বৈশ্বিক দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা অনিবার্য বলে আমি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছি। আর এখন এর প্রকৃত চাপ অনুভূত হতে শুরু করেছে।

এতদিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নিয়ে উদ্বেগকে তেমন গুরুত্ব দেননি। সম্প্রতি দেশটির সরকারি ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেলেও তিনি বিষয়টিকে বড় কোনো সমস্যা হিসেবে দেখেননি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধি এতটাই শক্তিশালী হবে যে উল্লেখযোগ্য হারে কর বাড়ানো কিংবা সরকারি ব্যয় কমানো ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র সহজেই ঋণের সুদ পরিশোধ করতে পারবে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশও যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ জোগান দিয়ে যেতে আগ্রহী থাকবে। কিন্তু বেসেন্ট যদি সত্যিই এমনটা বিশ্বাস করেন, তাহলে সরকারি ঋণের মেয়াদ কাঠামোয় পরিবর্তন এনে বন্ডবাজারে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন কেন?

বাজার এখন যে প্রথম পদক্ষেপটি দেখতে চাইছে, সেটি হলো মূল সমস্যার সমাধানে এগিয়ে যাওয়া, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ফেডারেল বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনা। বর্তমানে দেশটির বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ। বেসেন্ট বারবার বাজারকে আশ্বস্ত করেছেন যে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক ঋণগ্রহণ সাময়িক। তার দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রবৃদ্ধি বিপুল পরিমাণ কর-রাজস্ব সৃষ্টি করবে এবং অচিরেই বাজেট ঘাটতি কমিয়ে জিডিপির তুলনায় কিছুটা সহনীয় ৩ শতাংশে নামিয়ে আনবে।

এমনটা ঘটতে পারে। কিন্তু ঋণ ও বাজেটের ওপর চাপ থেকে কোনো ধরনের কষ্ট ছাড়াই বেরিয়ে আসা সম্ভব—এমন ধারণা যে বাস্তবতার চেয়ে কল্পনাপ্রসূত, তার অনেক কারণ রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো, এআই থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর শ্রম আয় থেকে কর আদায়ের তুলনায় কর আরোপ করা সম্ভবত অনেক বেশি কঠিন হবে। একই সময়ে, বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার ব্যয়, অনিবার্য বলে মনে হওয়া সামরিক ব্যয়ের বড় ধরনের বৃদ্ধি এবং আরো বেশি সরকারি ব্যয়ের জন্য তীব্র জনতুষ্টিবাদী চাপ—সবকিছুর ব্যয় সম্ভবত রাজস্ব বৃদ্ধির চেয়ে অন্তত সমান গতিতে বাড়বে।

পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলছে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ওপর অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বা উচ্চতর সুদের হার। বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের যে ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ রয়েছে, এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশই এতদিন এসেছে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের বিশেষ মর্যাদা থেকে। কিন্তু সেই সুবিধা এখন অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে। অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির সরকারি ঋণের তুলনায় মার্কিন ঋণ আর বিশেষ কোনো নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বাজারে লেনদেন হচ্ছে না। ফলে সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতিতেও ডলারের আধিপত্যের মূল্য কমে যাচ্ছে। আর যদি শেষ পর্যন্ত বাজেটের ওপর চাপ একটি সংকটের জন্ম দেয়, তাহলে বৈশ্বিক বাজারে ডলারের অংশীদারত্ব দ্রুত কমে যেতে পারে, যে পতন অন্যথায় ঘটতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারত।

তাহলে ট্রেজারি বিভাগের কী করা উচিত? বেসেন্ট ভালোভাবেই জানেন, পাঠ্যবইয়ের উত্তর হবে—বড় ধরনের বাজেট সমন্বয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তবে এর অর্থ ২০২৫ সালে ইলোন মাস্ক ও তার ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি বা ডিওজিইর অনুসারীরা যে ধরনের অপরিকল্পিত, কঠোর ও এলোমেলো ব্যয়ছাঁটাই করেছিলেন, তা নয়। বেসেন্টের সমস্যা হলো তার বস ট্রাম্প ভালোভাবেই বোঝেন যে মার্কিন করদাতারা কোনো ধরনের প্রকৃত কৃচ্ছ্রসাধন মেনে নিতে প্রস্তুত নন।

