তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ দেশে অনেক পরিচিত দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গত ২৬ অক্টোবর রাতে আশুলিয়ায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ) এবং সিটি ইউনিভার্সিটির কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে সহিংস ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুধু ভয়ংকর দুঃসংবাদ নয়, বরং উদ্বেগজনকও বটে। বিভিন্ন পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, ওই রাতে অন্তত ৩ ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। অগ্নিকাণ্ড আর লাঠি ও ইটের আঘাতে যানবাহন ও ভবনের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি রীতিমতো অবিশ্বাস্য! এ ঘটনায় কে বিজয়ী? এক পক্ষ হয়তো অন্য পক্ষের ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষকেই জনগণের দৃষ্টিতে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে। যে কারণই থাক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো যুক্তিবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গঠনমূলক বিতর্ক শেখার ও চর্চার স্থান—মারামারি ও ধ্বংসযজ্ঞের নয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যেকোনো ধরনের সহিংসতা থেকে দূরে রাখতে বদ্ধপরিকর, কারণ এ ধরনের ঘটনা তাদের দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত সুনাম ক্ষুণ্ন করে। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন সংঘর্ষ জনগণ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের উচিত উচ্চ নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা করা এবং কোনো ধরনের গণসহিংসতায় যুক্ত হওয়ার আগে ব্যক্তিগত বিবেচনা ও বিচক্ষণতা প্রয়োগ করা, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মূলনীতির দাবি।
এ ঘটনায় যা জাতিকে সবচেয়ে উদ্বিগ্ন করেছে তা হলো—এ ভয়াবহ সংঘর্ষটি কোনো শিল্পাঞ্চলের অশিক্ষিত শ্রমিকদের মধ্যে নয়, বরং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করা তরুণ। এরা সেই মেধাবী তরুণ, যারা ভবিষ্যতে জাতির নেতৃত্ব দেবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ ধরনের অমানবিক ও ধ্বংসাত্মক আচরণ কেউ আশা করেনি। প্রশ্ন জাগে—বাইরের কেউ কি এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে? আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাইবা কী ছিল? সম্ভবত দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশই সংঘর্ষে জড়িত ছিল। তাই গোটা শিক্ষার্থী সমাজকে দোষারোপ করা অন্যায় হবে। তবে এ অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীই যথেষ্ট ছিল বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের—বিশেষ করে ড্যাফোডিল ও সিটি ইউনিভার্সিটির সুনাম নষ্ট করার জন্য। ওই সংঘর্ষের কারণে আশুলিয়ার আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বন্ধ হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ক্ষতি বয়ে এনেছে।
দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ এমন এক কঠিন ও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা তারা কখনো ভাবেনি। এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেয়া ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা করা। আমি নিশ্চিত, তারা পেশাদারভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছেন, যাতে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি আর না বাড়ে। শিক্ষক হিসেবে আমরা এ দুঃখজনক ঘটনার জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করছি এবং আহত ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আমরা আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের গঠিত তদন্ত কমিটি একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এ ভয়াবহ ঘটনার প্রকৃত কারণ ও এর পেছনের ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। হয়তো কিছু পেশাদার অপরাধী শিক্ষার্থীদের ছদ্মবেশে এ অপরাধে জড়িত ছিল। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের শিক্ষার্থীরা শান্তিপ্রিয়, অধ্যবসায়ী ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে শিক্ষায় নিবেদিত, যেন তারা পেশাদার নেতা হয়ে দেশের সেবা করতে পারে, যেমনটি আমাদের গৌরবময় প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা করেছেন। আমাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের সুষ্ঠু অগ্রগতি ও সর্বোত্তম শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাদের একাডেমিক কাজে পূর্ণ অংশগ্রহণ, সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠান যেখানে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও রাজনীতি ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ সম্ভব। আমাদের সম্মানিত শিক্ষকরা সর্বদা এ প্রত্যাশা বাস্তবায়নে সচেতন। মানুষ হিসেবে আমরা ভুল করতেই পারি, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই মানবিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য—শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের এ সতর্কতা আরো প্রযোজ্য। বিশ্ববিদ্যালয় হলো শেখা ও শেখানোর সর্বোত্তম স্থান—শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, নৈতিকতা, আদর্শ ও ভালো মানুষ হতে মানবিক মূল্যবোধের চর্চারও কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উচিত পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা এবং আশপাশের মানুষের অধিকার রক্ষা করা, যাতে সমাজ আমাদের কাছ থেকে ভালো কিছু শিক্ষা নিতে পারে ও অনুপ্রেরণা পায়। আমরা যদি ক্ষুদ্র মতবিরোধ বা তুচ্ছ বিষয়ে সহিংসতা ও সংঘর্ষে লিপ্ত হই, তাহলে আমরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী হিসেবে সামাজিক ও জাতীয় প্রত্যাশার পরিপন্থী কাজ করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চেতনা হলো বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করা ও তা লালন করা। উচ্চশিক্ষার পরিসরে বৈচিত্র্যই শক্তি, যা জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিধি প্রসারিত করে। আমাদের শিখতে হবে কীভাবে বাস্তব জীবনে বৈচিত্র্য ও ভিন্নতাকে বৈষম্য ও পক্ষপাতহীনভাবে মূল্যায়ন করা যায়।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ‘আমরা’ ও ‘তারা’ বলে কোনো বিভাজন নেই; সব বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট মানুষই ‘আমরা’। শুধু অসৎ উদ্দেশ্য ও খারাপ মানসিকতার ব্যক্তিরাই এক বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত হতে পারে। যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সহিংসতা ও খোলাখুলি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে এবং সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠানিক স্থাপনা নষ্ট করে, তাহলে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চেতনার পরিপন্থী। কে ঠিক বা কে ভুল—তা নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ তখন সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের প্রতিই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে এবং সবাইকেই দোষারোপ করে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা সরকারের কোনো আর্থিক অনুদান ছাড়াই উচ্চশিক্ষার প্রসারে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা যায়। তাই কারো দ্বারা সংঘটিত যেকোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড তাদের সুনাম, অবকাঠামো ও আর্থিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। এর পরিণতিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়েরই ক্ষতি হয়।
আমরা আশা করি, সুস্থ বিবেকবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সদ্ভাবের চেতনা দিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সহমর্মিতার সঙ্গে দ্রুতই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করবেন। জনগণ প্রত্যাশা করে যে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যুক্তিসংগতভাবে চিন্তা করবেন, দায়িত্বশীল আচরণ করবেন, অতীত ঘটনা থেকে শিক্ষা নেবেন এবং এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবেন, যা কারো জন্যই চূড়ান্ত কল্যাণ বয়ে আনে না।
ড. শাহজাহান খান: উপাচার্য, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া










