নিরাপদ নগর ও মানসম্মত বাসস্থান বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ বিশ্ব বসতি দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৬ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী অক্টোবরের প্রথম সোমবার পালন হয়ে আসছে দিবসটি। এ থেকে অক্টোবর পরিচিতি পায় ‘আরবান অক্টোবর’ হিসেবে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সাল থেকে অক্টোবরের শেষ দিন পালন করা হয় বিশ্ব শহর দিবস।
বিশ্ব বসতি বা শহর দিবস—দুটোই বাসস্থানের সংকট সমাধানকে গুরুত্ব দেয়। যে কারণে বসতি দিবসের প্রথম প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাসস্থান আমার অধিকার’। চলতি বছর এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘আরবান ক্রাইসিস রেসপন্স’, যার বাংলা ভাবানুবাদ করা হয়—পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারা, নগর সমস্যায় সাড়া। বলা বাহুল্য, বিশ্বব্যাপী যে হারে নগরের জনসংখ্যা বাড়ছে, তাতে নগরের সমস্যাও বাড়ছে। তাই নগর সংকট সমাধানে এ বছর গুরুত্বারোপ করা হয়। শহর দিবস পালনের উদ্দেশ্যও অনেকটা একই—ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য শহরকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলার প্রতি আলোকপাত করা। আরো সহজ করে বললে, ‘উন্নত শহর, উন্নত জীবন’ এটিই এ দিবসের প্রতিপাদ্য।
শহরের প্রসঙ্গ এলেই সবার আগে দেশের বৃহৎ শহর ঢাকার কথা মনে আসে। দীর্ঘদিন ধরে সবাই জেনে এসেছে রাজধানী হিসেবে ঢাকার বয়স প্রায় ৪০০ বছর। মোগল সুবাদার ইসলাম খান ১৬১০ সালে নগর ঢাকার পত্তন করেন। তবে গত বছর পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে কিছু নিদর্শন ও প্রাচীন দুর্গের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা অনুমান করছেন ঢাকার বয়স আড়াই হাজার বছরের বেশি। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবেও ঢাকার বয়স কম হলো না। সময়ের বিবর্তনে ঢাকা নানা রূপ নিয়েছে। বাড়তি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এ শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আজ প্রায় ম্রিয়মাণ। বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ জলাধার ঘিরে এ শহরে বসতি গড়ে উঠেছিল। আজ যেমন বুড়িগঙ্গার সেই স্বচ্ছ প্রবহমান জলরাশি নেই, জৌলুস নেই, ঢাকাও তেমনভাবে হারিয়েছে তার সজীবতা ও জলাধার। অপরিকল্পিত আবাসন, অপ্রতুল নাগরিক সুবিধা, অসহনীয় যানজট, পরিবেশ দূষণ, মৌলিক সুবিধাপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে ঢাকা বর্তমানে বসবাসের অনুপযোগী। যদিও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে এ শহরের বিকাশে একের পর এক পরিকল্পনা ও মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তাই প্রশ্ন জাগে, ঢাকার সংকটগুলোয় কি আর সাড়া দেয়া সম্ভব? সেগুলো কি সমাধানযোগ্য অবস্থায় আদৌ রয়েছে?
‘প্রকৃতিবিহীন ঢাকা? প্রাকৃতিক অধিকারভিত্তিক টেকসই নগর ভাবনার পুনর্বিচার’ শীর্ষক এক গবেষণার তথ্যমতে, ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার জনবসতিপূর্ণ এলাকা বেড়েছে সাত গুণ। ঢাকার সবুজ আচ্ছাদন ২১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এমনকি শহরের ৬০ শতাংশ জলাধারও হারিয়ে গেছে; অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এলাকা। প্রকৃতি-পরিবেশের ভারসাম্য হারানোর কারণে ঢাকার ভূতাপমাত্রা বেড়েছে ৩-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
জল-সবুজ হারিয়ে ক্রমেই ঢাকা হয়ে উঠেছে বহুতল ভবনের শহর। এখানে সুউচ্চ ভবনের নিচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বস্তি। ঘরহীন মানুষের দেয়ালহীন ঘর হয়ে উঠেছে এ শহরের ফুটপাত থেকে নানা অলিগলি। গৃহহীন মানুষকে ঘর দিতে এ দেশের সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্প নিয়েছিল। কিন্তু সে প্রকল্পের আওতায় ঘর তোলা হয়েছে এমন সব জায়গায়, যে স্থানগুলোয় নাগরিক সুবিধা সহজে পাওয়া সম্ভব না। এরই মধ্যে সেই প্রকল্পের অনেক ঘর নদীর বুকে বিলীন হয়ে গেছে। আবার কেউ না থাকায় ভিটা জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। অথচ ঢাকার বস্তিতে থাকা মানুষের জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। তবে নাগরিক সুবিধার কথা চিন্তা করলে বলা যায়, এ শহরের স্থায়ী বা অভিবাসী বাসিন্দা, কোনো সরকারই কারো কথাই খুব বেশি বিবেচনায় নেয়নি। কিছু বস্তি আর বহুতল ভবনের মধ্যে ফারাক কেবল কক্রিটের তৈরি দেয়াল-ছাদ থাকা না থাকার। কেননা এখানকার বাসিন্দারা একই মানের দূষিত বায়ুতে শ্বাস নিচ্ছে রোজ। প্রতিদিন একই পথে যানজটে আটকে থাকছে। ঢাকার সড়কে বিশৃঙ্খলা, দুর্ঘটনা