বাংলাদেশে আরো এক ত্রিকালদর্শী জনবুদ্ধিজীবীর প্রয়াণ ঘটল। এক জীবনে তিন ভূখণ্ডের নাগরিক হওয়া মানুষদের সর্বশেষদের একজন ছিলেন বদরুদ্দীন উমর। ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান এবং সর্বশেষ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কালপর্বে সক্রিয় ভূমিকা রেখে গেছেন তিনি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার পরিচয় ছিল একজন আপসহীন জনবুদ্ধিজীবীর। তার অবস্থানে কেউ কেউ হয়তো ত্রুটি খুঁজে পেতে পারেন কিন্তু তিনি তার অবস্থান প্রকাশে কখনো সংকোচ প্রকাশ করেননি। দীর্ঘ কর্মময় ও বৃহৎ জীবনযাপন শেষে ৯৪ বছরে মৃত্যুবরণ করলেও উমরের মৃত্যু ভক্ত-অনুরাগীকে ছুঁয়ে গেছে। কারণ জীবনের শেষ দিনগুলোয়ও তিনি ছিলেন সক্রিয় জনবুদ্ধিজীবীর ভূমিকায়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতি, ভূরাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে; তা পর্যবেক্ষণ করেছেন তার অভিজ্ঞ চোখে। আবার নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকেননি কখনো। নিজের কলম ও মুখ থেকে বেরিয়েছে একের পর এক সাহসী বয়ান। তার প্রখর স্মৃতিশক্তি, রসবোধ, সাহসী বক্তব্য তার জ্ঞানপিপাসু ও সত্যসন্ধানীদের জন্য ছিল বেশ উপাদেয়। একই সঙ্গে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি ও সুবিধাভোগী মানুষের কাছে তিনি ছিলেন বিরক্তির, ভয়ের বা কখনো উপহাসের বিষয়। কখনো সমালোচনা বা প্রশংসায় ভেসে না গিয়ে আপন কাজ করে গেছেন আপন শক্তিতে।
ষাটের দশক থেকে শুরু করে গত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক ইতিহাসচর্চা ও রাজনৈতিক চিন্তায় বদরুদ্দীন উমর নিজেকে অনিবার্য জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন। তার ভাষা ও প্রকাশে নিজের ঋজু ও সাহসী ব্যক্তিত্বের ছাপ রেখে গেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বামপন্থী ও প্রগতিশীল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক কর্মী তৈরিতে তার ভূমিকা স্বীকার করেন শত্রু-মিত্র সবাই। বাংলাদেশ লেখক শিবির প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে উদারনৈতিক ও প্রগতিশীল চিন্তা বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত বদরুদ্দীন উমরের সর্বজনস্বীকৃত কৃতি হচ্ছে তিনটি বিশাল খণ্ডে ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ শীর্ষক গ্রন্থ। তিনি আমাদের ভাষা আন্দোলনের সাহিত্যিক স্থপতি। ভাষা আন্দোলনের ওপর তার এ গ্রন্থ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সাহিত্যিক শংকর লিখেছেন—বদরুদ্দীন উমর ভাষা আন্দোলনের কাশীরাম দাশ। বদরুদ্দীন উমরের চিন্তার সঙ্গে একমত পোষণ করে অথবা একমত পোষণ না করেও বলা যায়, ভাষা আন্দোলনের ওপর রচনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা তার রাজনৈতিক জীবনের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অবিমিশ্রভাবে মানুষের সার্বিক শোষণমুক্তির সংগ্রামে নিরন্তর অংশগ্রহণ করে চলেছে।
বদরুদ্দীন উমরের গবেষণা গ্রন্থ ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’-এর তিনটি খণ্ড সম্পর্কে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন যে একমাত্র এই একটি বই-ই বদরুদ্দীন উমরকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট। এটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস হিসেবে যেমন অনন্য, তেমনি সমসাময়িক রাজনীতির ইতিহাস হিসেবেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ বইয়ের যেকোনো পাঠকই উপলব্ধি করতে পারবেন যে গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অঙ্গীকার ছাড়া এ রকম একটি অভিসন্দর্ভ রচনা করা সম্ভব নয়। এ বইয়ের জন্য তাকে দেয়া ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ তিনি কেন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বা কেন এর পরও তাকে অনেক পুরস্কার দেয়ার প্রস্তাব করা হলে তিনি সবিনয়ে সেসব প্রত্যাখ্যান করেছেন, তার উত্তরও নিহিত আছে তার রাজনৈতিক চিন্তার মধ্যে।
