ট্রাস্টি বোর্ডে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়, আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হলেও তাদের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হয়ে কাজ করা। আগে দেখা যেত, একজন ভিসির ফাইল তিন বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে। আবার তিনজনের মধ্যে অনুমোদন দেয়া হতো তিন নম্বর জনকে। রাজনৈতিক পরিচয়ে ভিসি নিয়োগ হতো। এটা থেকে অমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ইউজিসির আসলে অনেক কাজ। আমরা আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে স্থান পাওয়ার কথা বলছি। এক্ষেত্রে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন ছাড়া কিন্তু কোনো পথ নেই। আর মানোন্নয়ন ও র‍্যাংকিং উন্নতি করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে ইউজিসির কাজ করতে হবে।

শিক্ষিত বেকারের কথা বলা হচ্ছে। আমি শিক্ষিত বেকার শব্দটি বিশ্বাস করি না। কারণ প্রতিটি মানুষ কাজ করতে সক্ষম। আবার এর জন্য নীতিগত কিছু পরিবর্তন আবশ্যক। যেমন আমরা ফার্মাসিস্ট তৈরি করি, কিন্তু বর্তমানে এক্ষেত্রে বাংলাদেশে চাকরি নেই বললেই চলে। সেক্ষেত্রে আমরা হসপিটাল ফার্মাসিস্ট তৈরি করতে পারি। বাংলাদেশে আনুমানিক ১০ হাজার হসপিটাল আছে। সেখানে ডাক্তারের সঙ্গে ফার্মাসিস্ট দরকার। যদি ওষুধ দেয়ার সময় একজন ফার্মাসিস্টকে আমরা যুক্ত করতে পারি তাহলে ২০ হাজার বেকারের কর্মসংস্থান হবে। অর্থাৎ দেশের হসপিটালগুলোর নীতিমালা পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

একইভাবে যদি বলি, আমরা কম্পিউটার অপারেটর বা মার্কেটিংয়ের লোক রাখি। আমরা যদি একটা ডাটা অ্যানালিস্ট বানিয়ে দিই, যে ডাটাও নিতে পারে এবং পাশাপাশি মার্কেটিংয়ে রূপান্তর করতে পারে, তাহলে আমাদের আরো ৫০ হাজার লোকের চাকরি হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের প্রত্যেকেই উদ্যোক্তা হতে পারে। অথচ আমরা কেবল গ্র্যাজুয়েট বানাই। কিন্তু সত্যিকারের মানুষ বানাতে হবে। আন্তর্জাতিক নাগরিক তৈরি করব।

একজন শিক্ষার্থীকে প্রথমত নিজেকে উপস্থাপন করতে পারতে হবে। অনেক সময় ইন্টারভিউ বোর্ডে দেখা যায় একজন শিক্ষার্থী কীভাবে বসতে হবে সেটা জানে না, সঠিক সময়ে উপস্থিত হতে পারে না। ইংরেজিতে এক-দুই লাইন কথা বলতে পারে না। তাহলে সে কেন আন্তর্জাতিক বাজারে চাকরি পাবে? বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুমানিক ৪ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী আছে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না বা দুই লাইন লিখতে পারে না৷।

এক্ষেত্রে উন্নতি করতে হলে আমাদের কারিকুলাম পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের কারিকুলামের ৬০ শতাংশ পরিবর্তন করতে হবে। ইংরেজি জানতে হবে, কম্পিউটার সায়েন্স জানতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কথা বলা জানতে হবে, লিডারশিপ থাকতে হবে, পোশাক-পরিচ্ছদ ঠিক থাকতে হবে এবং অঙ্গভঙ্গি ঠিক রাখতে হবে।

আবার একটা বিষয়ে আমি সবার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। যেমন একজন বলেন—আমি চাকরি করব না, উদ্যোক্তা হব। এটা বিশ্বাস করি না। কারণ৷ আমি নিজে একজন উদ্যোক্তা এবং চাকরিও করি। আমি মনে করি, প্রতিটি চাকরিজীবী একজন উদ্যোক্তা। আমি যদি আমার কোম্পানির একজন কর্মীকে উদ্যোক্তা না ভাবি তাহলে সে কীভাবে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে!

