১ কোটি টাকার অধিকাংশই পণ্য কেনার জন্য ব্যয় হয়েছে। বিক্রিমূল্য থেকে ক্রয়মূল্য বাদ দিলে যে অর্থ থাকে, সেটি গ্রস মুনাফা। এরপর দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ, পরিবহন, ব্যাংক সুদ, পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি ও অন্যান্য ব্যবসায়িক ব্যয় বাদ দেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, সেটিই তার প্রকৃত নিট আয়।
আয়কর হওয়ার কথা এ নিট আয়ের ওপর। কিন্তু ২০২৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে ব্যক্তি শ্রেণীর ব্যবসায়ী করদাতার জন্য এমন একটি ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে কোনো সাধারণ ন্যূনতম টার্নওভারসীমা না রেখেই অধিকাংশ ব্যবসার মোট বিক্রি বা গ্রস প্রাপ্তির ওপর ১ শতাংশ হারে টার্নওভার কর প্রযোজ্য হবে।
এ ব্যবস্থার সমস্যা শুধু ১ শতাংশ হার নয়। আইনটির ভাষার মধ্যেও একটি সরাসরি অসংগতি রয়েছে। একই সঙ্গে এ হার ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা এবং খুচরা ও পাইকারি ব্যবসার বাস্তব মুনাফা কাঠামোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একই বিধানে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। নতুন বিধানের প্রথম অংশে বলা হয়েছে—ব্যবসা বা পেশা থেকে আয়ের ওপর সাধারণ নিয়মে যে কর প্রদেয় হয়, সেই কর যদি সারণিতে নির্ধারিত টার্নওভার করের চেয়ে কম হয়, তাহলে কম অংকের প্রদেয় কর নয়, বেশি অংকের টার্নওভার করই প্রযোজ্য হবে।
ধরা যাক, একজন ব্যবসায়ীর প্রকৃত আয়ের ওপর সাধারণ নিয়মে কর দাঁড়াল ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু তার মোট বিক্রির ওপর ১ শতাংশ হিসাব করে টার্নওভার কর দাঁড়াল ১ লাখ টাকা। আইন বলছে, তাকে ৩০ হাজার টাকা নয়, ১ লাখ টাকাই কর দিতে হবে। অর্থাৎ সারণিতে নির্ধারিত টার্নওভার করই তার ন্যূনতম প্রদেয় কর।
এ পর্যন্ত বিষয়টি পরিষ্কার। কিন্তু একই বিধানের পরবর্তী অংশে আবার বলা হয়েছে—কোনো বছরে প্রদেয় করের তুলনায় টার্নওভার কর বেশি হওয়ায় যে অতিরিক্ত কর দেয়া হয়েছে, সে অতিরিক্ত অর্থ পরবর্তী করবর্ষে জের টানা বা প্রদেয় করের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে।
এখানেই সরাসরি প্রশ্ন ওঠে প্রথম অংশে সাধারণ প্রদেয় করকে অগ্রাহ্য করে তার চেয়ে বেশি টার্নওভার করকে যখন প্রযোজ্য কর করা হলো, তখন আবার সে একই প্রদেয় করকে ভিত্তি ধরে টার্নওভার করের অতিরিক্ত অংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে কীভাবে?
উপরের উদাহরণে প্রথমে বলা হলো ৩০ হাজার টাকা প্রদেয় কর হলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়; ১ লাখ টাকা দিতে হবে। আবার পরক্ষণেই ৩০ হাজার টাকাকেই গুরুত্ব দিয়ে বলা হচ্ছে—১ লাখের মধ্যে ৭০ হাজার টাকা অতিরিক্ত, যা ভবিষ্যতে সমন্বয়যোগ্য।
একবার প্রদেয় করকে অগ্রাহ্য করে তার চেয়ে বেশি কর নেয়া, আবার একই প্রদেয় করকে ভিত্তি ধরে সে বাড়তি অংশকে অতিরিক্ত কর হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া—একই বিধানের মধ্যে এ দুই অবস্থান পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাছাড়া যা প্রদেয় কর তা প্রথমেই চূড়ান্ত না করে পরে অহেতুক জটিলতার প্রয়োজনই বা কি!
আসলে এ আইন রচনার মধ্যেই সুস্পষ্ট ত্রুটি রয়েছে। এ ত্রুটি সংশোধন করা প্রয়োজন। তাছাড়া করমুক্ত আয়ও কেন করের আওতায় আসবে? আইনের এ অসংগতির চেয়েও সাধারণ মানুষের জন্য বড় সমস্যা হলো এর বাস্তব আর্থিক ফলাফল।
ব্যক্তি শ্রেণীর সাধারণ করদাতার ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির প্রকৃত করযোগ্য আয় ৪ লাখ টাকার মধ্যে থাকলে সাধারণ নিয়মে তার কোনো আয়কর হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু নতুন টার্নওভার করের ব্যবস্থায় ব্যবসা থেকে তার প্রকৃত আয় ৪ লাখ টাকার অনেক নিচে হলেও শুধু মোট বিক্রির অংকের কারণে তাকে কর দিতে হবে।
একজন ছোট গ্রোসারি ব্যবসায়ীর উদাহরণ ধরা যাক। তিনি প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেন। বছরে তার মোট বিক্রি দাঁড়ায় ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। গ্রোসারি দোকানে বেশি বিক্রি হয় চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণের মতো স্বল্প মার্জিনের পণ্য। তার পরও বর্তমান ব্যবস্থার অসংগতি বোঝানোর জন্য অত্যন্ত উদারভাবে ধরে নিই, তিনি সব পণ্যে গড়ে ১০ শতাংশ গ্রস মুনাফা করেন।
তাহলে তার বছরের গ্রস মুনাফা হবে ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এ অর্থ থেকে দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ, পরিবহন, পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাবদ মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বাদ দিলেও নিট আয় থাকে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
এ আয় ৪ লাখ টাকার করমুক্ত সীমার অনেক নিচে। সাধারণ নিয়মে তার ১ টাকাও আয়কর হওয়ার কথা নয়, কিন্তু ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিক্রির ওপর ১ শতাংশ টার্নওভার কর হলে তাকে দিতে হবে ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ আয় করযোগ্য নয়, অথচ বিক্রির কারণে কর দিতে হচ্ছে।
আরো একটি উদাহরণ নেয়া যাক। একজন খুচরা ব্যবসায়ীর বার্ষিক বিক্রি ৬০ লাখ টাকা। একইভাবে ১০ শতাংশ গ্রস মুনাফা ধরলে তার ৬ লাখ টাকা হয়। এর এক-তৃতীয়াংশ ব্যবসায়িক ব্যয় বাদ দিলে নিট আয় দাঁড়ায় ঠিক ৪ লাখ টাকা—অর্থাৎ করমুক্ত সীমার মধ্যে।
অথচ ১ শতাংশ টার্নওভার কর হবে ৬০ হাজার টাকা। একদিকে রাষ্ট্র বলছে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত, অন্যদিকে একই ব্যক্তির ৪ লাখ টাকা আয় অর্জনের জন্য সংঘটিত বিক্রির ওপর ৬০ হাজার টাকা কর নিচ্ছে। এ দুটি নীতি একসঙ্গে ন্যায়সংগত হতে পারে না।
পাইকারি ব্যবসায় অসংগতি আরো প্রকট
খুচরা ও পাইকারি ব্যবসার মুনাফার কাঠামো কখনো এক নয়। পাইকারি ব্যবসায় সাধারণত অতি অল্প মার্জিনে বিপুল পরিমাণ পণ্য দ্রুত হাতবদল হয়। ধরা যাক, একজন পাইকারের বার্ষিক বিক্রি ১০০ কোটি টাকা। তার গ্রস মার্জিন দশমিক ৫০ শতাংশ হলে মোট গ্রস মুনাফা হবে ৫০ লাখ টাকা। অথচ ১ শতাংশ হিসাবে তার টার্নওভার কর হবে ১ কোটি টাকা, যা গ্রস মুনাফার দ্বিগুণ।
মার্জিন দশমিক ১০ শতাংশ হলে গ্রস মুনাফা হবে ১০ লাখ টাকা, কিন্তু কর হবে ১ কোটি টাকা। আর কোনো স্বল্প-মার্জিন লেনদেনে মার্জিন দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হলে গ্রস মুনাফা হবে মাত্র ৫ লাখ টাকা, অথচ টার্নওভার কর হবে ১ কোটি টাকা, যা গ্রস মুনাফার ২০ গুণ। এ হিসাবের মধ্যে পরিচালন ব্যয় এখনো বাদই দেয়া হয়নি।
যে কর মোট গ্রস মুনাফার চেয়েও বেশি, তা মুনাফা থেকে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীকে মূলধন ভেঙে কর দিতে হবে। আয়করের নামে ব্যবসার মূলধন থেকে অর্থ নিয়ে নেয়া কোনো সুস্থ করনীতির উদ্দেশ্য হতে পারে না।
একই হার খুচরা ও পাইকারির জন্য কেন?
একটি খুচরা দোকানে কিছু পণ্যে ৫ বা ১০ শতাংশ গ্রস মুনাফা থাকতে পারে, আবার মোট বিক্রির বড় অংশের পণ্যে মুনাফা ১, ২ বা ৩ শতাংশ হতে পারে। অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায় মার্জিন তার চেয়েও অনেক কম হয়। তাহলে খুচরা ও পাইকারি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির দুই ব্যবসার ওপর একই ১ শতাংশ হার আরোপের যৌক্তিকতা কোথায়?
