রওনক জাহান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি লাভ করেন তিনি। জাতিসংঘের এশিয়া-প্যাসিফিক ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কুয়ালালামপুর) ও ইন্টারন্যাশনাল লেবার অফিসে (জেনেভা) নারী বিষয়ক কর্মসূচির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার গবেষণার বিষয় হচ্ছে রাজনীতি, শাসন, নারী, উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য। বর্তমানে তিনি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পূর্বাপর নানা ইস্যু নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

কোন কোন প্রেক্ষাপটে বা কার্যকারণে আপনার মনে হলো, পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের বিচ্ছেদটা অনিবার্য একটি পরিণতি? 

যখন বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তখন আমাদের প্রজন্ম স্কুলে পড়ে। আমরা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ওপর ক্রমাগত হতাশ, বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। এক পর্যায়ে মনে হয়েছে, বিচ্ছেদটি অনিবার্য। কয়েকটি মাইলফলক সম্পর্কে আমি আমার বই ‘‌পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইনটিগ্রেশনে’ লিখেছি, যা এখন সবাই ইতিহাসের বইতে পড়ে, কিন্তু এসবের আমরা নিজেরাই প্রত্যক্ষদর্শী। 

আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন শুনলাম বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনে ঢাকায় ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছে। অথচ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা আমাদের ন্যায্য দাবি ছিল। তখন আমাদের মনে হলো, পাকিস্তানি সরকার তো আমাদের সঙ্গে অত্যন্ত অন্যায্য ব্যবহার করছে। তার পরেই হলো ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, যেখানে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। কিন্তু কয়েক মাসের মাথায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। নির্বাচিত সরকারের ন্যায্য অধিকার ছিল দেশ শাসন করার। 

আসলে ১৯৫০-এর দশক থেকেই আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন ক্রমেই বেগবান হতে থাকে। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি তখন থেকেই আমরা করতে থাকি। 

তারপর যখন একটা জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে এবং আমরা বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে সরকার গঠনের একটা সুযোগ পাওয়ার কথা তখনই আবার হয়ে গেল ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল। এর মাধ্যমে সব ধরনের রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেয়া হলো। তখন আরেকটি ধাক্কা। আমরা লক্ষ করলাম, আমরা যতই গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করি না কেন, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে আমাদের দাবিয়ে রাখছে। 

তারপর ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন শুরু হলো। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম থেকেই আমরা চেয়েছিলাম, যেহেতু বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখব। তার সঙ্গে যেহেতু আমাদের একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রয়েছে, তাই আমাদের এখানে স্বায়ত্তশাসনও থাকবে। অতএব, একসঙ্গে আমাদের দুটো দাবিই ছিল। কিন্তু ক্রমেই আমরা বুঝতে পারছিলাম যে কেন্দ্রে শাসন করার চেয়ে আমাদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা করাটাই জরুরি। তাই ছয় দফার যে দফাগুলো ছিল, যেখানে অর্থনীতিকে একদম আলাদা করে দেয়ার কথা বলা হয়েছিল, তা এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। এরপর ১৯৬৬-৭০ মাত্র চার বছরে আমাদের জনসাধারণের মনোভাব খুব দ্রুত পাল্টে গেল। 

এ বিষয়ে এর আগে আরেকটি সাক্ষাৎকারে আমি বলেছি, ১৯৬৫ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যখন যাই তখন আইয়ুববিরোধী শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন, শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল। কিন্তু তখনো এ দেশের জনগণের মধ্যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মনোভাব লক্ষ করিনি। স্বাধীন হওয়ার ইচ্ছা রাজনীতিতে হয়তো যারা তরুণ নেতৃস্থানীয় বা কিছু বুদ্ধীজীবী ছিলেন তারা চিন্তা করছিলেন। 

কিন্তু মাত্র তিন বছর পর যখন ১৯৬৮ সালে আমি আমার থিসিসের কাজের জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজে দেশে ফিরলাম তখন দেখলাম আমাদের দেশের সাধারণ মানুষও ভাবছে পাকিস্তানের সঙ্গে আর থাকা যাবে না। তখন আমার মনে হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা আসলেই তো একটা সময়ের ব্যাপার। পাকিস্তান কবে ভেঙে যাবে সেটা আমি জানি না। কিন্তু পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। কারণ আমরা আইনসম্মত ও গণতান্ত্রিকভাবে যা-ই চাই বা চেষ্টা করছি, আইনসম্মত দাবিগুলো বলতে ও আদায় করতে কিছুতেই পারছি না। অতএব পাকিস্তানের সঙ্গে তো আর একসঙ্গে থাকা যাবে না। আমার হার্ভার্ডের থিসিস যেটা আমি শেষ করেছিলাম ১৯৬৯ সালে, যা পরে ‘পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইনটিগ্রেশন’ শিরোনামে ১৯৭২ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেস থেকে প্রকাশ হয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশ স্বাধীনতা হওয়ার আগেই খুব স্পষ্টভাবে বিভাজনের এ ইঙ্গিত দিয়েছিলাম। 