এবার শিল্প খাতের বিষয়ে কথা বলা যাক। শিল্প চালানো কঠিন। ক্লাসে কি শিল্পের নেতাদের আমরা আনতে পারি না? পড়াশোনার মধ্যে ৫০ শতাংশ যদি সিইও পড়ান তাহলে প্রত্যেকটা ছেলে উদ্যোক্তা হবে। শিক্ষকদের জন্য স্নাতকের পর দুই বছরের জন্য একটি টিচিং কোর্স করানো দরকার। ভারতে এটা করানো হয়। ভারতে দুই বছরের একটা মাস্টার্স প্রোগ্রাম রয়েছে টিচার হওয়ার জন্য। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪০ হাজার শিক্ষক আছেন। তাদের মধ্যে ৩০ হাজারকে এ কোর্সের আওতায় আনতে পারলে শিক্ষকতার মান বাড়তে পারে। আর দেশের কোন খাতে বেশি বিদেশী কাজ করে এটা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত। বিদেশী যারা এখানে কাজ করছেন তারা অনেক ডলার নিয়ে যাচ্ছেন। তাই এটা রিপ্লেস করা দরকার। এ বিষয়ে ইউজিসি আমাদের নিয়ে কাজ করতে পারে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭০ হাজার প্রবাসী দেশে কাজ করছেন এবং ৩০ জন শিক্ষার্থী পড়ছেন। এই যে ৭০ হাজার বাইরের মানুষ কাজ করে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার করে নিয়ে যাচ্ছেন, এটি নিয়ে ইউজিসি থেকে একটা গবেষণা কি করা হয়েছে? কারা এখানে কাজ করেন! আমরা একটা ফ্যাশন ডিজাইনারকে ৩ লাখ টাকা বেতন দিই। অর্থাৎ আমরাও তো ডিজাইনার পোশাক বানাই। কিন্তু আমাদের ডিজাইনাররা ইংরেজি জানে না। ফলে৷ তাদের আন্তর্জাতিক কোনো যোগাযোগ নেই।৷

এ ৭০ হাজার মানুষকে দেশীয় ব্যক্তির মাধ্যমে রিপ্লেস করার জন্য ইউজিসি কি আমাদের সঙ্গে একটা প্রোগ্রাম করতে পারে না? আমরা আগামী তিন বছরে ৭০ হাজার লোককে রিপ্লেস করব। আমাদের ৩০ বিলিয়ন ডলার যেটা বিদেশ থেকে আয় হয়, সেটার ৮০ শতাংশ ভারত নিয়ে যায়। আমাদের এটি নিয়ে চিন্তা করতে হবে। ৷

আমাদের মধ্যে একটা দীনতা কাজ করে যে আমাদের দ্বারা হবে না। আমাদের দেশের বড় একটা সমস্যা, গত ১০ বছরে আমরা যাদের নেতৃত্বে দেখেছি, সবগুলো খারাপ লোক। রাজনীতি, শিক্ষা, ব্যাংকিং ইত্যাদি খাতে বিগত সরকার সব খারাপ লোককে পদায়িত করেছে।

মন্ত্রণালয়ে বলা হতো, কোনটা আওয়ামী লীগের বিশ্ববিদ্যালয়। একজন ভিসির নিয়োগ হতো রাজনৈতিক বিবেচনায়। এগুলো সবার জানা। আমাদের এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ছাত্রদের আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। এখন আমাদের ভিত্তিই তারা। আমি বিশ্বাস করি, কোনো হীনম্মন্যতায় না ভুগে আমরা সবাই মিলে কাজ করলে এবং ভালোকে ভালো ও খারাপকে খারাপ বললে অবশ্যই অনেক উন্নতি করতে পারব।

ডা. এ এম শামীম: প্রেসিডেন্ট, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, স্টেট ইউনিভার্সিটি

[‘‌উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক শিরোনামে বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম বাংলাদেশ উচ্চ শিক্ষা সম্মেলন ২০২৪ অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]