কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না। অথচ কৃষকের উৎপাদিত সবজি বাজারে অত্যধিক বেশি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। স্বল্পমূল্যে সবজি বিক্রির পর খোদ কৃষক বাজারে গিয়ে দামের আগুনে পোড়েন। একদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অন্যদিকে কোনো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষক সর্বস্বান্ত হয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, উৎপাদন-পরবর্তী বিপণন ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হন। সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিপণ্য উৎপাদনের হিসাবে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এক কেজি বেগুন উৎপাদনে ১০ টাকার কিছু বেশি খরচ হয়। অথচ বিভিন্ন হাত ঘুরে রাজধানী ঢাকার খুচরা বাজারে সেই সবজি ভোক্তাকে ১০ গুণেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আকার ও মানভেদে লম্বা ও গোল বেগুন বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি পর্যন্ত। এর কারণ জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাত উপস্থাপন করেন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা অতিমুনাফা করলেও কৃষক ঠিকই অবহেলিত থেকে যান।

বাজারসংশ্লিষ্টদের দাবি, অস্বাভাবিক পরিবহন ব্যয়, রাস্তায় চাঁদাবাজি, উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বিক্রয় কেন্দ্র পর্যন্ত দফায় দফায় আড়তদারি (কমিশন) খরচসহ নানা ব্যয়ের কারণে সবজির দাম অস্বাভাবিক হচ্ছে। আবার চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে বৃষ্টি থাকায় শীতকালীন সবজির আগাম আবাদ বিলম্বিত হয়েছে। বৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন স্থানের সবজির উৎপাদন। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে বলে ব্যবসায়ীরা আত্মপক্ষ সমর্থন করছেন। 

রাজধানীর বাজারগুলোর ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বেশি দামে কিনে সামান্য লাভে বিক্রি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে তারাও বৃষ্টির দোহাই দিচ্ছেন। আর রাস্তায় চাঁদাবাজির অভিযোগও তোলা হচ্ছে পাইকারি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে। যদিও কৃষিসংশ্লিষ্টদের দাবি, বৃষ্টির ফলে সবজির উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সবজির দাম কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বাজারে অস্বাভাবিক দামে বিক্রি হচ্ছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কৃষক অত্যধিক দামের কোনো সুফলই পান না। উল্টো বৃষ্টির দোহাই দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা একতরফাভাবে লাভবান হন।

বর্তমানে দেশে স্মরণকালের সর্বোচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির নেপথ্যে চাঁদাবাজির মতো অদৃশ্য কিছু কারণ রয়েছে। পথে কয়েক দফায় চাঁদা দেয়ার কারণে ছোট ব্যবসায়ীরা শেষমেশ সেই দায়ভার ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দেন। আর দীর্ঘদিন ধরে এটিই হয়ে আসছে। এর বিহিত না হলে কৃষক সবসময় বঞ্চিতই থেকে যাবেন। কৃষকের শ্রম-ঘামে উৎপাদিত ফসল থেকে অত্যধিক মুনাফা করবেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। এমনকি কৃষক তার ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়ার সময়টিতে কৃষি উপকরণ কেনার জন্য সহজ শর্তে কৃষি ঋণও পান না। প্রভাবশালীরা তাতে ভাগ বসান বলে অভিযোগ রয়েছে।

খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ এমনিতেই মাছ-মাংস খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। এখন স্বস্তির যে জায়গাটি ছিল, সে সবজিও যদি উচ্চমূল্যে কিনতে হয়, তাহলে মানুষ ব্যাপকভাবে অপুষ্টিতে ভুগবে, যা আমাদের জন্য স্বস্তির কোনো কারণ হবে না। 

উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্রে কৃষক অবহেলার শিকার হন না। বাজার ব্যবস্থাপনায় কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য পান সেটি লক্ষ রাখা হয়। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবাজার এত সমৃদ্ধ হতে পেরেছে। কিন্তু আমাদের দেশে কৃষকের প্রতি খেয়াল রাখার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এমনকি কৃষি উপকরণের ক্ষেত্রে ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রকৃত কৃষক পান না। এভাবে কৃষককে অবহেলা করায় প্রকারান্তরে বাজার কাঠামোরই ক্ষতি হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন কৃষি বিপণন খাতে একটি বাজে ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকলে তাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনার প্রক্রিয়া কোনো কোনো জায়গায় শুরু হয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের চাহিদার সুযোগ নিয়ে একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ সংকুচিত করার সময় এসেছে। এজন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষক যেন বঞ্চিত না হন, সেজন্য কৃষকের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে পুরো বাজার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। এক্ষেত্রে যেসব মধ্যস্বত্বভোগী অতিমুনাফা করছেন, তাদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কৃষকের পণ্য বিক্রি করার উদ্যোগ নিতে হবে, যা গত বছর শুরু করা হয়েছিল। এ রকম কৃষিবান্ধব উদ্যোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় আমাদের দেশে সব উন্নয়নের দ্বার কৃষির মাধ্যমেই উন্মোচিত হওয়া উচিত। কৃষক ভালো থাকলে দেশের কৃষি খাত ভালো থাকবে। এজন্য কৃষকের প্রতি আন্তরিকতা প্রদর্শন জরুরি। শুধু রুটিন অভিযান চালিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের দমন করা যাবে না। এজন্য পুরো বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়মিত তদারকি ও কৃষিপণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।