হতাশাজনক বিষয়, প্রতি বছর এ সংখ্যা বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো কার্যকর পরিকল্পনা যে নেই, তা সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালে উপলব্ধি করা যায়। সম্প্রতি রোড সেফটি ফাউন্ডেশন উল্লেখ করেছে, গত সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৫ হাজার ৭১২ ও আহত হয়েছে ১৪ হাজার ১৪৩ জন। দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘিরে এটিই প্রথম কোনো পরিসংখ্যান নয়।
২০২০ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) এ-সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। সেখানে ১৯৯৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ও কারণ তুলে ধরা হয়। ‘আ রিভিউ অব মোটরসাইকেল সেফটি সিচুয়েশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণাপত্রের তথ্যমতে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। প্রতি ১০ হাজার মোটরসাইকেলের মধ্যে বাংলাদেশে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে ২৮ দশমিক ৪টি, যেখানে এর ধারেকাছেও ছিল না এশিয়ার অন্য কোনো দেশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ৭৪ শতাংশই মফস্বলে ঘটে, যার কারণ দুটি। এক. ট্রাফিক তদারকি কম। দুই. মফস্বলের যাত্রীরা মহাসড়কে বেশি যাতায়াত করে। সড়ক দুর্ঘটনার সমসাময়িক অন্যান্য পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মোট সংখ্যার বড় একটি অংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা।
চলতি বছরের শুরুতে ২০২৫ সালে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত হয় বলে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সংস্থাটি জানায়, গত বছর সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। ২ হাজার ৪৯৩টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত ও ২ হাজার ২১৯ জন আহত হয়। এ সংখ্যা যথাক্রমে মোট দুর্ঘটনার ৩৭ দশমিক ৪, নিহতের ৩৮ দশমিক ৪৬ ও আহতের ১৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
এ তথ্যগুলো সামগ্রিক সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাগত ঘাটতি তুলে ধরে। সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু কমিয়ে আনতে মোটরসাইকেল ঘিরে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে মৃত্যুর বড় কারণ হয়ে উঠেছে সড়ক দুর্ঘটনা।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকের বেপরোয়া গতি ও ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া অল্প বয়সী ও অনভিজ্ঞ চালকদের হাতে মোটরসাইকেল থাকার কারণে এ ঝুঁকি বেড়েছে। অনেক চালক ওভারটেকিংয়ের সময় প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখে না। হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে কিংবা মোড় ও ইউটার্নে পর্যাপ্ত গতি কমায় না। মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের সঙ্গে মোটরসাইকেলের গতির পার্থক্যও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে পেছন থেকে ভারী যানবাহনের ধাক্কা কিংবা মোটরসাইকেলকে পাশ কাটানোর সময় পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটছে। এ প্রেক্ষাপটে মোটরসাইকেলের গতিসীমা নির্ধারণ অবশ্যই প্রয়োজন এবং এ নীতিমালা দেশেও রয়েছে—মোটরযান গতিসীমা নির্দেশিকা, ২০২৪। শুধু একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দিলেই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত হয় না। কোন সড়কে কী ধরনের যান চলাচল করছে, সড়কের প্রস্থ কত, আলাদা লেন আছে কিনা, চলমান যানবাহনের গতির পার্থক্য, পথচারীর উপস্থিতি কেমন—এসব বিবেচনা করে গতিসীমা নির্ধারণ করলে এবং তার বাস্তব প্রয়োগ থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমতে পারে। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন না থাকলে গতিসীমা নতুন ঝুঁকি তৈরি করে। যেহেতু অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে গতির পার্থক্য তৈরি হয়, সেহেতু গতিসীমা নির্ধারণও বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। দেশে মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন নেই। গতিও মানে না চালক। মানে না ট্রাফিক আইনও। বরং ফুটপাতে মোটরসাইকেল উঠিয়ে দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। যেখানে ফুটপাতে মোটরসাইকেল না ওঠা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেখানে ট্রাফিক আইন নিয়ে কথা বলাটা অবান্তর বৈকি। সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে অবশ্যই সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে এবং বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে ট্রাফিক তদারকি ও আইন প্রয়োগে। গবেষণায়ও মফস্বল এলাকায় ট্রাফিক নজরদারির ঘাটতিকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্ঘটনা কমাতে শুধু রাজধানী বা বড় শহরের কয়েকটি সড়কে অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। অতিরিক্ত গতির ক্ষেত্রে স্পিড ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। নাম্বার প্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইন ভঙ্গকারী যানবাহন শনাক্ত করা সম্ভব। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে পারলে পুলিশের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং আইন প্রয়োগও ধারাবাহিক হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো সড়কে চলাচলকারী বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ ভারী যানবাহনচালকদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা। ছোট যানবাহনের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, ব্লাইন্ড স্পট সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং ওভারটেকিংয়ের নিয়ম মেনে চলা—এগুলোর প্রয়োগ থাকতে হবে। অননুমোদিত রুটে ভারী যান যেন না চলে তা তদারক করা। বিবেচনায় নিতে হবে, শুধু মোটরসাইকেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে সড়কে দুর্ঘটনা কমানো যাবে না। মোটরসাইকেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ৭ আগস্ট ‘রুট পারমিটবিহীন’ নিয়ন্ত্রণ হারানো এক বাসচাপায় দিনমজুর কৃষকের মৃত্যুর ঘটনা এড়ানো যাবে কি?