নির্মোহভাবে সত্যি কথাটা বলা; ক্ষমতা কাঠামো ও লোভাতুর প্রতিষ্ঠানের চোখে সবসময় উসকানি দেয়া। চেয়ারের লোভ সত্য শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে উসকানিকে অভিধানভুক্ত করে। উমর এই দক্ষিণ এশীয় পদ-পদবি-পদকের লোভের বিপরীতে বেছে নিয়েছিলেন এক বৃহৎ জীবন। তাই তো একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পদকসহ একের পর এক পদক প্রত্যাখ্যান করে জানান দিয়েছিলেন, অসাড় প্রতিষ্ঠানের মানুষকে মূল্যায়নের যে দুই ইঞ্চি গজফিতা; উনার দৈর্ঘ্য তার চেয়ে বেশি। উমর এ জনপদের দেড়শ বছরের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন নৈর্ব্যক্তিকভাবে। এতে ইতিহাসের দলীয় ও ধর্মীয় স্বার্থের বয়ানগুলো ভেঙে পড়েছে। শতমুখে বলে প্রতিষ্ঠা করা মিথ্যা ও শঠতার কলকব্জা বিকল হয়ে গেছে উমরের সত্য উচ্চারণের সক্রিয়তায়।
তিনি দেড়শ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করে বুঝেছিলেন, কৃষক ও শ্রমিকের গড়ে তোলা অভ্যুত্থান ও জনযুদ্ধের কৃতিত্ব ছিনতাই করে কীভাবে প্রতিষ্ঠানের ফড়িয়ারা আখের গুছিয়েছে। তিনি আইয়ুব শাহির আমলে মোনায়েম খানের বিরোধিতা করে যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়েন তারপর আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা মাড়াননি। কারণ তার কাছে মনে হয়েছে, ব্রিটিশ, পাকিস্তান আমল হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনৈতিক কর্মী ও কেরানি তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। কৃষক ও মেহনতি মানুষের ছেলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে রাজনীতিক, আমলা ও বুদ্ধিজীবী হয়ে নিজের ফেলে আসা অতীতকে পীড়ন নির্যাতন করেছে।
১৯৫০-এ বর্ধমানে তার প্রপিতামহের গৃহটি পুড়ে যায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গে চলে আসতে হয় তাদের। উমর তার ছেড়ে আসা উচ্চবিত্ত জীবনের বিপরীতে ঢাকার মধ্যবিত্ত জীবনে জ্ঞানসাধনায় নিমগ্ন থেকেছেন। বেতের সোফায় শার্ট ও লুঙ্গি পরে বসে থাকা উমরের পাশে ম্লান হয়ে গেছে নতুন উচ্চবিত্তদের থ্রিপিস স্যুট, রেশমি পোশাকের ঝলমল। তিনি কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষকে সংগঠিত করে তাদের রাজনৈতিক ভাষা ও কর্মসূচি তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। তিনি হয়তো অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন কিন্তু তার প্রয়াসে খামতি ছিল না, মেকিপনা ছিল না। তার ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলার কৃষক’ গ্রন্থটি যে অমোঘ বাস্তবতা বর্ণনা করে, বাংলাদেশ রাজনীতির চিরস্থায়ী বন্দোবস্তেও আমরা তার নির্মম পুনরাবৃত্তি দেখি। অতীতের আয়নায় বর্তমানকে দেখার চোখটি উমর আমাদের উপহার দিয়েছেন। বঙ্গভঙ্গ ও ভারত ভাগের দায় যে কংগ্রেস নেতাদের তা উঠে আসে তার ‘বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ ও ‘ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন’ গ্রন্থে; আর তাতেই বিপদে পড়ে যায় দেশভাগ নিয়ে কলকাতা ও জমিদার শ্রেণীর সৃষ্ট বয়ানগুলো।
