একজন নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ নথি হলো জন্ম সনদ। এ সনদ জন্মনিবন্ধনের তথ্যের ভিত্তিতে দেয়া হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, দেশে অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সী শিশুদের ৪১ শতাংশ এখনো জন্মনিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে। আর এ বয়সী নিবন্ধিত শিশুর মধ্যে ৪৭ শতাংশের জন্ম সনদ নেই বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের তথ্যে উঠে এসেছে।
এ পরিস্থিতি সহজেই এড়ানো যেত, যদি হাসপাতাল বা স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকেও জন্মনিবন্ধনের দায়িত্বটি দেয়া হতো। পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে এ চর্চাই রয়েছে। আবার পাশের দেশ ভারতে স্থানীয় সরকারের পাশাপাশি হাসপাতালভিত্তিক যৌথ উদ্যোগে জন্মনিবন্ধনের কাজটি করা হয়ে থাকে। কেননা বর্তমানে বেশির ভাগ শিশু জন্ম নেয় হাসপাতাল বা স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতালে জন্মনিবন্ধনের ফরম পূরণের সুবিধা থাকে বা জন্মের তথ্যই চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় বা স্থানীয় সরকারের কার্যালয়ে কিংবা ডাটাবেজে প্রেরণ করে। এটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারের সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার মাধ্যমে করা হয়। বিশেষ কোনো জটিলতা ছাড়াই এভাবে জন্মনিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন হয়। এ প্রক্রিয়ার প্রচলন দেশে করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে সব শিশুকে জন্মনিবন্ধনের আওতায় আনতে সরকারের যে অঙ্গীকার রয়েছে, সেটি অর্জন করাও সহজ হতো। তবে এখনো দেশে বাড়িতে ধাত্রীর দ্বারা সন্তান জন্মায়। তাদেরও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এ জন্য স্থানীয় সরকারের সক্রিয় হওয়ার বিকল্প নেই।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন ২০০৪ অনুযায়ী, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধন করা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধ্যতামূলক। এ আইনে বলা হয়েছে, জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য স্থানীয় সরকার, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের কাছে পাঠাতে হবে। তথ্য পাঠানোর কাজটি শিশুর পিতা, মাতা, অভিভাবক বা নির্ধারিত কোনো ব্যক্তি, যে কেউ করতে পারবে। আর স্থানীয় সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিবন্ধক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া বিদেশে জন্মানো কোনো শিশুর নিবন্ধনের কাজটি করবে বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো একজন কর্মকর্তা। যদিও বাস্তব চিত্র জানান দিচ্ছে যে জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে আইনের পূর্ণ প্রতিফলন নেই।
এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে—আইনি কাঠামোর দুর্বলতা, প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং আইন বাস্তবায়নের অভাব। বিদ্যমান আইনে জন্মের পর পরই নিবন্ধনের সুযোগ নেই। কাউকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়ে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও যদি আইনিভাবে এ দায়িত্ব দেয়া হতো তাহলে এ ধরনের প্রক্রিয়াগত জটিলতা এড়ানো সম্ভব ছিল। বিদ্যমান ব্যবস্থাটি শ্রমসাধ্য, সময়সাপেক্ষ এবং বহু ক্ষেত্রে ব্যয়বহুলও বটে। বিবিএস ও ইউনিসেফের ওই জরিপেও উল্লেখ করা হয়েছে, জন্মনিবন্ধন কীভাবে করতে হয় সে বিষয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ অভিভাবক অবগত আছেন। কিন্তু তার পরও ইউনিয়ন পরিষদে ঝামেলামুক্ত সেবা না পাওয়া, খরচ এবং দারিদ্র্য এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি আইনের দিকে লক্ষ করলেও বোঝা যায়। জন্ম সনদ পেতে হলেও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার পরিপালনসহ ফিও প্রদান করতে হয়। এছাড়া বাড়তি খরচও করতে হয়। আবার অনেক সময় সার্ভার ডাউন থাকে, অনেককে হয়রানির শিকার হতে হয়। এসব বাধা জন্মনিবন্ধনকে কঠিন করে তুলেছে। এগুলো কাটিয়ে ওঠার অন্যতম উপায় হতে পারত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানেই জন্মনিবন্ধনের ব্যবস্থা করা।
অন্যদিকে আইনের বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই বিপুলসংখ্যক শিশু জন্মনিবন্ধনের বাইরে থেকে যাচ্ছে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০ হাজার জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হলেও ভাসমান ও স্থায়ী ঠিকানাবিহীন পরিবারের শিশুদের জন্মনিবন্ধন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও জন্মস্থান বা বর্তমান ঠিকানা থাকলেই নিবন্ধনের সুযোগ পাওয়ার কথা আইনে বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সেক্টরে নিয়োজিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (এনজিও) মাঠকর্মী বা সরকারের নির্ধারিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এসব শিশু নিবন্ধনের আওতায় আনবে বলে ওই আইনে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি পরিত্যক্ত বা সাধারণ স্থানে পরিচয়হীনভাবে পড়ে থাকা শিশুর ক্ষেত্রে নিবন্ধকের দায়িত্ব পালনের কথা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা নির্ধারিত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। অথচ জন্মনিবন্ধন একটি শিশুর মৌলিক নাগরিক অধিকার। তার ভবিষ্যৎ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা—সবকিছু পাওয়ার ভিত্তি হবে এ নিবন্ধন। তার পরও বিপুলসংখ্যক শিশু এর বাইরে থেকে যাওয়াটা রাষ্ট্রীয় সেবার নিম্ন মানকে তুলে ধরে।
সরকারের উচিত জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা। এজন্য সর্বাগ্রে আইন সংশোধন করা আবশ্যক। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু দেশ হাসপাতালের ওপর দায়িত্ব দিয়ে জন্মনিবন্ধনের কাজটি প্রায় শতভাগ সম্পন্ন করেছে। নবজাতকের জন্মের পর পরই মুহূর্তেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য ইনপুট দেয়া হয়। ফলে প্রশাসনিক ঝামেলা কমে আসে। কাউকে আলাদাভাবে সময় দিতে হয় না। এ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে সরকার নিজেই। কারণ এতে সরকারের তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। এজন্য সরকারকে সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলায় অগ্রাধিকার দিকে হবে।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম চালু রয়েছে। অথচ এখনো জন্ম ও মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা যায়নি। এর অন্যতম কারণ পরিসংখ্যান প্রণয়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। এ সমন্বয়হীনতা দূর করে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সঠিক ও নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বর্ণিত প্রক্রিয়া সহায়ক হতে পারে। তাই রাষ্ট্রকেই জন্মনিবন্ধনের প্রক্রিয়াকে আরো সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত করতে কঠোর আইন প্রয়োগ, হাসপাতালভিত্তিক নিবন্ধন, একক ডাটাবেজ, প্রশাসনিক সমন্বয় ও নাগরিক সচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে। এতে অননুমোদিত হাসপাতালে সন্তান জন্মের ঘটনাও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন যে সঠিক জনমিতিক তথ্য ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের যেকোনো সিদ্ধান্ত অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকিই বেশি থাকে। তাই জন্মনিবন্ধনের পাশাপাশি মৃত্যুর তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে সরকারের শতভাগ জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিতের অঙ্গীকারও পূরণ হওয়ার পথ মসৃণ হবে।










