বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ এত কম কেন, বাংলাদেশে কেন বিদেশী বিনিয়োগ আসে না, এ আলোচনা যখন করা হয়, তখন সবসময়ই বলা হয় গ্যাস ও বিদ্যুতের স্বল্পতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, পোর্টের সমস্যা ইত্যাদি। কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে এমন আরো একটি ফ্যাক্টর রয়েছে যা কোনো একাডেমিক লিটারেচারে কখনো আলোচিত হয় না। অথচ এ ফ্যাক্টর খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এ ফ্যাক্টরের সহজলভ্যতা ছাড়া একটি দেশে অন্য সব নিয়ামক পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলেও তা বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রত্যাশিত ফল নিয়ে আসবে না। বিষয়ের গভীরে যাওয়ার আগে আমরা বাংলাদেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ নিয়ে বাস্তব কিছু তথ্য দিতে চাই।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যেসব দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে তা মূলত কয়েকটি শহরকে কেন্দ্র করে। যেমন বাংলাদেশের মূল শিল্পাঞ্চলগুলো মূলত ঢাকার চারপাশে কিংবা চট্টগ্রামে। এ দুটি শহরের বাইরে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে খুবই কম। ঢাকা ও ঢাকার আশপাশে গাজীপুর, সাভার ও ভালুকা অঞ্চলে শিল্প গড়ে উঠেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কিছু শিল্প-কারখানা আছে। চট্টগ্রাম শহরে ও চট্টগ্রাম শহরের বাইরে সীতাকুণ্ডে শিল্প গড়ে উঠেছে। এখন কিছু শিল্প গড়ে উঠছে মিরসরাইয়ে। এর বাইরে নারায়ণগঞ্জে রয়েছে কিছু শিল্প। খুলনা, হবিগঞ্জ ও বগুড়ায় কিছু শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। এছাড়া সারা দেশে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন চালকল, পোলট্রি ইত্যাদি। তবে ভারী শিল্প বলতে যা বোঝায় তা মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক।

এখন প্রশ্ন হলো, এ ধরনের শহরকেন্দ্রিক শিল্প স্থাপনের প্রবণতার কারণ কী? গ্যাসের সহজলভ্যতা যদি শিল্পকে প্রভাবিত করে তাহলে সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চলে শিল্প এলাকা গড়ে ওঠার কথা ছিল। কারণ বাংলাদেশের অন্যতম গ্যাস ক্ষেত্রগুলো এ দুটি জেলায় অবস্থিত। কিন্তু এ দুটি জেলায় শিল্পায়নের হার খুবই কম। আবার যমুনা সেতু তৈরি হওয়ার পর প্রত্যাশা ছিল উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি।

বাংলাদেশের শিল্পায়নের এ শহরকেন্দ্রিক বাস্তবতা আরো বোঝা যাবে নিচের সারণিটির দিকে তাকালে। এখানে দেখানো হয়েছে দেশের ইপিজেডগুলোয় শিল্পায়নের পরিস্থিতি। সারণিতে দেখা যাচ্ছে, দেশের সবচেয়ে পুরনো দুটি ইপিজেড চট্টগ্রাম ও ঢাকায়, যা স্থাপিত হয়েছিল যথাক্রমে ১৯৮৩ ও ১৯৯৩ সালে; সেখানে সবচেয়ে বেশি শিল্পায়ন হয়েছে।

inside

আমরা শিল্পায়নের প্রবণতা বোঝাতে ইপিজেডগুলোয় প্রতি একরে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনা করেছি। এ তুলনায় দেখা যাচ্ছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম ইপিজেডে প্রতি একরে বিনিয়োগ হয়েছে ৪ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

এ দুটি ইপিজেড দেশের সবচেয়ে পুরনো ইপিজেড। তাই এ দুটি ইপিজেডে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত। কিন্তু সারণিতে দেখা যাচ্ছে, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েও কর্ণফুলী ও আদমজী ইপিজেডে অন্য ইপিজেডগুলোর চেয়ে বিনিয়োগ অনেক বেশি এসেছে। যেমন মোংলা ইপিজেড তৈরি হয়েছে ১৯৯৮ সালে। কিন্তু সেখানে একরপ্রতি বিনিয়োগ মাত্র দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার।

আবার নীলফামারীতে উত্তরা ইপিজেড তৈরি হয়েছে ২০০১ সালে, কিন্তু সেখানে বিনিয়োগ হয়েছে একরপ্রতি মাত্র ১ দশমিক শূন্য ৯ মিলিয়ন ডলার। কুমিল্লা ইপিজেড তৈরি হয়েছে ২০০০ সালে। কিন্তু সেখানে একরপ্রতি বিনিয়োগের পরিমাণ ঢাকা, চট্টগ্রাম, কর্ণফুলী ও আদমজী ইপিজেড থেকেও কম। এখানে বলা দরকার, কর্ণফুলী ইপিজেড চট্টগ্রামে ও আদমজী ইপিজেড ঢাকার কাছে অবস্থিত।

এখানে একটি প্রবণতা দৃশ্যমান। সেটা হলো বাংলাদেশে দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে মূলত দুটি শহরকে কেন্দ্র করে। সেটা হলো ঢাকা ও চট্টগ্রাম। এর বাইরে বিনিয়োগ বেশি হয়নি।

তাহলে এর কারণ কী?

