প্রতি বছর ঈদের আনন্দ উদযাপনে মানুষ বাড়ি ফেরেন। স্বাভাবিকভাবে এ সময় সড়ক, রেল ও নদীপথে যাত্রীদের চাপ বেড়ে যায়। তবে সেই সঙ্গে টিকিট ক্রয় থেকে বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত যাত্রীদের ভোগান্তিও বেড়ে যায়। এ ভোগান্তির শুরু হয় টিকিট না পাওয়া থেকে। আবার পাওয়া গেলেও তার জন্য বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বিভিন্ন রুটে এসি বা নন-এসি বাসের সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে বাসের টিকিট বিক্রি হচ্ছে। টিকিট বিক্রির অনলাইন সাইটগুলোয় দেখানো হচ্ছে কোনো বাসেরই আসন খালি নেই। কিন্তু অনলাইনে না থাকলেও কাউন্টারে বেশি দামে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। এর পেছনে দায় রয়েছে পরিবহন মালিকদের। দুঃখজনকভাবে পরিবহন মালিকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলেও তা প্রতিরোধে সরকারের তরফ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না বলে যাত্রীদের অভিযোগ। যদিও এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভাষ্য, বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অতিরিক্ত ভাড়া আদায় প্রতিরোধে তৎপর রয়েছে। সংস্থাটি সারা দেশেই নিয়মিত তদারকি করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংস্থাটির তদারকির কোনো প্রতিফলন টিকিটের দামে দেখা যাচ্ছে না। অথচ উৎসবের যাত্রা এ ধরনের ভোগান্তি থেকে মুক্ত হওয়া জরুরি ছিল।

একদিকে বাসের টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া করে দেন মালিকরা, অন্যদিকে সাশ্রয়ী ট্রেনের টিকিট হয়ে যায় সোনার হরিণ। অথচ ট্রেন যাত্রা তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও নিরাপদ হয় বলে ঈদের সময় মানুষের এ পথের ওপর সবচেয়ে বেশি ঝোঁক থাকে। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে ঈদের ট্রেনের টিকিট কাটা নিয়ে হয়রানির শিকার হয়ে আসছে মানুষ। একসময় মানুষ সারা রাত জেগে, সারা দিন লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটত। এখন অনলাইনে টিকিট পাওয়া যায়। তবে টিকিট বিক্রির নির্ধারিত সময় থেকে ৫ মিনিটের মধ্যে হয় ‘সার্ভার এরর’ দেখায়, না হয় আর কোনো টিকিট পাওয়া যায় না। যদিও কালোবাজারে পরবর্তী সময়ে টিকিট বিক্রি হওয়ার অভিযোগ সর্বদাই রয়েছে। অর্থাৎ সময়ের পরিক্রমায় ট্রেনের টিকিটের ক্ষেত্রে হয়রানির ধরন পরিবর্তন হয়েছে। ২০২৩ সালে টিকিটিং ব্যবস্থার উন্নয়ন ও টিকিট কালোবাজারি রোধে ‘টিকিট যার ভ্রমণ তার’ কার্যক্রম শুরু করা হলেও মূলত টিকিট কাটার অনলাইন সিস্টেম থেকে দুর্নীতির হাত অপসারণ করা যায়নি। নিরুপায় যাত্রীরা বাধ্য হয় চড়া মূল্যে কালোবাজার ও বাস কাউন্টার থেকে টিকিট বাড়তি দামে টিকিট কেনেন। আর যারা টিকিট কিনতে পারেন না, তারা শেষ উপায় ট্রেনের ছাদ, ট্রাক, বাসের ইঞ্জিন কাভারের ওপর চেপে যাত্রা করেন। আবার যাদের অগ্রিম টিকিট কাটতে হয় না, তাদের ভোগান্তি শুরু হয় বাসে উঠতেই। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী জানেই না কখন বাসে উঠতে পারবে কিংবা বাস রওনা হবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের উদ্দেশে। গাড়ির আধিক্য, যাত্রীর চাপ, অনিয়মে চলাচল সব মিলিয়ে এ সময় দুর্ঘটনাও বেড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটে সড়ক পথে।

অথচ সবার প্রত্যাশা থাকে ঈদযাত্রা হবে স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নিরাপদ। কিন্তু প্রতি বছরই পুরো ভিন্ন পরিস্থিতি দেখা পাওয়াটা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। প্রতি বছরই কত সংখ্যক মানুষ ঈদ উপলক্ষে যাতায়াত করবে তার প্রাক্কলন করা হয়। যেমন যাত্রা কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে প্রায় দেড় কোটি মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যে যাত্রা করবে। এছাড়া দেশের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় আরো তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি মানুষের যাতায়াত হতে পারে। তাদের ৭৫ শতাংশ সড়কপথে, ১৭ শতাংশ নৌপথে এবং ৮ শতাংশ রেলপথে যাতায়াত করবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঈদযাত্রীর সংখ্যার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় এক কোটির বেশি মানুষ ঈদে ঘরে ফেরেন। কিন্তু তার পরও এ যাত্রীদের যাত্রা সেভাবে ভোগান্তিহীন ও নিরাপদ করতে পারেনি কোনো সরকার। ঈদে চাহিদার সমপরিমাণ পরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারেনি। আবার যেসব গাড়ি সড়কে নামানো হয় সেগুলোর বেশির ভাগই থাকে ফিটনেসবিহীন। যদিও ঈদের আগে সড়ক পরিবহনসংশ্লিষ্টদের বলতে শোনা যায়, ফিটনেসবিহীন গাড়ি বা রুট পারমিটবিহীন গাড়ি মহাসড়কে নামতে দেয়া হবে না। কিন্তু বাস্তবায়ন চোখে পড়ে না। অতিরিক্ত ও বেপরোয়া গাড়ির চাপে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বাড়তে থাকে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কেবল গত বছরের ঈদুল ফিতরের আগে ও পরে ৪-১৮ এপ্রিলের মধ্যে ১৫ দিনে দেশে ৩৫৮ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬৭ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি। এসব সংখ্যা স্পষ্টভাবে জানা দেয় যে দেশের যাত্রাপথের নীতি আছে; কিন্তু বাস্তবায়ন নেই, সুব্যবস্থাপনা নেই। যাত্রীরা উপায় না পেয়ে নানা বিকল্পের দ্বারস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। পথে দুর্ঘটনার শিকার হন কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়েন।

ঈদ যাত্রার উল্লিখিত সমস্যাগুলো দূর করা না গেলে ঈদযাত্রা কখনো আরামদায়ক ও নিরাপদ হবে না। ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সক্রিয় হওয়া জরুরি। টিকিট পাওয়ার সুব্যবস্থা করা জরুরি। বাড়তি দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বাসের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ট্রেনের ওপরও চাপ কমতে পারে। এজন্য নজরদারি এবং আইনের প্রয়োগ জোরদার করা আবশ্যক। এছাড়া কীভাবে সড়ক ও মহাসড়কে যানজট নিরসন করা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ঈদের আগে-পরে যেন কোনোভাবেই মহাসড়কে অননুমোদিত ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন উঠতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সেতু বা এক্সপ্রেসওয়ের টোলপ্লাজাগুলোয় যেন ভোগান্তি না হয় তার কৌশল ঠিক করা যেতে পারে। আর ট্রেনযাত্রায় দুর্ভোগ কমাতে রেলওয়ে ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করার বিকল্প নেই। ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিগুলো দূর করা গেলে ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।