দেশে ডেঙ্গুর উপস্থিতি সরকারিভাবে প্রথম স্বীকার করা হয় ২০০০ সালে। এর পর থেকে অব্যাহতভাবে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ১২৭। তাদের মধ্যে ৩৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ২৪ বছর পেরিয়ে গেলেও ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করা যায়নি। বরং প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার প্রায় দশমিক ৬৪ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল দশমিক ৫৫ শতাংশ।
দেশে ডেঙ্গুর পিক সিজন সাধারণত ধরা হয় আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে। নভেম্বর থেকে এর প্রকোপ স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকে ঋতুবৈচিত্র্যগত কারণে। দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয় গত বছর। তখন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। সে বছর কেবল সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ৩৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই সময় ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন। আবার এ বছর এখন পর্যন্ত মাসের হিসাবে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে অক্টোবরে। ওই মাসের প্রথম সাতদিনে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও সংক্রমণের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২২ ও ৫ হাজার ৭২৬। অক্টোবরের শেষ সাতদিনে (২৫-৩১ অক্টোবর) ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ১১৫ আর মৃত্যু হয়েছিল ২৮ জনের।
পরিসংখ্যানগুলোর দিকে লক্ষ করলে সহজেই অনুমেয় যে ডেঙ্গুর পিক সিজনেও এ রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে বহু আগেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। উপরন্তু গত ৫ আগস্ট দেশে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এক ধরনের স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করেছে। অনেকটা উপেক্ষিত অবস্থায় আরেকটি ডেঙ্গু সিজন কেটে যাচ্ছে। এদিকে এবার নভেম্বরেও ডেঙ্গু সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। নভেম্বরে সাধারণত এডিস মশাবাহিত এ রোগের প্রকোপ কমে আসে। কিন্তু এবার এ মাসের ১-১৪ তারিখ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একসময়ের মৌসুমি রোগ ডেঙ্গু এখন সারা বছরের রোগ হয়ে উঠেছে। ফলে বছরজুড়েই এটি প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসকদের সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন ছিল। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বিভিন্ন এলাকা বা মহল্লায় ছোট ছোট পকেটে সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। এ পকেটগুলোকে আগে চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে হতো। আবার বৃষ্টি হলে মশার প্রজনন ক্ষেত্র কোনো পকেটে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোথাও বৃষ্টির পানি জমলেই মশার প্রজনন ক্ষেত্রে তৈরি হয়। একসময় মশার প্রজনন কেন্দ্র ছিল কেবল পরিষ্কার পানি। কিন্তু এখন নোংরা পানিও মশার প্রজনন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সারা বছরই তাই সব পকেট ধ্বংস ও জমা পানি নিষ্কাশনে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত ছিল।
সাধারণত ডেঙ্গু প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণের কাজটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে করে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশের প্রায় সব মেয়র ও কাউন্সিলরকে অপসারণ করে স্থানীয় প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের। ডেঙ্গুর সংক্রমণ রোধে বিগত সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে—এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্যও এটি একটি চ্যালেঞ্জ ছিল দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে। কিন্তু এ সরকারও কোনো সফল উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের নিয়োজিত প্রশাসকরা নিজেদের এক্ষেত্রে প্রমাণ করতে পারেননি। বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেসব কর্মকর্তার তৎপরতার অভাব রয়েছে। মূলত তাদের ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণেই রাজধানীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম থমকে আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়াধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণে গত মঙ্গলবার হাইকোর্ট একটি নির্দেশনা জারি করেছে। রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতেও বলা হয়।
বলা বাহুল্য, তদারকির অভাবে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কেননা আগে চাহিদামাফিক ওষুধ থাকত কাউন্সিলর অফিসে। মশক কর্মীরা প্রতিদিন সকালে কাউন্সিলর অফিস থেকে সাইডিং ও সন্ধ্যায় অ্যাডাল্টিসাইডিং করতেন। কিন্তু বর্তমানে কাউন্সিলর কার্যালয় নিষ্ক্রিয় থাকায় ওষুধ নিতে হয় সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে। কিন্তু আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের এদিকে যথেষ্ট মনোযোগ না থাকায় রাজধানীসহ দেশব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। যেহেতু এখনো ডেঙ্গু সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী, স্থানীয় প্রশাসকদের তৎপরতা বাড়ানো অতীব জরুরি।
মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০২১ সালে একটি জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন করে, যেখানে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দিকনির্দেশনা রয়েছে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে প্রতি মাসে এডিস মশার ঘনত্ব ও ঝুঁকির তথ্য এবং চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদেরই মূল ভূমিকা পালনের কথা থাকলেও তারা না থাকায় গত তিন মাসে কোনো তথ্যই মন্ত্রণালয়ে যায়নি। আবার অতীতে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরুর আগে সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম নিতে দেখা যেত। লিফলেট বিতরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, মসজিদে সচেতনতামূলক বয়ান, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কমিটি করে মশক নিধন, বিশিষ্টজনদের মাধ্যমে কিংবা গণমাধ্যমেও চালানো হতো প্রচারণা। এসব কার্যক্রম পুরোদমে আবার শুরু হওয়া প্রয়োজন। বিশেষত মশক নিধন কর্মসূচি যাতে যথাযথভাবে পালিত হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। মশক নিধন স্প্রে শুধু নালা-নর্দমায় নয়, বাড়ির ভেতরেও ছিটানো প্রয়োজন। বিভিন্ন স্থান থেকে মশা সংগ্রহ করে প্রজাতি নির্ধারণ করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক লার্ভার দৈনন্দিন ঘনত্ব কেমন তা যাচাই-বাছাই করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয়তা বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি স্থানীয় জনগণকেও এ কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।
জনগণকে সচেতন করতে হবে যাতে বাড়ির কাছাকাছি কোথাও এডিস মশার বংশ বিস্তারের উপযোগী পানি জমতে দেয়া না হয়। বাসাবাড়িসহ এর আশপাশে যেখানে পানি জমে সেগুলো থেকে নিয়মিত পানি সরিয়ে ফেলতে হবে। সর্বোপরি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।