পাকিস্তান আমলে দুটো নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনগুলো নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

পাকিস্তান আমলে আমরা দুটো নির্বাচন দেখেছি, যেখানে জনগণ সরাসরি ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ছিল প্রাদেশিক নির্বাচন, যেখানে প্রথম সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ ভোট দেয়ার অধিকার পায় এবং তারা তখন মুসলিম লীগকে প্রত্যাখ্যান করে। এ নির্বাচনের পর ১৯৭০ সাল পর্যন্ত আর কোনো প্রত্যক্ষ নির্বাচন দেয়নি পাকিস্তান। তারা ভেবেছিল আবার নির্বাচন দিলে পূর্ব বাংলার জাতীয়তাবাদী শক্তি ভোটে জয়ী হবে। 

জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করেন। তারপরে আইয়ুবের শাসনকালে মৌলিক গণতন্ত্র চালু হয়, যেখানে জনগণকে পরোক্ষ ভোটের অধিকার দেয়া হয়েছিল। এরপর ১৯৭০ সালে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানে প্রত্যক্ষ ভোটে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যখন সাধারণ মানুষকে সরাসরি ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়া হলো তখন দেখা গেল তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের বিপক্ষে এবং বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের পক্ষে ভোট এল। 

প্রশ্ন হলো ইয়াহিয়া খান কেন ১৯৭০ সালে প্রত্যক্ষ নির্বাচন দিতে রাজি হলেন? তিনি তো সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি কেন আইয়ুব খানের প্রদর্শিত পথে হাঁটলেন না? এখানে বুঝতে হবে, ১৯৬৯-এ গণঅভ্যুত্থান এবং বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি  দেখে ইয়াহিয়া ভেবেছিলেন এখন আর বাঙালিদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা যাবে না। তাদের সঙ্গে আলোচনা ও কিছুটা সমঝোতা করতে হবে। এছাড়া পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের কিছু নেতা ইয়াহিয়াকে পরামর্শ দিয়েছিল যে বাঙালিরা এতটা ঐক্যবদ্ধ নয়। তাদের অনুমান ছিল, পাকিস্তানপন্থী দলগুলো কিছু আসন পাবে এবং নির্বাচনে হয়তো আওয়ামী লীগ এত আসন পাবে না। পাকিস্তানপন্থী কিছু নেতাকে নিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে দমিয়ে রাখা যাবে। অতএব নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে কোনো আপত্তি নেই। কারণ কিছু বাঙালি নেতাকে হাত করলে ক্ষমতা আওয়ামী লীগের কাছে দিতে হবে না। কিন্তু সত্তরের জাতীয় নির্বাচনে দুটি ছাড়া সবক’টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করবে সেটা তারা কখনই ভাবেনি। এটা কিছুটা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা যে তারা বাংলাদেশের জনসাধারণের মনোভাব সঠিক বুঝতে পারেনি।

৫০-৬০-এর দশকে কিছু বামপন্থী দল অনেক শক্তিশালী ছিল। ছয় দফা আন্দোলন তৎপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শক্তিশালী নেতা হিসেবে দাঁড়ান। কীভাবে বামপন্থী দলগুলো দুর্বল হয়ে গেল আর আওয়ামী লীগ একক মুখপাত্র হয়ে গেল? 

