যথাসময়ে পারিশ্রমিক পাওয়া সব কর্মজীবী মানুষের অধিকার। সেই সঙ্গে মাসের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে আগের মাসের বেতন পরিশোধের বাধ্যবাধকতার কথাও আইনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন হয় কদাচিৎ, বিশেষত শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের মাসের পর মাস বেতন বকেয়া রেখে দেন শিল্প মালিক পক্ষ। ফলে প্রতি বছরই ঈদের আগে শ্রমিকদের আন্দোলনে নামতে হয় বকেয়া-বেতন, বোনাস ও ছুটিসহ নানা দাবিতে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বেতন-বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা গাজীপুর ও সাভারের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন করে আসছেন। কখনো কারখানা বন্ধ করে, কখনো মহাসড়ক অবরোধ করে তারা আন্দোলন করছেন। আবার সম্প্রতি বকেয়া বেতন, ঈদ বোনাস, ছুটিসহ বিভিন্ন দাবিতে সচিবালয় অভিমুখে মিছিল নিয়ে যাওয়া পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

  • সবচেয়ে দুঃখজনক হলো এসব ঘটনা নতুন নয়, বছরের পর বছর ধরে শিল্পাঞ্চলে ঈদের আগে একই ‍চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ প্রতি বছরই সরকার একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয় বকেয়া বেতন-বোনাস পরিশোধের। এবারো ৬ মার্চ সরকার-শ্রমিক-মালিকের ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ সভায় ২০ রমজানের মধ্যে ন্যায্য প্রাপ্য পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পাশাপাশি মার্চের ১৫ দিনের বেতনও পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু ২৫ রমজান পেরিয়ে গেলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এদিকে সম্প্রতি শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ না করায় ১২টি পোশাক কারখানার মালিকদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তারা বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রেও প্রশ্ন জাগে, মালিকদের কতজন বর্তমানে দেশে আছেন এবং এতে আদৌ শ্রমিকদের লাভ হবে কতটা?
  • এদিকে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষে এ বছর কেবল ঈদুল ফিতর ঘিরে নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় থেকে পরবর্তী সময়েও নিয়মিত বিরতিতে দেখা মিলেছে শ্রম অসন্তোষের। বিভিন্ন কারখানার মালিক বিগত সরকার পতনের পর পালিয়েছেন দেশ থেকে। ফলে সেসব কারখানার শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রয়ে গেছে। সেই সময়ও বেতন পরিশোধের দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে। সামনে ঈদ ঘিরে আবারো সেই বিক্ষোভ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মালিক পক্ষ সঠিক সময়ে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ না করায় শিল্পাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ঈদের আগে শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব কিনা তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এজন্য মালিক-শ্রমিক উভয়কে এগিয়ে আসতে হবে। ঈদের ছুটি শুরুর আগে যাতে সব কারখানার মালিক শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ করেন, সেই নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আবার কোন কারখানা অপারগতা থেকে সব বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না, তাদের সঙ্গে সংলাপে যেতে হবে এবং সে মোতাবেক সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রেখে কখনো শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যাবে না।
  • দেশের শিল্প অধ্যুষিত আট এলাকার ২০৩টি কারখানায় ঈদের বেতন-বোনাস পরিশোধ নিয়ে সমস্যাসংকুল পরিস্থিতির কথা জানিয়েছিল শিল্প পুলিশ। সংস্থাটি খাতভিত্তিক বিভাজনের মাধ্যমেও এ ২০৩ কারখানার পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। শিল্প পুলিশের পর্যালোচনা অনুযায়ী শিল্প এলাকাগুলোয় সমস্যাসংকুল কারখানা সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক খাতের। এ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের সমস্যাসংকুল কারখানা সবসময়ই ছিল, এবারো আছে। এ ধরনের কারখানাগুলোকে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর মাধ্যমে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আশুলিয়া, গাজীপুরের মতো এলাকাগুলোকে ১৫টি ক্লাস্টারে ভাগ করে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষ হটলাইন নাম্বারও কাজে লাগানো হচ্ছে। কিন্তু খুব বেশি ইতিবাচক পরিবর্তন না আসায় এসব তদারকি কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাচ্ছে। শিল্প পুলিশের পর্যালোচনা বলছে, সমস্যাসংকুল ২০৩টি কারখানার মধ্যে গত তিন বছরে ঈদের বেতন-বোনাস ও ছুটি নিয়ে অসন্তোষের ইতিহাস রয়েছে ৮৯টি কারখানার। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ৪২টি। বিকেএমইএর সদস্য ১১টি। বিটিএমএর সদস্য চারটি, বেপজার অধীন কারখানা সাতটি এবং কোনো সংগঠনের সদস্য নয় এমন কারখানা ২৫টি।
  • উল্লিখিত ৮৯টি কারখানার পাশাপাশি মূলত সব কারখানার মালিকদের বকেয়া বেতন-বোনাস পরিশোধে আরো দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। শ্রমিকরা যেন সঠিক সময়ে তাদের বেতন বুঝে নিতে পারেন সেজন্য মালিকদের সংগঠনগুলো সংশ্লিষ্ট কারখানার উদ্যোক্তাদের নিয়মিত তাগাদা দিতে পারে। এটি কেবল শ্রমিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত নয়, শিল্প খাতের বিকাশও এখানে প্রাসঙ্গিক। কয়েক দশকের পথপরিক্রমায় দেশের শিল্প খাত আজকের এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। এর পেছনের কারিগর প্রধানত শ্রমিকরা, যাদের পরিশ্রমে একেকটি পণ্য উৎপাদন হয়। তাই শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও বেতনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। উৎসব পালনের আগে এমন শ্রমিক অসন্তোষের নজির বর্তমানে পৃথিবীতে বিরল। একদিকে বেতন নেই, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে শ্রমিকদের ব্যয় বেড়েছে। ফলে তাদের ওপর আর্থিক চাপ আরো বেড়েছে। এ সময়ে পরিবার নিয়ে জীবনযাপনই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সঠিক সময়ে বেতন-বোনাস পরিশোধ করা প্রয়োজন।
  • শিল্প উৎপাদনের কেন্দ্রে যে শ্রমিক রয়েছেন, তাকে বঞ্চিত রেখে কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে না। শ্রমিকদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বেতন-বোনাস না দেয়ার মতো শোষণ কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। ঈদের আগেই শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করা হোক। এজন্য সরকার ও মালিক পক্ষের সংগঠনগুলোকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে এবং সারা বছর এটা নিয়ে সজাগ থাকা আবশ্যক। শিল্পাঞ্চলের কোনো কারখানায় শ্রমিককে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রাখার যে চর্চা তা অব্যাহত থাকুক—সেটা একেবারেরই অপ্রত্যাশিত। সরকারের তাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথেও হাঁটতে হবে।