এ কারণেই বেসেন্টের বন্ড পুনঃক্রয়ভিত্তিক কৌশলের দিকে ঝুঁকে পড়া উদ্বেগজনক। কার্যত বেসেন্ট দীর্ঘমেয়াদি ঋণকে ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে তার জায়গায় স্বল্পমেয়াদি ঋণ বসানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, অনেকটা কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং বা পরিমাণগত শিথিলায়নের সময় ফেডারেল রিজার্ভ যেভাবে কাজ করে, সেভাবে। আতঙ্কের পরিস্থিতিতে এ ধরনের পদক্ষেপ যৌক্তিক হতে পারে, যখন দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার আবার কমে আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এ মুহূর্তে বাজারই যে আতঙ্কিত, তার পক্ষে খুব কমই প্রমাণ রয়েছে, বরং বিশ্বজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রকৃত সুদের হার বাড়ছে। এর অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির যে ব্যতিক্রমী অবস্থান ছিল, তা আর আগের মতো কার্যকর নেই—অন্তত একই মাত্রায় নয়।

বেসেন্ট বেশ কিছুদিন ধরেই বলে আসছেন, দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার অতিরিক্ত বেশি। তাই তার পছন্দ স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয়া, যাতে তিনি এমন একটি সুদের হার বৃদ্ধির ধাক্কা সামলে নিতে পারেন, যা তার বিশ্বাস অনুযায়ী শিগগিরই প্রশমিত হবে।

তিনি হয়তো সঠিকও হতে পারেন। অনেক খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছেন যে সুদের হার চিরকাল অতি নিম্ন পর্যায়ে থাকবে, তারাও এখনো মনে করেন বর্তমান উচ্চ সুদের হার একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত গবেষণাগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সুদের হার বৃদ্ধি বরং স্বাভাবিকীকরণ হিসেবে বিবেচনা করাই বেশি যুক্তিসংগত। দীর্ঘ মেয়াদে সুদের হার কমার চেয়ে বরং বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

জাতীয় ঋণ এখন ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এমন সময়ে বিনিয়োগকারীদের বলা যে ওই সংখ্যাটির মধ্যে ‘বিশেষ কিছু নেই’, তা মোটেই সমীচীন নয়। ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি, দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর বাড়তে থাকা চাপ, সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বোঝা যে অত্যন্ত বাস্তব উদ্বেগের বিষয়, তাতে সন্দেহ নেই।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, বন্ডবাজার নিয়ন্ত্রণে বেসেন্টের এ অদক্ষ ও কঠোরহস্ত প্রয়াস ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অর্থনৈতিক দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সদস্য হিসেবে তিনি যে সুনাম কঠোর পরিশ্রমে অর্জন করেছেন, সেটিকেই দুর্বল করছে। এখন পর্যন্ত বেসেন্ট ট্রাম্পকে তার কিছু যদিও সব নয় ক্ষতিকর প্রবণতা থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। শুল্কনীতি কিংবা ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান নিয়োগ, উভয় ক্ষেত্রেই তিনি এমনটি করেছেন।

অবশ্য ট্রাম্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কিছু ইস্যুতে তাকে নিজের অবস্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলতে হয়। তাকে বলতে হয়, যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ইরানকে পরাজিত করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ওলটপালট করার চেয়ে আর কিছুই মার্কিন শ্রমজীবী মানুষের বেশি উপকারে আসবে না। তা না হলে তাকে সঙ্গে সঙ্গেই বরখাস্ত করা হবে। কিন্তু বন্ডবাজারকে এত সহজে নিজের ইচ্ছামতো চালানো যায় না।

সাবেক বন্ড ব্যবসায়ী ও হেজ ফান্ড ব্যবস্থাপক বেসেন্ট গত শরতে আর্জেন্টিনার পেসোকে সমর্থন করে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছিলেন। গ্রীষ্মকালে অপ্রত্যাশিতভাবে জাপানি ইয়েনের পক্ষ নেয়ার ক্ষেত্রেও সম্ভবত তিনি খুব বেশি ক্ষতি করেননি, যদিও এর প্রভাব খুব দ্রুতই মিলিয়ে যায়। বিপরীতে, ট্রেজারির নেতৃত্বে তার কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি ঠেকাতে খুব একটা কার্যকর হয়নি। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে উল্লেখযোগ্য কোনো ঋণ হ্রাস ঘটবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব পরিস্থিতির গতিপথ নিয়ে বন্ডবাজারের গভীর সংশয় বজায় রাখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

[প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনূদিত]

কেনেথ রোগফ: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও জননীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং ২০১১ সালের ডয়চে ব্যাংকের ইন ফাইন্যান্সিয়াল ইকোনমিকস ক্যাটাগরিতে পুরস্কার বিজয়ী