ভাষা আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, উনসত্তরের অভ্যুত্থান থেকে স্বাধীনতাসংগ্রাম হয়ে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের পাঁচটি দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস উমর লিখেছেন দুই হাতে। মাঠের একজন ব্যস্ত রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠক হিসেবে তার বইয়ের বহর নিশ্চয়ই বিস্ময়জাগানিয়া। নব্বই পেরিয়েও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে তার কণ্ঠ ছিল সরব। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে বণিক বার্তাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকার আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল বলে মনে করেন অনেকে। তখন আরো অনেকে তার সঙ্গে স্বর মিলিয়ে ছাত্র-জনতার পক্ষে বক্তৃতা-বিবৃতি শুরু করেছিলেন। তিনি ওই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে একমাত্র বাংলাদেশেই গণ-অভ্যুত্থানের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ অঞ্চলে ১৯৫২ সালে আমরা প্রথম গণ-অভ্যুত্থান দেখেছিলাম। দ্বিতীয় গণ-অভ্যুত্থান দেখেছিলাম ১৯৬৯ সালে। তৃতীয়টি ছিল ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে। নব্বইয়ে এরশাদের বিরুদ্ধে চতুর্থ গণ-অভ্যুত্থান দেখেছিলাম। এ প্রতিটি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৫২ সালের ক্ষেত্রে সরকার পরিবর্তন সরাসরি হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানের শুরুর দিকের এ সময়টায় রাজনৈতিক দলগুলো গঠিত হয়। দেখা যায়, বায়ান্নর আন্দোলনের পরিণতিতেই ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ সরকারের পতন হয়। শুধু যে সরকারের পতন হয়েছিল তা-ই নয়; মুসলিম লীগ পূর্ব বাংলা থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল তাতে সামরিক সরকার টিকে থাকলেও আইয়ুব খানের সরকার উচ্ছেদ হয়ে ইয়াহিয়া খানের সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। ১৯৭১ সালে জানুয়ারি কিংবা এর আগেই ব্যাপক গণ-আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলনের ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে সরকার তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আর সক্ষম ছিল না।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে ‘একটি নাগরিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তার ব্যাখ্যা ছিল, গ্রামাঞ্চলে এরশাদবিরোধী আন্দোলন ছিল না। এ আন্দোলন ছিল ঢাকা শহর এবং অন্যান্য শহরকেন্দ্রিক। সেই নাগরিক বুর্জোয়ার অভ্যুত্থানের ফলে এরশাদ সরকারের পতন হয়েছিল। দেখা গেছে, আগের চারটি অভ্যুত্থানের পরই সরকার পরিবর্তন হয়েছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে প্রথম ‘অভ্যুত্থান’ স্বীকৃতি দিয়েছেন বদরুদ্দীন উমর। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে দেয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমানে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, এর ফলে চারদিকে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে এ সরকারের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ এ গণ-অভ্যুত্থান যত ব্যাপক হয়েছে এর আগে কোনো অভ্যুত্থান এত ব্যাপক কখনো হয়নি। ঢাকা শহর এবং অন্যান্য শহরাঞ্চলে তো বটেই সমগ্র গ্রামাঞ্চলে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে।’
বদরুদ্দীন উমরের মতো ত্রিকালদর্শী চিন্তক বাংলাদেশ রাজনীতির যে জীবনী লিখেছেন; তা অমূল্য জ্ঞানের আকর হয়ে থাকবে। তার গ্রন্থগুলো পড়তে শুরু করলে বাংলাদেশে ব্যক্তি ও দলপূজার রাজনৈতিক ইতিহাসের মিথ ভেঙে যাবে এবং সেখানে সাধারণ ও শ্রমজীবী মানুষের লড়াইয়ের গল্প জায়গা পাবে। বদরুদ্দীন উমর যেভাবে নিঃসংকোচে, নির্ভয়ে ও নির্মোহভাবে সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তা বর্তমান প্রজন্ম ও অনাগত প্রজন্মের জন্য উদাহরণ হিসেবে থাকবে।










