এক দশক আগে ২০১৫ সালের ১২ মার্চ, মরিশাসে মরিশিয়ান স্পেসিফিকেশনের ভিত্তিতে গার্ডেন রিচ, কলকাতায় নির্মিত ঝলমলে অফশোর পেট্রোল ভেসেল ব্যারাকুডা কমিশনিংয়ের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের (আইওআর) প্রতি ভারতের নীতি উপস্থাপন করেন: সাগর অঞ্চলের সবার জন্য নিরাপত্তা ও উন্নয়ন। তিনি উল্লেখ করেন, ভারত মহাসাগর বিশ্বের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বিশ্বব্যাপী তেলের দুই-তৃতীয়াংশ শিপমেন্ট, এক-তৃতীয়াংশ বৃহৎ মালামাল এবং অর্ধেক কনটেইনার ট্রাফিক বহন করে। এর তীরবর্তী ৪০টি দেশ বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ জনসংখ্যার বাসস্থান।

সাগর নীতি পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে: ভারতের মূল ভূখণ্ড ও দ্বীপাঞ্চলের নিরাপত্তা এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের (আইওআর) নিরাপদ, সুরক্ষিত ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা; বিশেষ করে সামুদ্রিক প্রতিবেশী ও দ্বীপ রাষ্ট্রসহ আইওআরের মিত্রদের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা গড়ে তোলা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সেটা গভীর করা; সম্মিলিত কার্যক্রম ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা; সবার টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে আরো একীভূত ও সমন্বিত ভবিষ্যতের জন্য কাজ করা এবং আইওআরে সামুদ্রিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা, কারণ এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির প্রধান দায়িত্ব ওই অঞ্চলের বাসিন্দার ওপর ন্যস্ত। যদি সাগর ভারতের বহির্মুখী প্রচার হয়ে থাকে, তাহলে জাতীয় পরিপ্রেক্ষিতে এটি হলো সাগরমালা বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন উদ্যোগের পরিপূরক।

দীর্ঘ সময় ধরে ভারতকে তার মহাদেশীয় পক্ষপাতের জন্য সমালোচিত করা হয়েছে, অর্থাৎ এটি তার উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তগুলো বেশি মনোযোগ দিয়ে বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক স্বার্থকে উপেক্ষা করছিল। তবে এটি পরিবর্তিত হচ্ছে। ১৯৯২ সালে ‘লুক ইস্ট’ নীতি শুরু হওয়ার পর থেকে, যা ২০১৫ সালে প্রোঅ্যাক্টিভ ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে, ভারত তার সামুদ্রিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদি সম্রাট রাজেন্দ্র চোলের নৌবাহিনীর সাফল্যের এক হাজার বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি বিশেষ মুদ্রা প্রকাশ করেছেন।

ভারতীয় নৌবাহিনী সামুদ্রিক কূটনীতির ক্ষেত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগগুলো, যৌথ মহড়াগুলো, বহুপক্ষীয় সম্মেলন, মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ত্রাণ (এইচএডিআর) এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার (এসএআর) কার্যক্রমের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছে। ২০০৪ সালের সুনামি দুর্যোগ ত্রাণ কার্যক্রমে ভারতের সুনাম প্রতিষ্ঠা করে। ভারত আইওআরে, বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ক্ষেত্রে, প্রথম সাড়া প্রদানকারী ও নিট সুরক্ষা প্রদানকারী হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়। ২০০৮ সালে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় নার্গিসের পর মিয়ানমারে ভারতের দ্রুত সহায়তা এবং ২০১৪ সালের শেষে মালদ্বীপের মিঠা পানির সংকটে প্রথম দেশ হিসেবে পানীয় জল সরবরাহের মাধ্যমে এ ভাবমূর্তি আরো মজবুত হয়। গত মার্চে ভারত ভূমিকম্পে আক্রান্ত মিয়ানমারে বৃহৎ ত্রাণ ও উদ্ধার ‘অপারেশন ব্রহ্মা’ পরিচালনা করে।

ভারত এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি পছন্দের নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে উন্নীত হয়েছে, যেখানে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বগুলো কেবল যৌথ মহড়া ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, বরং অংশীদার রাষ্ট্রের অনুরোধে অনুদান হিসেবে বা প্রতিরক্ষা ক্রেডিট লাইনের আওতায় প্রতিরক্ষা সামগ্রীর রফতানিকেও অন্তর্ভুক্ত করে থাকে।

২০১১ সালে শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের সঙ্গে শুরু হওয়া ত্রিপক্ষীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বর্তমানে মরিশাস ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য ভারত মহাসাগরীয় দেশ পর্যন্ত সম্প্রসারণ হয়েছে, যেখানে সেশেলসকে পর্যবেক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ সহযোগিতা এখন কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ নামে পরিচিত, যার একটি চার্টার ও একটি সচিবালয় কলম্বোয় রয়েছে। ২০০৮ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর উদ্যোগে শুরু হওয়া ইন্ডিয়ান ওশান নেভাল সিম্পোজিয়াম (আইওএনএস) একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্লাটফর্ম, যা সামুদ্রিক বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং কার্যকর প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে থাকে। আইওএনএসে দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয়সহ ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্য থেকে ২৫টি অংশগ্রহণকারী দেশ রয়েছে, এছাড়া রয়েছে নয়টি পর্যবেক্ষক ও একটি পরিবর্তনশীল সভাপতি (ভারত ২০২৫ সালের শেষে সভাপতিত্ব গ্রহণ করবে)। মিলান ভারতীয় নৌবাহিনী আয়োজিত একটি দ্বিবার্ষিক বহুজাতিক মহড়া যা ভারতের সাগর ও অ্যাক্ট ইস্ট নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

