দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর পালিত হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলেও ঈদের আনন্দ মূলত সর্বজনীন। মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময়, নানা আয়োজন-আপ্যায়ন, জাকাত-ফিতরা ও সাধারণ দানের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র-অসহায় মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি এ দিনকে তাৎপর্যময় করে তোলে। তাছাড়া সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যেন ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে তাই ইসলামে জাকাতের বিধান দেয়া হয়েছে। উপযুক্ত গ্রহীতাকে জাকাত প্রদানের মাধ্যমে সমাজে ধনী ও দরিদ্রের ভেদাভেদ কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব। আবার রাষ্ট্রের সবাই যেন সচ্ছলভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারে সেজন্য কর্মজীবীদের ঈদের আগেই দেয়া হয় উৎসব ভাতা। অনেক ক্ষেত্রে এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ঈদের আগেই কর্মক্ষেত্রের সবাইকে বেতন ও বোনাস প্রদানের নির্দেশও দেয়া হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ দেশে প্রতি বছর দেখা যায়, বকেয়া বেতন-বোনাস, ছুটির দাবিতে দিনের পর দিন শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হচ্ছে। ঈদ তাদের কাছে হয়ে উঠেছে মিছিল-সংগ্রামের আরেক নাম। বেশির ভাগ শ্রমিককে শূন্য হাতে স্বজনদের কাছে ফিরতে হয়। অথচ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ কাটানোর আনন্দ দ্বিগুণ হয় যখন কর্মজীবী মানুষরা ঘরে ফিরতে পারেন পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কিনে। এমনিতে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। মূলস্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাড়েনি আয়। এতে আয়বৈষম্য প্রকট হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের কয়েক মাসের বেতন-বোনাস বকেয়া রাখার অর্থ তাদের জীবনের মৌলিক চাহিদা ও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা।

এ কথা অনস্বীকার্য যে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকেই অনেক কারখানার মালিক পলাতক থাকায় শ্রমিকরা বিপাকে পড়েছেন, শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তবে ঈদের আগে শ্রমিকের বেতন না পাওয়ার ঘটনা বেশ পুরনো, অনেকটাই সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া আবশ্যক। শিল্প মালিকদের এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকারেরও তৎপরতা প্রয়োজন। কোনো গার্মেন্টসের মালিক বেতন-ভাতা দিতে ব্যর্থ হলে শিল্প পুলিশের উচিত বিকল্প উপায় বের করা। মালিক-শ্রমিক সমঝোতার ভিত্তিতে ঈদের ছুটি নির্ধারণ, বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং ঈদের আগে যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া যেন কোনো শ্রমিক ছাঁটাই না করতে পারে, এ বিষয়ে শিল্প পুলিশের তৎপরতা বাড়াতে হবে। ঈদের সময় শ্রমিক বা কোনো কর্মজীবী মানুষের এমন হয়রানি কোনো অবস্থাতেই মেনে নেয়া যায় না। এ উৎসবের চাওয়া শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দূর হোক, মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সৌহার্দের সম্পর্ক গড়ে উঠুক। ঈদের আনন্দ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ুক।

শ্রমিক অসন্তোষের বাইরে ঈদের যাত্রা ঘিরে এবার আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা। কর্ম কিংবা শিক্ষার তাগিদে পরিবার থেকে দূরে, অন্যত্র থাকা মানুষজন ঈদ উদযাপনে বাড়ি ফিরতে চায়। তাই ঈদের বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই সড়ক-মহাসড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীদের ভিড় বাড়ে। নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ ঈদযাত্রার প্রত্যাশা করে সব যাত্রী। যাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা দেখা যায়। তবুও অতিরিক্ত ভাড়া, টিকিট পেতে ভোগান্তি, কালোবাজারি টিকিট গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য, যানজট, দুর্ঘটনাসহ নানা বিশৃঙ্খলা ঘুরেফিরে ঈদযাত্রাকে এক ধরনের ক্লান্তি ও বিভীষিকাময় করে তোলে। তবে আসন্ন ঈদুল ফিতরে যাত্রাপথে যানবাহনের দুর্ঘটনার পাশাপাশি চুরি-ডাকাতির ভয়ও মানুষের মধ্যে জেঁকে বসেছে।

সরকার পরিবর্তনের পর দেশে মব ভায়োলেন্স, মব লিঞ্চিং, চুরি-ছিনতাই, গণপিটুনি, হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি সহিংস ঘটনা মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছিল। এখন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও মানুষের ভীতি দূর হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে ঈদযাত্রায়। বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, স্বজনদের সঙ্গে ঈদের লম্বা ছুটি উপভোগ করতে এবার অন্যান্যবারের চেয়ে বেশি মানুষ রাজধানী ছেড়ে যাবেন বলে ধারণা করা হলেও নিরাপত্তার শঙ্কায় ঢাকা ছাড়ছেন না অনেকেই। নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির এক হিসাব অনুযায়ী, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আনুমানিক পৌনে দুই কোটি মানুষ বৃহত্তর ঢাকা (রাজধানী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ মহানগরসহ আশপাশের এলাকা) ছাড়বে। এ বিপুলসংখ্যক মানুষের ৬০ শতাংশ যাবে সড়কপথে। বাকি ৪০ শতাংশ যাবে নৌ ও রেলপথে। সে হিসাবে, এবার সড়কপথে ঈদযাত্রীর সংখ্যা হতে পারে ১ কোটি ৪ লাখের কাছাকাছি। তবে বাস্তবে দেখা গেছে রাজধানীর অধিকাংশ বাস টার্মিনালে যাত্রীচাপ এবার অন্যান্যবারের চেয়ে কম। বাসের ভেতরে বা ছাদে টিকিটের বাইরে যাত্রী পরিবহনের ঘটনাও সেভাবে চোখে পড়ার মতো নয়। তবে কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা গেছে। তাছাড়া অতিরিক্ত যাত্রী বহনের জন্য সড়কে ফিটনেসবিহীন ও পুরনো যেসব যানবাহন চলতে দেখা যায়, এবার সেগুলোও দেখা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে এ ঈদে অন্যান্যবারের তুলনায় যাত্রীচাপ অনেক কম।

ঈদের আগে ঈদকালীন ও ঈদের পরে যাত্রীরা যেন কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন না হয় সে বিষয়ে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, ফাঁকা হয়ে যাওয়া রাজধানীর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েক স্তরের বলয় তৈরি করা হচ্ছে। এমন বলয় সারা দেশে তৈরি হোক সেটাই প্রত্যাশা। ঈদ সবার জন্য নিরাপদ হোক।

যেকোনো সহিংস ঘটনার পাশাপাশি ঈদের সময় হয় যানজট থাকে কিংবা ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়াভাবে যানবাহন চলতে থাকে। কিংবা কমবেশি সড়কে-মহাসড়কে দেখা যায় ফিটনেসবিহীন লক্করঝক্কর গাড়ি। এসব কারণে ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতি বছরই ঘটছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে পবিত্র ঈদুল ফিতরে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। গত বছর ঈদুল ফিতরের আগে ও পরে ৪-১৮ এপ্রিলের মধ্যে ১৫ দিনে দেশে ৩৫৮ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬৭ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি। এর আগের বছর ২০২৩ সালে ঈদযাত্রায় ঈদের আগে ও পরে ১৫ দিনে ৩৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত ও ৮৪৪ জন আহত হন। সড়ক, রেল ও নৌপথে সম্মিলিতভাবে ৪০২টি দুর্ঘটনায় ৪৪৩ জন নিহত ও ৮৬৮ জন আহত হন। ২০২২ সালে ঈদযাত্রায় ৩৭২টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪১৬ জন, আহত হন ৮৪৪ জন। এসব তথ্যই বলে দেয় যাত্রাপথে কতটা অনিরাপদ ও কতটা অনিশ্চিত সবার জীবন। এসব দুর্ঘটনা এড়াতে মহাসড়কে যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সঙ্গে সচেতন থাকতে হবে সবার দেশের আবহাওয়া নিয়ে। এরই মধ্যে তীব্র গরম পড়তে শুরু করেছে। হিটওয়েভ থেকে নিজেকে সুস্থ রাখতে আনন্দ উদযাপনের মধ্যে স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া প্রয়োজন।

ঈদের আনন্দ অটুট থাকুক এটিই প্রত্যাশা। উৎসবের আনন্দ হোক নিরাপদ ও সম্প্রীতির। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা, ঈদ মোবারক।