এর কারণ হিসেবে আমি মনে করি, বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পোর্ট ইত্যাদি যতটা প্রয়োজনীয়, নগরকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধা ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।

একটি শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার জন্য শ্রমিকের আবাসনের প্রয়োজন হয়। সেই সঙ্গে প্রয়োজন হয় কর্মকর্তাদের আবাসনও। কর্মকর্তারা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে শিল্প-কারখানার আশপাশে থাকেন। তাই শিল্প-কারখানার আশপাশে যদি ভালো মানের বাড়িঘর, স্কুল, কলেজ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুবিধা না থাকে তাহলে শিল্প মালিকরা সেই জায়গায় শিল্প-কারখানা গড়তে আগ্রহী হন না।

আবার কোনো শ্রমিক বা কর্মকর্তা যদি হঠাৎ করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে যান, তার জন্য ধারেকাছে মানসম্পন্ন হাসপাতাল থাকতে হবে। সবসময় তো দূরবর্তী হাসপাতালে নেয়া সম্ভব নাও হতে পারে। একটি শিল্প-কারখানার মালিক বা সিইও হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন তাহলে তার কি দূরের শহরে যাওয়ার সময় হবে? হবে না। তিনি তো তার আগেই মারা যাবেন।

তাই এসব জটিলতা এড়াতে শিল্প মালিকদের অগ্রাধিকার থাকে এমন জায়গা যা শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এটা দেশীয় মালিকদের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মূলত এ কারণেই বাংলাদেশে অধিকাংশ বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম ইকোনমিক জোনগুলোয়। মোংলা, নীলফামারী কিংবা কুমিল্লায় এ বিদেশী বিনিয়োগ বেশি হয়নি। একই কারণে আমরা সিলেট কিংবা কুমিল্লায় শিল্প বিনিয়োগ বেশি দেখি না।

বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের সঙ্গে যেসব দেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যেমন ভিয়েতনাম, চায়না, কোরিয়া—সব দেশেই নগর পরিকল্পনা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক উন্নত। বাংলাদেশের যেকোনো ইকোনমিক জোন পরিকল্পিত করে তৈরি হলেও এর বাইরে যে শহর রয়েছে, তা খুবই অপরিকল্পিত।

বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে গিয়ে সরকার ইকোনমিক জোনগুলোয় নগরকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধা কতটুকু দিচ্ছে, তা এখন আমরা দেখব।

সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশ সরকার চট্টগ্রামের কাছে মিরসরাইতে National Special Economic Zone তৈরি করছে। এটি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইকোনমিক জোন। এর আয়তন প্রায় ৩৩ হাজার ৮০৫ একর। এখানে যেসব ফ্যাসিলিটি রয়েছে, তা হলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্লট; ৪৫টি ছয়তলা শিল্প ভবন; ১০ তলা আবাসিক ভবন; হোটেল; ইনভেস্টরস ক্লাব; গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সুবিধা; বিদেশীদের জন্য দুই হাজার স্বতন্ত্র আবাসন; নারী কর্মকর্তাদের জন্য ১ হাজার স্বতন্ত্র আবাসন; সোলার সিস্টেম; ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট; বন্ডেড ওয়্যারহাউজ; ফায়ার স্টেশন ও জোরালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

সরকার এ ইকোনমিক জোনে অনেক সুযোগ-সুবিধা দিলেও নগরকেন্দ্রিক অনেক সুযোগ-সুবিধা কিন্তু এখানে নেই। তাই মানসম্মত বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সরকারের দেয়া এ সুবিধাগুলো পর্যাপ্ত নয়। এ সেবাগুলোর বাইরেও এ জোনগুলোয় আরো কিছু সেবা থাকা দরকার। সেগুলো হলো: এ জোনে থাকতে হবে একটি আধুনিক হাসপাতাল; একটি আন্তর্জাতিক মানের বিদ্যালয়; আন্তর্জাতিক মানের শপিং মল; একটি এয়ারপোর্ট যেখান থেকে ব্যক্তিগত প্লেনে সরাসরি বিদেশে যাওয়া যাবে; একটি পোর্ট; খেলার মাঠ এবং পার্ক; হারবার যেখানে বিভিন্ন ব্যক্তিগত নৌযান রাখা যাবে; সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য একটি কনভেনশন হলো; ডে-কেয়ার সেন্টার ও মসজিদ।

একটি বৃহৎ আকারের বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের শ্রম। এদের মধ্যে যেমন রয়েছেন সাধারণ শ্রমিক, তেমনি রয়েছে অতি উচ্চ বেতনের সিইও, সিএফও, ডিরেক্টর ও ম্যানেজার পদের অসংখ্য পেশাজীবী যাদের অনেকেই আসবেন বিদেশ থেকে। তারা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে থাকবেন।

তাই তাদের প্রয়োজনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারকে তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনের কথাও ভাবতে হবে। তা না হলে অনেক বিদেশী বিনিয়োগ সবার অলক্ষ্যে অন্যত্র চলে যাবে। সবাই মনে করবে দুর্বল সুশাসন পরিস্থিতির জন্য বড় বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসেনি। কিন্তু বিনিয়োগ না আসার পেছনে যেসব মূল কারণ রয়েছে তার কথা কেউ জানবে না।

মাবরূর মাহমুদ: আইডিয়াজ ফর ডেভেলপমেন্টের (আইএফডি) প্রতিষ্ঠাতা