কোনো একটি সময়ে জনসাধারণের মনে কোন ইস্যুটা প্রধান ইস্যু হয় তা ধরতে পারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। ১৯৫৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে বামপন্থীরা যখন আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করে তখন তারা বেশ শক্তিশালী ছিল। তখন দেশে অনেক শক্তিশালী বামপন্থী ছাত্রসংগঠন ছিল যেমন ছাত্র ইউনিয়ন। কিন্তু ১৯৬৬ সালের পর থেকে জনমনে বাংলাদেশের স্বাধিকার প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় বামপন্থীদের মধ্যে অনেক বিভাজন চলছিল; কেউ ছিল চীনপন্থী আবার কেউ রুশপন্থী। যখন দেশের মানুষের প্রধান চাওয়া ছিল স্বাধিকার ও স্বাধীনতা, তখন দেশের মানুষের মনের প্রধান ইস্যুকে বিবেচনা না করে তারা পাকিস্তান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছিল। এখানে আমি বলব, তখন বামপন্থীরা একটা ভুল হিসাব করেছিল। তারা স্বাধিকার ইস্যুকে একমাত্র ইস্যু হিসেবে গণ্য না করাতে মাত্র চার-পাঁচ বছরে পুরো দেশের ওপর বঙ্গবন্ধুর নিয়ন্ত্রণ ও ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা পায়।

বঙ্গবন্ধু যখন আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট হলেন এবং ছয় দফার আন্দোলন শুরু করলেন তখন তিনি এ দেশের মুক্তিকামী জনসাধারণকে একত্র করতে পারলেন। মানুষের মধ্যে এ উপলব্ধি হলো যে আমাদের পিছিয়ে থাকা, আমাদের দরিদ্রতা মূলত পাকিস্তানিদের শোষণ-বঞ্চনার কারণে। 

একাত্তরের উত্তাল মার্চের কোন কোন স্মৃতি আপনার মনে হয়? 

তখন আমি বিদেশ থেকে ফেরত এসে সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছি। আমার প্রথম স্মৃতি জাতীয় পরিষদের সভা মুলতবি করে দেয়ার পর দেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে পড়ার দৃশ্য। স্বাধীনতার পক্ষে হাজার হাজার লোক প্রতিদিন রাস্তায় মিছিল করছে মার্চের ২-৩ তারিখ থেকে। কিন্তু সবই শান্তিপূর্ণ। কোনো অরাজকতা নেই। মানুষ একদম একত্রিত। এ ধরনের ম্যাস-মবিলাইজেশন দেখা—এটা আমার প্রথম স্মৃতি। আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশোর বিখ্যাত বই দ্য সোশ্যাল কনট্র্যাক্টে আলোচিত ‘জনগণের ইচ্ছা’র কথা পড়েছি। এটা ছাত্রদেরও পড়াতাম। ওই সময় আমি নিজের চোখে দেখেছি, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষে একটা ‘সাধারণ ইচ্ছা’ সৃষ্টি হয়েছে। সেটা তখন আমার নিজের চোখে প্রতীয়মান। একটা বিষয় বইতে পড়া আর নিজের চোখে দেখা দুই রকমের অভিজ্ঞতা। 

এরপর দ্বিতীয় স্মৃতি বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ। আমরা তখন ভাবছি, কী হতে যাচ্ছে, সাতই মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে দেয়া হবে নাকি? আমি তখনকার রেসকোর্স, যাকে এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বলা হয়, সেখানে গেলাম বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য। সেখানে হাজার হাজার লোক বসে আছে। কোনো জায়গায় অনেক লোক থাকলে অনেক সময় গোলযোগ হয়, কিন্তু সবচেয়ে অভূতপূর্ব বিষয় হচ্ছে, সেখানে কোনো ধরনের গোলযোগ নেই। একদম শান্তিপূর্ণভাবে মানুষ অবস্থান করছে। আমার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সেই অভূতপূর্ব ভাষণ শোনা, যার স্মৃতি এখনো অম্লান। 

তৃতীয় স্মৃতি ২৩ মার্চের দিন স্বাধীনতার পতাকা ওড়ানোর। আমরা নিজের বাসায় বসে স্বাধীনতার পতাকা নিজেরাই তৈরি করেছিলাম। এ পতাকার মধ্যে বাংলাদেশর মানচিত্র ছিল। ২৬ তারিখে এ পতাকাকে আমাদের নামাতে হয়েছিল। কিন্তু পতাকাকে আমরা ফেলে দিইনি। লুকিয়ে রেখেছিলাম। ততদিনে আমরা জানতাম যে দেশ একদিন স্বাধীন হবে এবং যখন স্বাধীন হবে তখন আবার এ পতাকা ওড়াব। 

অবশ্যই মার্চের সবচেয়ে মর্মান্তিক স্মৃতি ২৫ মার্চের রাতের গণহত্যার এবং তার পরবর্তী দিনগুলোর। ২৫ মার্চ রাত্রে আমাদের এলিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকেই আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিলখানায়, তখনকার ইপিআরের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের শব্দ শুনেছি। বাবুপুরা বস্তি পুড়িয়ে দেয়ার পর আকাশে আগুন দেখেছি। মানুষের আর্তনাদ শুনেছি। তারপর ২৭ মার্চের পর থেকে হাজার হাজার মানুষকে ঢাকা ছেড়ে যেতে দেখেছি। এসব স্মৃতি কখনই ভোলার নয়। 

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক পরাশক্তিদের ভূমিকা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? বিশেষ করে ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার ভূমিকা?  

ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। ভারতের সাহায্যটা আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। ১৯৭১ সালে ভারত মানবিকভাবে আমাদের শরণার্থীদের সাহায্য করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেছে। ভারত সরকারি পর্যায়ে রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের মিত্র দেশগুলোর সমর্থন অর্জনে সাফল্য লাভ করেছিল। সবশেষে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিসেম্বরে যখন সম্মুখযুদ্ধ শুরু হলো তখন ভারতীয় সৈন্যরা আমাদের সঙ্গে অংশ নিয়ে আমাদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের সহযোগিতা ও সমর্থন ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য বাংলাদেশের জন্ম ভারতের জন্যও ইতিবাচক হয়েছে। ভারতের পূর্ব দিকে একটি বন্ধুভাবাপন্ন দেশ সৃষ্টি হলো।

১৯৭১ সালে ভারত, রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সরকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা ও সমর্থন জানিয়েছিল। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, মুসলিম বিশ্ব আমাদের বিরোধিতা করেছিল।

যেহেতু আমাদের আন্দোলন ছিল গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ এবং সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও পশ্চিম পাকিস্তানিরা জনগণের ম্যানডেটের প্রতি সম্মান না দেখিয়ে আমাদের আক্রমল করল তখন কেউ কেউ ভেবেছিল যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ উদার গণতান্ত্রিক বিশ্ব আমাদের পাশে থাকবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সরকার তখন পাকিস্তানের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টায় ছিল। তাই ১৯৭১ সালে নিক্সন সরকার পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। কিন্তু মার্কিন অনেক কংগ্রেসম্যান ও সিনেটর বাংলার মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন। দেখা গেছে পশ্চিমের গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সরকারি পর্যায়ে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া ছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আরেক ধরনের প্রতিক্রিয়া ছিল। সরকারি পর্যায়ে সমর্থন না পেলেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সাধারণ মানুষের সমর্থন পেয়েছিল। মনে রাখতে হবে পশ্চিমা গণমাধ্যম পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত জেনোসাইড নিয়ে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করে আমাদের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছে। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র যতই হুমকি-ধমকি দিক, সপ্তম নৌবহর পাঠাবে এসব বলুক কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি। চীনের কাছ থেকে সহায়তা আসবে পাকিস্তানি জান্তাদের এ রকম প্রত্যাশাও বাস্তব রূপ পায়নি।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের কাছে কী কী চ্যালেঞ্জ ছিল?

যখন আমরা স্বাধীন হই তখন তো আমরা একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। সেখানে আমাদের অবকাঠামো বিশেষ করে রাস্তাঘাট ও ব্রিজ সমস্ত কিছুই ভাঙা। ভারতে যারা শরণার্থী ছিল তারা দেশে ফেরত এসেছে। দেশের ভেতরে অনেক বাস্তুচ্যুত লোক ছিল যারা শহর থেকে গ্রামে চলে গিয়েছিল, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গেছে, তারা ফিরছে। আমাদের অর্থনীতি ছিল বিধ্বস্ত। আমাদের যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল সেগুলো অবাঙালিদের হাতে ছিল। স্বাধীনতার পর অবাঙালিরা চলে গিয়েছিল। অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোর পুনর্গঠন ছিল একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। 

আরেকটি চ্যালেঞ্জ ছিল নতুন রাষ্ট্র গঠন করা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ছিল দুর্বল। বেশির ভাগ সরকারি কর্মচারীর অভিজ্ঞতা ছিল প্রাদেশিক সরকার চালানোর। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার অভিজ্ঞতা ছিল না। সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা পাকিস্তানে আটক ছিলেন। যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তারা ছিলেন আপেক্ষাকৃতভাবে জুনিয়র। 