ও মৃত্যু নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া যানবাহনের অতিরিক্ত হর্নের শব্দে নানা অসুবিধায় ভুগছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এ শহরের নানা এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করে না। জমে থাকা জলে বৈদ্যুতিক তার পড়ে থাকে। তাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পথচারীর মৃত্যু ঘটে। এ শহরে অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনাও হরহামেশাই ঘটতে দেখা যায়। বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এখানে এ ধরনের দুর্ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমের সুব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছানোর আগেই পুরো বিল্ডিং পুড়ে যেতে দেখা যায়। আবার ঢাকার অধিকাংশ হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহত বা বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবার মানও নিম্ন। আবার যেসব হাসপাতাল উন্নত মানের সেবা দেয়, নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের সেসব হাসপাতালের উচ্চ ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নেই।
তবে এসব ভোগান্তি শহরের উচ্চ শ্রেণী-পেশার মানুষ কিংবা সরকারের কর্তাব্যক্তিদের তেমন একটা পোহাতে হয় না। হয়তো সে কারণেও এ শহর এমন অগোছালোভাবে বেড়ে উঠেছে। যত অগোছালোভাবে বেড়ে উঠল, ততই বৈষম্য বাড়তে থাকল। এ শহরের আবাসন খাত নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ভাড়াবাড়ির খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আর এ শহরে খাদ্যের মূল্যস্তর তো বরাবরই ঊর্ধ্বমুখী থেকেছে।
ঢাকার সমস্যা সমাধানে অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে—সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, রাজউক, পরিবহন কর্তৃপক্ষ ইত্যাদি। কিন্তু এসব সংস্থার কোনোটির মধ্যে কার্যকর কোনো সমন্বয় নেই। নীতি ও পরিকল্পনা এক রকম হলেও বাস্তবায়ন অন্য রকম। রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাশালী মহলের স্বার্থও নানা সময়ে অনেক সিদ্ধান্তকে অকার্যকর করে তুলছে। সব মিলিয়ে ঢাকা যত ধরনের সমস্যায় জর্জরিত, সেগুলো সমাধানযোগ্য অবস্থায় রয়েছে কিনা সন্দেহ জাগে। উদাহরণ হিসেবে মেট্রোরেলের কথাই বলা যায়। জাইকা ওগাতা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬ চালুর পর সড়কপথে যাত্রীচাপ কমে গতি বাড়ার কথা। কিন্তু উত্তরা-মতিঝিল করিডোরে মেট্টো চালুর দুই বছরেও সড়কপথে যাতায়াতের গতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। এ সড়কপথে গতি বেড়েছে সর্বোচ্চ ১০-১৫ শতাংশ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সড়কপথের যানজট কমাতে মেট্রোরেলের এ ভূমিকাও দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কেননা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সড়কে যানবাহনের সংখ্যা আরো বাড়বে। ঢাকায় যত ধরনের সমস্যা রয়েছে, তার মূলে রয়েছে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভবন। সরকারের প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, কর্মসংস্থানের মূল আধার করা হয়েছে ঢাকাকে। ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণের কথা একসময় বহুল আলোচিত ছিল। তবে সে আলোচনাও আর শোনা যায় না। এর একটি কারণ হতে পারে ঢাকা বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। ঢাকার কোনো বিকল্প শহর খোঁজা হতে পারে অন্যতম সমাধানের পথ। তবে সেটি দীর্ঘমেয়াদি ও বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই খুব বেশি সমাধানযোগ্য না হলেও ঢাকার পরিস্থিতির উন্নয়ন করা নিয়ে কাজ চলমান থাকা দরকার।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো নগর শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়। তবে তার চেয়েও জরুরি হলো তাদের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত। সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। সরকারের নমনীয়তার কারণেই মূলত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব অবহেলা করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারে। সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতির সুযোগ পায়। সুতরাং সরকার যদি নিজেই নিজের অনুশাসন বাস্তবায়নে কঠোর না হয়, তাহলে কখনই পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে না। নিয়ম-নীতির আওতায় আনা গেলে হয়তো ঢাকা আবার কোনোদিন বাসযোগ্য শহরের তালিকায় স্থান করে নিতে পারবে।
সাবরিনা স্বর্ণা: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










