কিন্তু বিগত সরকারের দেড় দশকে অনিয়ম-দুর্নীতি, ঋণ পুনঃতফসিল, অপ্রয়োজনীয় সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক অনুমোদন, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় পরিবার বা গোষ্ঠীর প্রভাবে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এ খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ক্রমেই বাড়ছে। বিগত সময়ে এ খাতে সবচেয়ে বেশি আর্থিক অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। বিগত বছরগুলোয় এ খাতে অনেক ঘটনা চিহ্নিত হলেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি বাংলাদেশ ব্যাংককে। জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও অব্যবস্থাপনার মতো সমস্যা ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা নষ্ট করে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য হুমকি তৈরি করছে। শুধু কার্যক্রমগত ত্রুটি নয় বরং দুর্বল শাসন ব্যবস্থা, সীমিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণেও এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। দেশের ব্যাংক খাতের এসব সংকট মোকাবেলায় ফরেনসিক অডিট অত্যন্ত অপরিহার্য। ব্যাংক খাতে ফরেনসিক অডিট বাস্তবায়ন করা গেলে জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিং চিহ্নিত করার পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্তকরণে ভূমিকা রাখবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির যে অভাব রয়েছে, তা দূর করে প্রতিষ্ঠানের ভিতকে শক্তিশালী করবে ফরেনসিক অডিট। তাছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হলে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অতীতের অনিয়ম-দুর্নীতির ফরেনসিক অডিট দরকার।

রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘‌ইনস্টিটিউশনালাইজিং ফরেনসিক অডিট ইন ব্যাংকস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ব্যাংক খাতে ফরেনসিক অডিট প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। ব্যাংকার, শিক্ষাবিদ ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসহ ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমের এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৯৪ শতাংশ ব্যক্তিই ফরেনসিক অডিটরদের সহায়তার জন্য ব্যাংকের একটি আলাদা অভ্যন্তরীণ টিম গঠনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা মনে করেন, ফরেনসিক অডিট চালু হলে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতি কমবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও অপরাধের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশ্বের বহুল আলোচিত ঘটনা—এনরন, আর্থার অ্যান্ডারসন ও ওয়ার্ল্ডকম কেলেঙ্কারি আর্থিক অপরাধের তীব্রতা তুলে ধরে। আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ একটি অত্যন্ত জটিল কাজ। কারণ আর্থিক অপরাধের ধরন, অপরাধীর বৈচিত্র্য ও অপরাধ সংঘটনের কৌশল নানা রকম। এ অবস্থায় প্রচলিত নিরীক্ষা ব্যবস্থা অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। সাধারণত প্রচলিত নিরীক্ষকদের দায়িত্বের মধ্যে অপরাধ শনাক্ত বা প্রতিরোধ করার বিষয়টি পড়ে না, যদি না বিশেষভাবে তা অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয়া হয়। অর্থাৎ প্রচলিত নিরীক্ষার কার্যপরিধি সীমিত ও অপরাধ প্রতিরোধের মতো একটি জটিল ও বহুমাত্রিক কাজের জন্য এটি যথেষ্ট নয়। এ বাস্তবতা থেকেই ফরেনসিক অডিটের আবির্ভাব ঘটেছে। প্রতারণার ধরন, অপরাধী ও কৌশল বিশ্লেষণ করে, আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে অর্থনৈতিক অপরাধ চিহ্নিত ও নির্মূলে যে বিশেষজ্ঞ নিরীক্ষার প্রয়োজন, ফরেনসিক অডিট সে কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করে থাকে। এটি এখন আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ফরেনসিক অডিট মূলত একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথিপত্র ও কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রমাণ সংগ্রহ করে। এটি কেবল নিরীক্ষা নয়, বরং একটি বিচারিক সহায়তামূলক কার্যক্রম, যা ভবিষ্যতের আইন প্রয়োগে ব্যবহার হতে পারে। ব্যাংক খাতে আর্থিক অপরাধের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ফরেনসিক অডিটের ভূমিকা এখন ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে শুধু আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোই নয়, বরং করপোরেট পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরাও প্রতারণার আশঙ্কা দেখা দিলেই ফরেনসিক অডিটের সহায়তা নিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। আর্থিক অপরাধ বা কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটলেই ফরেনসিক অডিটের কার্যকারিতা ও শক্তি দৃশ্যমান হয়। এমন ভূমিকার কারণেই এখন ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করেছে, সেসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে ফরেনসিক অডিট বাধ্যতামূলক করেছে।

আমাদের দেশের ব্যাংক খাতের নীতিনির্ধারকরা যত দ্রুত এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবেন, ততই উপকৃত হবেন সব পক্ষ। কারণ ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে প্রতারণা সুস্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি উদ্ঘাটনে ফরেনসিক অডিট চালু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বেসরকারি খাতে ১১টি ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট চলমান রয়েছে। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ফরেনসিক অডিট করা যেতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোয় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের আর্থিক অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও অপরাধের যে অস্বাভাবিক বিস্তার ঘটেছে তা দেশের অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। বেসরকারি ব্যাংক নিরীক্ষা ও একীভূতকরণের নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। কিন্তু আলোচনার বাইরে থেকে গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। যদিও ২০০৯ সালে বিগত সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকে লুণ্ঠন শুরু হয়েছিল। বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও হলমার্কের মতো একের পর এক বৃহৎ ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে লাখ কোটি টাকারও বেশি লোপাট করা হয়েছে। এ মুহূর্তে কেবল জনতা ব্যাংকেরই মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। আর রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির পরিমাণ যোগ করলে এর পরিমাণ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে। এছাড়া বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম সমস্যা খেলাপি ঋণ। এ খাতের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। যেখানে ২০০৯ সালে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। সোনালী, জনতা, অগ্রণী, বেসিক ব্যাংকে বিগত দেড় দশকে একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত এসব দুর্নীতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ কিংবা কোনো অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ দেখা যায়নি। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এমডি বা চেয়ারম্যান বদল করে দায় সেরেছে সরকার। বেসরকারি ব্যাংক খাতে সরকার কিছু দৃশ্যমান সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু ব্যাংক খাতের প্রতিটি আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য উদ্ঘাটনে ফরেনসিক অডিট ছাড়া সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন কঠিন।

আর্থিক অপরাধে জড়িতদের চিহ্নিত করতে ও জবাবদিহির আওতায় আনতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতা ও দক্ষতার অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। অপরাধীরা বারবার রেহাই পেয়ে যাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আরো প্রকট হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ব্যাংক খাত ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ফরেনসিক অডিট হতে পারে প্রতারণা শনাক্তকরণ, হ্রাস এবং প্রতিরোধের একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী পদ্ধতি। প্রচলিত নিরীক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা যেখানে প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে, সেখানে ফরেনসিক অডিটই সেই বিকল্প, যা অপরাধমূলক আর্থিক কর্মকাণ্ডের গভীরে গিয়ে প্রমাণ সংগ্রহ করতে সক্ষম। যদিও বাংলাদেশে ফরেনসিক অডিট এখনো নতুন একটি ধারণা। তবু নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এর জরুরি প্রয়োজনীয়তা এরই মধ্যে অনুধাবন করা শুরু করেছে। বর্তমানে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে ফরেনসিক অডিট। বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিক কাঠামোয়, যেখানে জবাবদিহির অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় দুর্নীতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে সেখানে ফরেনসিক অডিট ব্যাংক খাতের আর্থিক অপরাধ হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি, আর্থিক জবাবদিহি ও জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে এখনই প্রয়োজন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে ফরেনসিক অডিট চালু করা।