নতুন অর্থবছরের প্রথম মুদ্রানীতি ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এবারো এ নীতির প্রধান লক্ষ্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তাই গ্রহণ করা হয়েছে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, যার মাধ্যমে নগদ অর্থপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বিশেষ করে মুদ্রা সরবরাহ সীমিত রাখতে আবারো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য কমিয়ে এক অংকের ঘরে এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমানে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, যা এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য থাকলেও গত অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য পূরণে বেসরকারি ব্যাংক খাতে ঋণের প্রবাহ কমানো সুফল বয়ে আনার চেয়ে দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কেননা দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া গত অর্থবছরেও প্রথম ও দ্বিতীয়ার্ধে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমানো হয়েছিল, যার সুফল পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, বিদায়ী অর্থবছরের প্রথমার্ধে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ১০ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল ১০ শতাংশ।
মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমানো হলেও সরকারি খাতে তুলনামূলক বেশি ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঘোষিত মুদ্রানীতি অনুযায়ী, আগামী জুন পর্যন্ত সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হবে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ সরকার চলতি অর্থবছরের ঘাটতি বাজেট পূরণে দেশের ব্যাংক খাত থেকে অধিক মাত্রায় ঋণ গ্রহণ করবে। এ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এ ঋণের জোগান দিতেই সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও অর্থবছর শেষে ব্যাংক খাত থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে ঋণের জোগান দিতে গিয়ে বেসরকারি খাতের আরো বেশি ঋণবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদহার উঠেছে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশে। ব্যাংকগুলো এখন সরকারকে ঋণ দেয়াকেই বেশি লাভজনক ও নিরাপদ মনে করছে।
একদিকে কমছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি, অন্যদিকে বাড়ানো হয়েছে ব্যাংক ঋণের সুদহার। দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ শতাংশে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার বাড়িয়ে অর্থ সরবরাহ সীমিত রাখা তথা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের এ চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পড়েছে, যা পক্ষান্তরে মূল্যস্ফীতিকেই উসকে দিচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম আরো বাড়ছে। আবার ব্যবসায়িক মন্দা ও সুদহার বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হওয়ার মুখে। এতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দুটিই বাড়ছে; ব্যাংক খাতের সংকট আরো তীব্র হচ্ছে।
প্রায় দুই বছর ধরে দেশের ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট চলছে। ব্যাংকগুলো উচ্চ হারে সুদ দিয়েও আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না। সংকট তীব্র হওয়ায় দেশের অন্তত এক ডজন ব্যাংক তারল্যের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়েও কিছু ব্যাংককে নগদ অর্থের জোগান দিচ্ছে। আবার সরকারও ঘাটতি বাজেট পূরণে পুরোপুরি ব্যাংক ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত ঋণের জোগান নিশ্চিত করাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৩৫ শতাংশ অর্জন হয়েছে। যদিও ব্যাংক নির্বাহীদের মতে, বেসরকারি খাতে যে ঋণ প্রবৃদ্ধি দেখানো হচ্ছে সেটি নতুন ঋণ নয়। মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ ও অনাদায়ী সুদ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবেই বেসরকারি খাতে ঋণ স্থিতি বাড়ছে।
ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে আনায় দেশে নতুন বিনিয়োগ বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না। বড় উদ্যোক্তারাও নিজেদের ব্যবসা ছোট করে আনছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা বেশি বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু নতুন মুদ্রানীতিতে এ প্রবৃদ্ধি আরো কমিয়ে আনা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে নিম্ন আয়ের মানুষকে বাঁচানো যেমন জরুরি, তেমনি ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদেরও সুরক্ষা নিশ্চিত করা দরকার। নয়তো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে আসবে। এরই মধ্যে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমের কারণে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে না।
একটি দেশের বেশির ভাগ কর্মসংস্থান গড়ে ওঠে বেসরকারি খাতে। একসময় শিক্ষিত তরুণ সমাজ বেসরকারি চাকরির প্রতি আকৃষ্ট ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় গত কয়েক বছরে সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে বহু গুণ। চাকরিপ্রত্যাশী মানুষের পছন্দের শীর্ষে তাই উঠে এসেছে সরকারি চাকরি। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট বিচারে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যার তুলনায় সরকারি খাতে কর্মসংস্থান, বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা দুঃসাধ্য কাজ। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়, দেশে গত পাঁচ বছরে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি না বাড়লে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সংকুলান করা আগামীতে আরো কঠিন হবে। আর পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকার অর্থ হলো দেশে বেকারত্ব বাড়তেই থাকবে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।