টার্নওভার ব্যবসারের মোট বিক্রি বা বিক্রির আকার সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে; কিন্তু করদাতার প্রকৃত আয় বা কর প্রদানের সক্ষমতা নির্ধারণ করতে পারে না। একজন ব্যবসায়ীর ১ কোটি টাকা বিক্রি থেকে ১০ লাখ টাকা গ্রস মুনাফা হতে পারে, আবার অন্য ব্যবসায়ীর একই ১ কোটি টাকা বিক্রি থেকে গ্রস মুনাফা হতে পারে মাত্র ৫০ হাজার টাকা। শুধু টার্নওভার সমান বলে তাদের একই হারে কর নির্ধারণ ন্যায়সংগত হতে পারে না। তাহলে কী করা উচিত?
টার্নওভার কর সম্পূর্ণ তুলে দিতে হবে এমন কথা নয়। করজাল সম্প্রসারণ, হিসাব সংরক্ষণে উৎসাহ দেয়া এবং ন্যূনতম রাজস্ব নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি সহজ ব্যবস্থা হিসেবে থাকতে পারে। কিন্তু সেটি ব্যবসার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
আমার প্রস্তাব হলো, ব্যক্তি শ্রেণীর খুচরা ব্যবসায়ীর প্রথম ৬০ লাখ টাকা বার্ষিক টার্নওভার এ করের বাইরে রাখা হোক। এর বেশি হলে মোট টার্নওভারের দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা, যেটি বেশি, তা টার্নওভার কর হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
পাইকারি ব্যবসায় মুনাফার হার তুলনামূলক অনেক কম হওয়ায় ১ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করের বাইরে রেখে এর বেশি হলে মোট টার্নওভারের দশমিক শূন্য ২৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকার মধ্যে যেটি বেশি সেটিই হবে প্রদেয় কর, এমন বিধান করা যেতে পারে। এর সঙ্গে দুটি মৌলিক সুরক্ষা থাকা জরুরি।
প্রথমত, যথাযথ হিসাবপত্রের মাধ্যমে যদি প্রমাণ হয় ব্যক্তি করদাতার প্রকৃত আয় ৪ লাখ টাকার করমুক্ত সীমার মধ্যে, তাহলে তার ওপর টার্নওভার কর প্রযোজ্য হবে না।
দ্বিতীয়ত, যথাযথ হিসাবপত্রে প্রকৃত আয় প্রমাণ হলে সে আয়ের ওপর সাধারণ নিয়মে যে কর হয়, টার্নওভার কর কোনো অবস্থায় তার চেয়ে বেশি হওয়া উচিত নয়। এ ব্যবস্থা থাকলে করমুক্ত আয়সীমার অর্থ অক্ষুণ্ন থাকবে, করদাতাকে হিসাব সংরক্ষণে উৎসাহ দেয়া হবে এবং সৎ ব্যবসায়ী অযৌক্তিক করের শিকার হবেন না।
ভুল আইন সংশোধন করাই দায়িত্বশীলতা
এ ব্যবস্থা ২০২৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে পরিলক্ষিত হয়েছে। তাই এর স্থায়ী সংশোধনও আইনের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট শ্রেণীর ক্ষুদ্র বা স্বল্প মার্জিন ব্যবসায়ীকে সাময়িকভাবে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্বস্তি দেয়া যেতে পারে; কিন্তু মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে আইন সংশোধন করে।
সংসদ অধিবেশনে না থাকলে এবং আশু ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হলে সাংবিধানিক পদ্ধতিতে অধ্যাদেশের মাধ্যমেও সংশোধন আনা যেতে পারে। আইন প্রণয়নে ভুল হওয়া অসম্ভব নয়, কিন্তু ভুল শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত তা সংশোধন করাই দায়িত্বশীল সরকারের পরিচয়।
বর্তমান ১ শতাংশ টার্নওভার করের ক্ষেত্রে তিনটি সমস্যা অত্যন্ত স্পষ্ট—আইনের নিজের ভাষার মধ্যে সরাসরি অসংগতি রয়েছে; করমুক্ত সীমার নিচের আয়কেও করের আওতায় আনার অযৌক্তিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন মুনাফা কাঠামোর খুচরা ও পাইকারি ব্যবসার ওপর একই হার আরোপ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই শুধু একটি শব্দ বা বাক্য সংশোধন নয়, ব্যক্তি শ্রেণীর টার্নওভার করের পুরো কাঠামোটিই জরুরি ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কর আদায় রাষ্ট্রের অধিকার, আর আইনসম্মত কর দেয়া নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু সে কর হতে হবে স্পষ্ট আইনের ভিত্তিতে, যুক্তিসংগত এবং করদাতার প্রকৃত সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কারণ শেষ পর্যন্ত সত্যটি খুবই সাধারণ—বিক্রয় আয় নয়; আর যে কর প্রকৃত আয়কে অতিক্রম করে ব্যবসার মূলধনে হাত দেয়, তাকে ন্যায়সংগত আয়কর বলা যায় না।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী: আয়কর আইনজীবী ও কোম্পানি আইন পরামর্শক