সামুদ্রিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উন্নত সামুদ্রিক ক্ষেত্রবিষয়ক সচেতনতা। এ লক্ষ্যে ভারত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্বেত শিপিং চুক্তি অনুসরণ করছে (এখন পর্যন্ত ২২টি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে) এবং গুরগাঁওয়ে একটি আধুনিক ইনফরমেশন ফিউশন সেন্টার (আইএফসি-আইওআর) প্রতিষ্ঠা করেছে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক তথ্য বিনিময়কে সহজতর করছে।

ভারতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে উন্নয়ন সহযোগিতার, যা তার স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় থেকে শুরু হয়েছে। ভারতের উন্নয়ন সহযোগিতার দর্শন গঠিত হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রাম, অন্যান্য উপনিবেশিত ও উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে একাত্মতা এবং মহাত্মা গান্ধীর অনুপ্রেরণাদায়ক নেতৃত্ব দ্বারা, যিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘‌আমার দেশপ্রেমে সমগ্র মানবজাতির মঙ্গল অন্তর্ভুক্ত।’ এভাবেই ভারত তার উন্নয়নমূলক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা ‘বাসুধৈব কুটুম্বকম’ (প্রাচীন বিশ্বাস যে পৃথিবী একটি পরিবার) চেতনার সঙ্গে সহভাগিতা করে নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০১৮ সালে উগান্ডার সংসদে বক্তব্য প্রদানকালে বলেছিলেন, ‘‌আমাদের উন্নয়ন সহযোগিতা আপনাদের অগ্রাধিকার কর্তৃক পরিচালিত হবে, এটি এমন শর্তে হবে যা আপনাদের জন্য সুবিধাজনক হবে, যা আপনাদের সম্ভাবনাকে অবমুক্ত করবে এবং আপনাদের ভবিষ্যৎকে সীমাবদ্ধ করে রাখবে না...’ ভারতের উন্নয়ন সহযোগিতার মডেল ব্যাপক এবং এতে অনুদান, স্বল্পসুদের লাইন অব ক্রেডিট, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে, এটি শর্তহীন, স্বচ্ছ, টেকসই ও আর্থিকভাবে কার্যকর।

২০১৮ সালের জুনে, শাংরি – লা সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক দর্শন উপস্থাপন করেন। ভারতের জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক হলো একটি অবাধ, উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অঞ্চল, যা ‘‌আমাদের সবাইকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সাধারণ লক্ষ্যে একত্র করে।’ তিনি আসিয়ান কেন্দ্রিকতা, নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা, নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা, বাধাহীন বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ বিবাদ নিষ্পত্তির ওপর জোর দেন। ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও আসিয়ান ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুকের মধ্যে গভীর সাদৃশ্য বিদ্যমান। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ইস্ট এশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে ভারত ইন্দো-প্যাসিফিক ওশানস্‌ ইনিশিয়েটিভ (আইপিওআই) চালু করে, যা সাগর দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সাতটি ব্যবহারিক সহযোগিতার স্তম্ভ নিয়ে গঠিত একটি সুসংহত উদ্যোগ। কোয়াড-এ (অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ আমাদের ইন্দো-প্যাসিফিক দর্শনের অংশ। ২০১৪ সালে ভারত প্যাসিফিক দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা জোরদারের জন্য একটি কৌশলগত উদ্যোগ, ফোরাম ফর ইন্ডিয়া-প্যাসিফিক আইল্যান্ডস কো-অপারেশন (এফআইপিআইসি) প্রতিষ্ঠা করে।

২০২৩ সালে, যখন ভারত জি-২০-এর সভাপতিত্ব করছিল এবং তার মূল বিষয় ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলকতা, তখন আফ্রিকান ইউনিয়নকে এ গোষ্ঠীতে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ভারতের সভাপতিত্ব, অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বহুপাক্ষিকতাকে পুনর্জীবিত করেছে, বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করেছে এবং উন্নয়নের পক্ষে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এরপর থেকে ভারত তিনবার ভয়েস অব দ্য গ্লোবাল সাউথ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।

সাগর নীতির ১০ বছর পর, ২০২৫ সালে মরিশাসে একটি সরকারি সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি মহাসাগর (মিউচুয়াল অ্যান্ড হোলিস্টিক অ্যাডভান্সমেন্ট ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্রোথ অ্যাক্রস রিজিয়নস) নামে একটি আধুনিকীকৃত নীতি ঘোষণা করেন। যদি সাগর নীতি ‘সমুদ্র’ বোঝায়, তাহলে মহাসাগর হিন্দি ও অন্যান্য কয়েকটি ভারতীয় ভাষায় ‘মহাসমুদ্র’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। মহাসাগর নীতি কেবল ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতি কেন্দ্রীভূত নয়, বরং বৈশ্বিক সামুদ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক, যেখানে বিশেষভাবে বৈশ্বিক দক্ষিণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদির সাম্প্রতিক মরিশাস, মালদ্বীপ, ট্রিনিদাদ ও টোবাগো, ঘানা এবং এখন ফিলিপাইনের সঙ্গে যোগাযোগ মহাসাগর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সুচিত্রা দুরাই: থাইল্যান্ডে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত