‘কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি’ শব্দগুচ্ছ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ দেশের মানুষের প্রাণ-প্রকৃতি ও অন্তরের ভালোবাসা প্রতিধ্বনিত হয়েছে। কৃষি আমাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, কৃষিতেই আমাদের শিকড়। আজকে যিনি মন্ত্রী বা সচিব, তাদের তিন থেকে চার পুরুষ আগে সবাই কৃষক ছিলেন—এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই কৃষি ও কৃষককে নিয়ে আমাদের ভাবতেই হবে।
বর্তমানে আমরা যেভাবে খাবার খাচ্ছি বা খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে তাতে আমরা খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন করতে পারছি। যদিও কিছু জায়গায় ঘাটতি রয়েছে। ১৯৭১ সালে যেখানে মানুষ ছিল ৭ দশমিক ৫ কোটি, সেখানে আজ প্রায় ১৮ কোটি জনগণ। তাই কিছুটা ঘাটতি থাকাটাই স্বাভাবিক। আমাদের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে প্রাণ ও প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।
শুরুতেই খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষকের ন্যায্যতার কিছু ক্ষেত্রে আলোকপাত করতে চাই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে কৃষক ও কৃষিবিদদের সমন্বয়ে একটি জোর প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তার আগে ১৯৬০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গ্রিন রেভল্যুশন শুরু হয়েছিল, যার মাধ্যমে কৃষিশিক্ষা ও কৃষির বিকাশের জন্য এবং কৃষকের পাশে থেকে তাদের জীবনমান ও বন্দোবস্ত কীভাবে উন্নত করা যায় সেই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল। খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে আমাদের চলমান বহু উদ্যোগ রয়েছে এবং সেই প্রচেষ্টার উত্তরোত্তর উন্নতি হচ্ছে। অন্যথায় আমরা হয়তো বহুবার দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হতাম। খাদ্যনিরাপত্তায় এ অভাবনীয় সাফল্যের জন্য প্রথমে কৃষি উৎপাদনে জড়িত মানুষ অর্থাৎ কৃষকদের কৃতিত্ব দিতে চাই। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই আমাদের এ সাফল্য এসেছে। দ্বিতীয়ত, কৃষি গবেষণায় জড়িত কৃষিবিদদেরও সেই কৃতিত্ব দিতে চাই। আমি দেখেছি, কৃষিবিদরা অন্য অফিসারদের মতো অফিসে বসে থেকে শুধু দিকনির্দেশনা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন না, বরং কৃষকের সঙ্গে মাঠে মাঠে ঘুরে, মাঠের আইলে বসে থেকে, কৃষকের গোয়াল ঘর, হাঁস-মুরগির খামার ঘুরে তাদের কাজ তদারকি করে দিকনির্দেশনা দেন এবং পরবর্তী সময়ে ফলোআপ করেন। তাদের অবদান এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই তাদেরও আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
পাশাপাশি কৃষির সার্বিক উন্নয়নে কৃষিশিক্ষা উর্বরতা এনে দিয়েছে। আগে কৃষক শব্দটি বা কৃষক শ্রেণীকে কিছুটা অবহেলিত নজরে দেখা হতো। কিন্তু আজ ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, আমি কৃষকের সন্তান, আমার বাবা-দাদা কৃষক ছিলেন এবং কৃষিই আমার নেশা ও পেশা। তাই কৃষির সঙ্গে জড়িত সব শ্রেণীকে সম্মানের সঙ্গে স্বীকৃতি দিতে হবে। কৃষিশিক্ষার সূতিকাগার হলো বিশ্ববিদ্যালয়, যার মধ্যে ১৯৬১ সালে প্রথম নির্মাণ হয়েছে আমেরিকার ল্যান্ড গ্র্যান্ড সিস্টেমের আলোকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে দেশের নয়টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিশিক্ষার ওপর ডিগ্রি দেয়া হয়। এছাড়া কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও কৃষিশিক্ষা দিয়ে থাকে। তাদের তাত্ত্বিক শিক্ষা পেলেও ব্যবহারিক শিক্ষায় কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতির অনেকটা উন্নয়ন হচ্ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াশোনা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ করতে হয়। আগে লাইভস্টক ও পোলট্রি খাতে এবং ক্রমাগতভাবে অন্যান্য খাতেও ইন্টার্নশিপ চালু হচ্ছে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের শিক্ষার্থীদের সহায়তা করছে। এতে তাদের জ্ঞান আরো পরিপক্ব হচ্ছে। কৃষকের পাশে থেকে হাতে-কলমে কাজ শিখছে।
কৃষির বিভিন্ন শাখা-উপশাখা রয়েছে। খাদ্যশস্য থেকে শুরু করে তৈলবীজ, ফলমূল, প্রাণিজ, লাইভস্টক ও পোলট্রি ইত্যাদি খাতে আমাদের যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে এবং এর ফলে অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। আমি লাইভস্টক খাতের লোক। এ খাতের অনেক বিষয়ই আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে। এখানে অনেক সুযোগ রয়েছে। যথাযথভাবে কাজে লাগালে অর্থনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। সামনেই কোরবানির ঈদ আসছে। সম্প্রতি উপদেষ্টা মহোদয় জানিয়েছেন যে আসন্ন ঈদে আমাদের প্রায় ১ কোটি ৩৪ লাখ গরু রয়েছে। এছাড়া আমাদের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন এবার গরুর চামড়ার দাম বাড়ানো হবে। গত দেড় কিংবা দুই দশক ধরে গরুর চামড়া নামমাত্র দরে বিক্রি হয়ে আসছে যা এবার আর হবে না। অথচ ১৯৯০ সালে আমি একটি ষাঁড়ের চামড়া ৪ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করেছি কিন্তু বর্তমানে তা অনেক কম।
আমরা লক্ষ করেছি যে কোরবানির গরুর ক্ষেত্রে আমাদের দেশী গরুর চাহিদা থাকে। এখানে যদি অন্যান্য অনেক জাতের সঙ্গে দেশী জাতের গরু রাখা হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে গ্রাহকরা দেশী গরুর দিকেই ঝুঁকবেন। তাই অর্থনীতির চাকাকে ত্বরান্বিত করার জন্য দেশীয় প্রজাতির উন্নয়ন ও প্রচার করতে হবে। বাণিজ্যিকভোবে কৃষির পাশাপাশি দেশজ কৃষির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য আমাদের নিরন্তর গবেষণা চলছে। জেনে আনন্দিত হবেন যে আমাদের ‘রেড চিটাগাং’ উৎকৃষ্ট গরুর জাতগুলোর একটি, যার চাহিদা বিশ্বে অনেক বেশি। মুন্সিগঞ্জের ‘মীর কাদিমের গরু’ যা ঢাকার নবাব পরিবার খুব পছন্দ করত—তার উন্নয়নে এক দশক ধরে গবেষণা চলছে। এছাড়া পাবনার গরু ও নেত্রকোনার ‘কালো গরুর’ ওপর কাজ চলছে। তাই কৃষির দেশজ জাতের ওপর মনোযোগ দিতে হবে। দিন দিন দেশী জাতের যেকোনো পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।
কৃষিতে আমাদের লোকবলের প্রয়োজন কমছে। যন্ত্র কায়িক শ্রমের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। এটা স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত। তাই কৃষির সার্বিক উন্নয়নে শিক্ষা ও গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে। আর গবেষণার সঙ্গে খামারিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। তাহলে কৃষির উন্নয়ন টেকসই হবে ও খামারিরা উপকৃত হবেন।
সর্বোপরি বলতে চাই, প্রতি বছর কৃষি গ্র্যাজুয়েটরা বের হচ্ছেন। তারা যেন মনমানসিকতায় কৃষকের সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকেন। তাদের যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের যথাযথ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে কৃষককে সেবা প্রদানের মাধ্যমে তাদের থেকে ফি আদায় করে হলেও কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এতেও কৃষির সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব।
ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া: উপাচার্য, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষকের ন্যায্যতা’ বিষয়ক অধিবেশনে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]