দেশে তখন কিছুটা বিশৃঙ্খল অবস্থা ছিল। সেনাবাহিনী ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভাজন ও নানাবিধ কোন্দল ছিল। আওয়ামী লীগের ভেতরেও কোন্দল ছিল। আবার আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কোন্দল ছিল। অনেক বামপন্থী সহিংস কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে ফেরত আসার আগ পর্যন্ত অনেক মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র সমর্পন করতে চাননি। বঙ্গবন্ধু ফেরত আসার আগ পর্যন্ত কেউ কারো কথা শুনছিল না। একমাত্র বঙ্গবন্ধু যখন ফেরত এলেন তখন সবাই আশ্বস্ত হলো যে তিনি একমাত্র নেতা যার কথা সবাই শুনবে।  

স্বাধীনতার পর প্রথম দিকে দেশের বাইরের লোকজন ভাবত এখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকবে না, সরকার ব্যবস্থা টিকে থাকবে না, গৃহযুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে ইত্যাদি। কিন্তু রাতারাতি না হলেও আমরা সেসব সমস্যা মোকাবেলা করেছি। গত ৫৩ বছরে ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসন, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসন গড়ে তোলা এসব সমস্যার অনেকগুলোর কিছু সমাধান আমরা করতে পেরেছি।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী বছরগুলোয় সোভিয়েত ঘেঁষা সোশ্যালিস্ট পলিসি বাংলাদেশকে বিপথে নিয়েছে। আপনি কী মনে করেন? 

আমি পুরোপুরি এ মতের বিপক্ষে। সোশ্যালিস্ট পলিসি বলতে হয়তো তারা স্বাধীনতা-পরবর্তী জাতীয়করণ নীতিকে বোঝাচ্ছেন। আমি মনে করি এ সম্পর্কে মানুষের ধারণাটাই ভুল। মনে রাখতে হবে স্বাধীনতার আগে আমাদের এখানে যত ব্যবসায়ী পরিবার ছিল তারা বেশির ভাগই ছিল অবাঙালি। স্বাধীনতার পর তারা বাংলাদেশ থেকে চলে গিয়েছিল। তখন ফেলে যাওয়া ওই ব্যবসাগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিতে হয়েছে। স্বাধীনতার আগে বাঙালি উদ্যোক্তা শ্রেণী ছিল খুবই ছোট। পাকিস্তানের সবচেয়ে ধনী ২২ পরিবারের মধ্যে মাত্র একটি ছিল বাঙালি পরিবার—চট্টগ্রামের এ কে খানের পরিবার। ব্যবসা-বাণিজ্য চালানোর মতো তো কোনো উদ্যোক্তা শ্রেণী তখনো গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জাতীয়করণ করা ছাড়া সরকারের তো আর কোনো উপায় ছিল না। 

রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে কি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে একে একে মিলিটারি ক্যুগুলো হয়েছিল?

রাজনৈতিক ব্যর্থতার কোরণে মিলিটারি ক্যু হয়েছে আমি এমনটা মনে করি না। স্বাধীণতা-পরবর্তী সময়ে প্রথমে কোনো প্রতিষ্ঠানই তেমন শক্তিশালী ছিল না। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ছিল অন্তর্দ্বন্দ্ব। সামরিক বাহিনীর মধ্যেও অনেক দ্বিধাবিভক্তি ছিল। আমাদের সামরিক বাহিনী তখনো শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়নি। চেইন অব কমান্ড সুসংহত হয়নি। সে কারণে একের পর এক ক্যু সংঘটিত হয়েছে। রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে ক্যুগুলো হয়েছে এমনটা না। সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা ছিল, উচ্চাভিলাষ ছিল, সে কারণে ক্যু হয়েছে।

কেউ কেউ বলেন, আমাদের চারটি মূলনীতির কোনো কোনোটি একে অন্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আপনি কী মনে করেন? 

আমি তেমন সাংঘর্ষিক দেখি না। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সবই একে অন্যের সম্পূরক। পৃথিবীর সবচেয়ে গণতান্ত্রিক হলো নর্ডিক দেশগুলো। এসব দেশে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র একই সঙ্গে উপস্থিত। তারা যে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হতে পেরেছে তার কারণ সেখানে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সমন্বয় হয়েছে বলেই। 

আপনি কি এখনো বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হবে? 

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হওয়া প্রয়োজন। কারণ সেটাই ছিল ১৯৭১ সালে আমাদের স্বপ্ন। বাংলাদেশের পক্ষেও নর্ডিক দেশগুলোর মতো কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হওয়া সম্ভব। আমি এখনো স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশ সেরকম রাষ্ট্র হবে।