রাজধানী ঢাকার অন্যতম সমস্যা হলো তীব্র যানজট। যানজট কমাতে সাম্প্রতিক দশকগুলোয় অনেক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই সেভাবে কার্যকর হতে পারেনি। এর মধ্যে একটি ছিল স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০০০-০৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের আওতায় ঢাকার ৭০টি জায়গায় আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়। কিন্তু অল্পদিনের ব্যবধানে রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার না হওয়ায় অধিকাংশ বাতি অকার্যকর হয়ে পড়ে। এছাড়া সংস্থাটির অর্থায়নে ২০১০-১১ অর্থবছরে ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস)’ নামে আরেকটি প্রকল্পের আওতায় পুনরায় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। এর আওতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯২টি ইন্টারসেকশনে সোলার প্যানেল, টাইমার কাউন্টডাউন, কন্ট্রোলার ও কেবল স্থাপন করা হয়। কিন্তু এ উদ্যোগও কার্যকর হয়নি।

এর বাইরে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ২০১৫ সালে একটি প্রকল্প নেয়। ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক সেই প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালে গুলশান-১, মহাখালী, পল্টন ও ফুলবাড়িয়া (গুলিস্তান) মোড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেমের (আইটিএস) জন্য ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা, অত্যাধুনিক শব্দধারণ যন্ত্র, বাতি, বিশেষায়িত তার ও খুঁটি স্থাপন করা হয়। দুঃখজনকভাবে সে প্রকল্পও আলোর মুখ দেখেনি। উল্লিখিত এসব উদ্যোগ অকার্যকর হওয়ার পেছনে কিছু সাধারণ কারণ হয়েছে। প্রথমত, এসব প্রকল্প নেয়ার সময় এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, এ উদ্যোগগুলো নেয়ার আগে বিদ্যমান কিছু সমস্যার সমাধান আবশ্যক ছিল।

সম্প্রতি রাজধানীতে আবারো স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২২টি মোড়ে নতুন করে এ বাতি বসানো হচ্ছে। পরীক্ষামূলকভাবে গতকাল সাতটি মোড়ে এ বাতি চালু করা হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এসব বাতি বসাতে ব্যয় হবে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ হিসেবে ঢাকার একটি ট্রাফিক করিডোরে (নির্ধারিত পথে) এগুলো বসছে। এ প্রযুক্তির সংকেতবাতি পরিচালিত হবে আধা স্বয়ংক্রিয় (সেমি অটোমেটেড) পদ্ধতিতে। প্রশ্ন হলো, এবার কি উদ্যোগটি সফল হবে।

আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকরের ক্ষেত্রে একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল বন্ধ করা প্রয়োজন। কেননা অযান্ত্রিক যানের ক্ষেত্রে (সড়ক পরিবহন আইনে ব্যাটারিচালিত রিকশা-অটোরিকশার মতো বাহন ‘‌মোটরযান’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত নয়) স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা প্রযোজ্য হয় না। যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন ঘিরে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান না করেই ওই প্রকল্পগুলো নেয়া হয়েছিল। আবার স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা প্রচলনের আগে চালক, যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা থাকাও জরুরি। এছাড়া পথচারীদের জন্য অবশ্যই ইন্টারসেকশনের চার কোনায় পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে হবে। ওই উদ্যোগগুলো কার্যকর না হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ ছিল সিগন্যাল বাতিগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ট্রাফিক পুলিশদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব। পাশাপাশি বাতির রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। বাস্তবতা হলো, এসব সমস্যার সমাধান না করেই পুনরায় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে আবারো উদ্যোগটি মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা কাজ করছে। তবে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করা গেলে তা সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। তাই আধুনিক সিগন্যাল বাতি চালুর পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান অন্য সমস্যা সমাধানেও সরকারের মনোযোগ প্রয়োজন।

একটা শহরের সড়কে যানবাহন সংখ্যা ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। যানের সংখ্যা পরিমিত হলে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি ছাড়াও সুশৃঙ্খলভাবে যান চলাচল করতে পারে। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো ভুটান। দেশটিতে পরিবেশ সুরক্ষার কারণে যানবাহন সীমিত রাখা হয়েছে। আবার রাস্তার নেটওয়ার্ক এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে কোনো মোড়ে যানবাহন থামার প্রয়োজন হয় না। প্রতিটি মোড়ে ও প্রধান সড়কে ট্রাফিক পুলিশ নিয়োজিত থাকে। তারাই ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানকার চালক ও যাত্রীরাও সচেতন। জেব্রা ক্রসিং এলে চালকরাই গাড়ি থামিয়ে দেন। জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করে রাস্তা পারাপার করেন পথচারী। দেশটিতে গাড়ি ওভারটেক বা গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পারাপারের প্রবণতা নেই। দক্ষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের নাম উল্লেখযোগ্য। দেশটি গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিশ্বের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও সুবিধাসম্পন্ন দেশগুলোর একটি। সিঙ্গাপুরের ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (এলটিএ) ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। বিপরীতে রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগের মাধ্যমে যানের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ ঢাকায় এর বিপরীত চিত্র লক্ষণীয়। গণপরিবহন সেবা মান বাড়েনি। ফলে যাত্রীরা ব্যক্তিগত ও অযান্ত্রিক যান ব্যবহারের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। ঢাকার সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের প্রায় ৪৯ শতাংশ মোটরসাইকেল ও অযান্ত্রিক যান। অর্থাৎ একই সড়কে চলছে নানা গতির গাড়ি। বিশেষত মূল সড়কগুলোয় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। অন্যদিকে ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে ট্রাফিক বাতির দেখা মিললেও কেবল গুলশানের বাতি কাজ করে বলে এক সমীক্ষা উঠে এসেছে। ট্রাফিক পুলিশরা যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেন হাতের ইশারায় বা লেজার লাইট ব্যবহারের মাধ্যমে।

এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীতে কেবল স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি চালু করে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে না। পাশাপাশি অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নিতে হবে। এটি বাস্তবায়নে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। চালক, যাত্রী ও পথচারী সচেতন না হলে ট্রাফিক ব্যবস্থা দক্ষ করে গড়ে তোলা যাবে না। জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ট্রাফিকের নিয়মনীতির কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে সমন্বয় থাকাও আবশ্যক। সর্বোপরি একটি সড়কে কোন বৈশিষ্ট্যের যান চলাচল করবে সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি একটি পদক্ষেপ মাত্র। রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে পুরো ট্রাফিক কাঠামোয় বিদ্যমান মৌলিক সমস্যাগুলোর আশু সমাধান আবশ্যক।